জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন

রেজাউল করিম খোকন ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনের অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে। এখন অনেক গতিশীল হয়ে উঠছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্রুততাকে বেছে নিতে চাইছে মানুষ। আর্থিক লেনদেনেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সবকিছুকে সহজ, সাবলীল, স্বচ্ছন্দ করে তুলেছে। লেনদেনের ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অনেক কম সময় লাগছে। ফলে অর্থনীতিতে চমৎকার গতির সঞ্চার হয়েছে। দ্রুততম সময়ে লেনদেন নিষ্পত্তি করতে বেশিরভাগ ব্যাংক চালু করেছে অনলাইন সেবা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ভূমিকা ব্যাংকিং খাতে নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছে বলা যায়। নগদ লেনদেনে বিদ্যমান নানা ঝুঁকি সবাইকে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনে উদ্বুদ্ধ করছে। আজকাল অনেকেই প্রচলিত নগদ লেনদেনের চেয়ে ডিজিটাল লেনদেন অধিকতর নিরাপদ মনে করছেন। চালু হওয়া স্বয়ংক্রিয় পরিশোধের বিভিন্ন পদ্ধতির কারণে ব্যাংকগুলোর মধ্যে অনলাইনে এখন দৈনিক গড়ে কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। এর বাইরে অনলাইনে বিভিন্ন ব্যাংকের এক শাখা থেকে অন্য শাখার গ্রাহক বা ব্যবসায়িক পরিশোধও হচ্ছে প্রচুর অর্থ। বর্তমানে অটোমেটেড চেক ক্লিয়ারিং হাউজ (বিএসিএইচ), ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (ইএফটিএন) ও ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচের (এনপিএস) মাধ্যমে দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে অনলাইনে তাৎক্ষণিক আর্থিক লেনদন, চেক পরিশোধ কার্যক্রম চলছে। ক্যাশলেস সোসাইটি গঠনে যে কয়েকটি পেমেন্ট সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তার মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড, বিইএফটিএন, এনপিএসবি, আরটিজিএস, ইন্টারনেট ব্যাংকিং অন্যতম। ডিজিটাল মনিটরিং ২০১৭ অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ৯০% সরকারি পেমেন্ট ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে বছরে ২৩ লাখ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, আন্তঃব্যাংকে স্বয়ংক্রিয় পরিশোধের ক্ষেত্রে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এগিয়ে আছে। বাংলাদেশের এ অগ্রগতির বিষয়টি বেশ প্রশংসা অর্জন করেছে। রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) চালু করেছে। এর মাধ্যমে অনেক কম সময়ে খুব দ্রুত আন্তঃব্যাংক লেনদেন সম্পন্ন হবে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে আন্তঃব্যাংক পরিশোধ ব্যবস্থায় দারুণ এক বিপ্লব ঘটে গেছে। এখন বিএসিএইচ, ইএফটিএন ও এনপিএসের বদৌলতে দ্রুত চেক পরিশোধ হচ্ছে। আগে সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) ক্লিয়ারেন্স পেতে বেশ কয়েক মাস লেগে যেত। ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গিয়ে গ্রাহক হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতেন। গ্রাহক যে উদ্দেশ্যে ঋণ নিতেন তা অনেকাংশে পূরণ হতো না। এখন সিআইবি রিপোর্ট পাওয়ার কাজটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন হচ্ছে। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের দ্রুত বিকাশ ই-কমার্সের প্রসারের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখছে।

উপরন্তু ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক বা ইএফটিএনের মাধ্যমে এক নিমিষেই বিভিন্ন বেতন ভাতা, ইন্স্যুরেন্সের মাসিক-ত্রৈমাসিক প্রিমিয়াম, বোনাস, লভ্যাংশ প্রভৃতির টাকা এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকের নির্ধারিত হিসাবে মানে অ্যাকাউন্টে চলে যাচ্ছে। এজন্য আলাদা করে একটি প্রতিষ্ঠানের সবাইকে নির্দিষ্ট একটি ব্যাংক হিসাব খুলতে হচ্ছে না। দেশের ব্যাংকিং খাতে আর্থিক পরিশোধ ব্যবস্থায় এক বিরাট পরিবর্তন এনেছে ইএফটিএন। বর্তমানে দেশের বড় বড় করপোরেট হাউজ, গ্রুপ বা কোম্পানি তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, বোