কবি আল মাহমুদ স্বতন্ত্র সত্তার কবি

নাজমুন নাহার : কবি তাকে বলি যিনি জানেন কি করে সৌন্দর্য তৈরী করতে হয় তাঁর দক্ষ হাতের সাবলীল ব্যবহারে। শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে, ছন্দের ক্ষেত্রে, উপমার ক্ষেত্রে, অলংকার, উপমা উৎপ্রেক্ষার বিচিত্র ব্যবহারে তিনি যে কবিতাকে সামনে তুলে ধরেন তাতে পাঠক মোহগ্রস্থ হয় এবং এটা সুর একটা আবহ কবি তৈরী করেন যেখানে পাঠক আর নিজের মধ্যে থাকেন না – কবির কবিতার সাথে একধরনের সংলগ্নতা তিনি বোধ করেন যাতে কবিতা হয়ে ওঠে। অথবা কবিতা তাকেই বলি যা চকিত চমকে মনকে দুলিয়ে দিয়ে যায়। চৈতন্যে সাড়া জাগায়। সেই দোলা বা সাড়া কখনো আসে ভাবের ব্যঞ্জনায়, কখনো মনোভঙ্গির অপ্রত্যাশিত খরতায়, কখনো বা রূপকলার আকস্মিক জ্যোতির্ময়তায়। এদের যে কোন একটির অভিঘাতেই পাঠকের মনের উদ্ভাসন ঘটতে পার, তার অভিজ্ঞতার পরিধি বিস্তৃততর হতে পারে। সেই প্রজ্বলন ও প্রসারন পাঠকের মধ্যে ঘটিয়ে কবির বাক্য সৃষ্টি যথার্থ কবিতা হয়ে ওঠে। যেমন –

শরমিন্দা হলে তুমি ক্ষান্তিহীন সজল চুম্বনে
মুছে দেব আদ্যাক্ষর রক্তবর্ন অনার্য প্রাচীন
(
সোনালী কাবিন –২ ) কবি আল মাহমুদ

এভাবে বিশ্লেষণ করলে একজন কবি আল মাহমুদকে আমরা পাই, যিনি বিশের দশক থেকে শুরু করেন কিন্তু তিরিশের দশকের ধারাকে উপেক্ষা করে ভিন্ন একটা গতিধারা তৈরী করেন, যেখানে একজন আল মাহমুদ বিশেষ ভাবে নিজেকে চিনিয়ে দেন। তিরিশের দশকের কবিরা কবিতার ধারা রবীন্দ্র ধারা থেকে সরিয়ে পশ্চিমের দিকে যাত্রা শুরু করেন সেখানে কবি আল মাহমুদ তাঁর কবিতাকে স্বতন্ত্র স্বত্তায় দাঁড় করান। গ্রামীন, লোকজ এবং মৌলিক শব্দের স্বচ্ছন্দ ব্যবহারে তাঁর কবিতার শরীরকে অলংকৃত করেন। তাঁর উপমা উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প এমনই গ্রামীন লোকজ যে সেখানে কবি আল মাহমুদ একজন স্বতন্ত্র কবি হিসেবে চিনিয়ে দেন তাঁর জাত। তাঁর লোকজ শব্দে যেভাবে পাওয়া যায় মাটির টান তেমনি তিনি যে আধুনিক কবিতার একজন আলাদা নতুন শব্দের রূপকার সে আর আলাদা করে বলে দিতে হয় না। যেমন –

রাতের নদীতে ভাসা পানিউড়ী পাখির ছতরে ,
সৃষ্ট ঢেউয়ের পাল যে কিসিমে ভাংগে ছল ছল
আমার চুম্বন রাশী ক্রমাগত তোমার গতরে
ঢেলে দেবো চিরদিন মুক্ত করে লজ্জায় আগল
(
সোনালী কাবিন – ১৪)

কবি আল মাহমুদ তিরিশোত্তর কবিদের চাইতে ভিন্ন তাঁর শব্দ ব্যবহারের চমকপ্রদ ব্যবহারে । গ্রামীন শব্দ তিনি অবলীলায় ব্যবহার করেন কবিতার শরীরে এবং একটা ভিন্ন মাত্রা দেন। যেমন –

বুবুর স্নেহের মত ডুবে যায় ফুলতোলা পুরনো বালিশ –

স্নেহের সাথে বুবুর ফুলতোলা বালিশের অনুষঙ্গ চমৎকার – কারণ বুবু যখন ভাইয়ের জন্য বালিশের কভারে ফুল তুলেন তখন ভাইয়ের প্রতি বোনের স্নেহের আতিশয্যের কারণেই সেই বালিশ ভিন্ন এক ব্যঞ্জনার আবেশে ভরপুর হয়। কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার – একে তো মক্তবের মেয়ে আবার সে চুলখোলা এবং একটা সাধারণ নাম যে নাম গ্রাম্য মেয়েদের সাথে মানিয়ে যায় – একটা গ্রামীন নিষ্পাপ মেয়ের ছবি চোখে আসে যেখানে একই সাথে কাব্য বোধের সাথে একাকার  আয়েশা আকতার।

বধুবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকূল
গাঙের ঢেউয়ের মত কন্যা বলো কবুল কবুল –

নারীই শিল্পের মহাশক্তি। পৃথিবীতে যত কবিতা মহাকাব্য লিখা হয়েছে তার অধিকাংশই নারী বিষয়ক। পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ মহাযুদ্ধ হয়েছে নারীকে কেন্দ্র করেই। আল মাহমুদের কবিতায় নারী তার সমস্ত সৌন্দর্য আর উচ্ছ্বলতা  নিয়ে হাজির হয়। কবি তার নারীকে রূপ আর জৈব তৃষ্ণার আঁধার করে খোলা তরবারির মত হাজির করেন। নদীর ঢেউ আর ভাংগা গড়ার চলার ছন্দের সাথে নারীর শরীরের ভাঁজ, শিহরণ আর গতিময়তার চমৎকার সাদৃশ্য ভিন্নতর ব্যঞ্জনা দান করে।

ক্ষুধার্ত নদীর মতো তীব্র দুটি জলের আওয়াজ
তুলে মিশে যাই চলো অকর্ষিত উপত্যকায়
চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাঁজ (সোনালী কাবিন)

কবি আল মাহমুদের কবিতায় পল্লী প্রকৃতি, লোকজ জীবন ধরা পড়ে ভিন্ন আঙ্গিকে – স্বতন্ত্র তাৎপর্য নিয়ে। তিনি অবহেলিত বাংলার গ্রামীন জীবনের খুঁটিনাটি প্রসংগকেও অনায়াসে উপমা চিত্রকল্পে স্থাপিত করেন অনন্যতায়। মূলত আল মাহমুদের ভাষা একান্তই তাঁর নিজস্ব। পল্লীর শব্দ ও প্রবাদ প্রবচনকে আর কোন কবি সম্ভবত এমন নিপুন ও শৈল্পিক ভংগীতে ব্যবহার করেন নি। গ্রামীন জীবনের উপাদান থেকে তিনি নির্মাণ করেন তাঁর উপমা ও চিত্রকল্প। জসীমউদ্দিন যেমন লোক সাহিত্যের উপর তাঁর কুটির নির্মাণ করেন সেখানে আল মাহমুদ আধুনিক এক প্রাসাদের কারুকার্যে লৌকিক উপাদান তাঁর কাব্যে ব্যবহার করেন। পলায়ন পর মানব সত্তা আল মাহমুদের চেতনায় গড়ে প্রবল দূরাগত ভাংগনের শব্দ। পালাবার পথ খোঁজেন কিন্তু পান না। কেননা –

নারীর নিঃশ্বাস এসে চোখে মুখে লাগে
বুকে লেগে থাকে ক্লান্ত শিশুর শরীর”

১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর এবং ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ  কালের কলস। এ দু’টি কাব্যের ভেতর দিয়ে আল মাহমুদ নিজেকে প্রকাশ করেন সম্পূর্ণ মৌলিক ও নিজস্ব ঘরানার কবি হিসেবে। আল মাহমুদ প্রকরণ সচেতন কবি। ছন্দ, উপমা, চিত্রকল্প নির্মাণে তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। একাধারে স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত এবং গদ্য কবিতা লিখেছেন। কবি মনে করেন ছন্দ ত্যাগ করলে কবির চলে না। ছন্দ নির্মাণে তিনি কৌশলের পরিচয় দিয়েছেন। উপমা সমৃদ্ধ কবিতা কবি আল মাহমুদ অনেক লিখেছেন। দেশ, নারী, প্রকৃতি, তাঁর কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ –

১। চাষীর বিষয় নারী উঠোনে ধানের কাছে নুয়ে থাকা
পূর্ণাস্তনী ঘর্মাক্ত যুবতী (কবির বিষয়/অদৃষ্টবাদীর রান্নাবান্না )
২। স্তন দুটি দুধের ভারে ফলের আবেগে ঝুলে আছে”
(
অন্তরভেদী অবলোকন/সোনালী কাবিন)
৩। — আর নরম দুটি বুক,
পুঞ্জিভূত অভিমান (দোয়েল দয়িতা/দোয়েল দয়িতা)

আল মাহমুদকে সত্যিকার শক্তিশালী কবি মনে হয়েছিল তাঁর ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ কবিতাটি রচিত হওয়ার পর। হাজার বছরের প্রচলিত মিথকে ভেঙে ফেলার ক্ষমতা যিনি রাখেন তিনি নতুন মিথেরও জন্মদাতা বটে। আল মাহমুদ যখন বলেন:

মাঝে মাঝে ভাবি, ছেলেটি কেন এমন ‘বাঘ বাঘ’ বলে চেঁচাতো?
আমরা ভয়ে বিহ্বলতায় চারদিকে ছুটে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে
বলতাম শুয়োরের বাচ্চা। সে বোকার মতো হাসতো। বিব্রত,
অপদস্থ। তারপর আমরা প্রতিজ্ঞা করলাম,
মিথ্যাবাদীর ডাকে আমরা আর সাড়া দেব না
আহ, আবার যদি ফিরে আসত সেই মিথ্যাবাদী ছেলেটা
জনমত তিরস্কারের পাশে দাঁড়িয়ে প্রান্তরের চারণের মতো
বলে উঠতো, ‘মুত্যু এসেছে, হে গ্রামবাসী-
হুঁশিয়ার’

ছেলেটা যদি মিথ্যাবাদী হবেই তবে বাঘ কেন এসেছিল শেষ পর্যন্ত? এটা এক ভয়ঙ্কর আবিষ্কার। এভাবে ঈশপের কাহিনীকে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিয়ে নতুন করে কাহিনী গড়ার দুঃসাহসী অভিযানে নামেন আল মাহমুদ, যে অভিযানে তিনি সফলও হয়েছেন বলা যায়। :

কিংবা যখন তিনি বলেন:

তারপর সত্যি একদিন বাঘ এসে সব খেয়ে ফেলল। প্রথম
সেই বালকটিকে, শেষে নখ আর দাঁত দিয়ে আঁচড়ে ফেলল
মানুষের গ্রাম, ঘরবাড়ি, রক্ত, মাংস

এই যে প্রচলিত গল্পের বাইরেও বোঝার একটা গল্প আছে সেটাকে তিনি প্রকাশের তাড়না অনুভব করেন। পাঠকের মনে হতে পারে কেউ সাদামাটা গল্প শোনাচ্ছেন কিন্তু কিছু পংক্তি সত্যিই চমকে দেয়।

আমরা তো সেই মিথ্যাবাদীর খুলির ওপর রোদ চমকাতে দেখে এসেছি’
কিংবা ‘আর দেখেছি সকল সত্যবাদীদের পঙ্গপালের মতো পালাতো।”–

মৃত্যু এসেছে এই যে অসাধারণ দর্শন তিনি এখানে নিয়ে আসেন যেখানে আগে শুধু ভাবা হতো রাখালের মিথ্যাবাদী চরিত্র । সে চরিত্রের উপর তিনি আরোপ করেন দার্শনিকতা। প্রতিদিনই আমাদের দুয়ারে মৃত্যু এসে হানা দেয়। প্রতিদিনই আমরা একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে পায়ে হেঁটে যাই।

আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান কবি। যিনি শুধু একটি টিনের সুটকেস নিয়ে শুধু কবিতাকে অবলম্বন করে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ জ্ঞান বৃদ্ধ। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অকিঞ্চিৎকর দান বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। লোকজ উপাদান, নারী, রাজনীতি সচেতনতা, আশাবাদ, ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, শব্দ বয়ন কৌশল তাঁর কবিতার অনন্য সম্পদ। তিনি কবিতায় গভীরভাবে খোঁজেন জীবনকে, মানুষকে, প্রেম ও প্রকৃতিকে। কবি আল মাহমুদের মতন কবি প্রতিদিন বাংলা সাহিত্যে আসেন না । শতাব্দীতে একজনই আসেন ।

লেখক : নাজমুন নাহার, কবি প্রফেসর

লিংক: http://www.shobdoneer.com/minsomnaz/89771

তথ্যসূত্র – আল মাহমুদ কবি ও কথাশিল্পী – কমরুদ্দিন আহমেদ
আধুনিক বাংলা কবিতা বিষয় ও প্রবণতা – ফজলুল হক সৈকত এবং ইন্টারনেট।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: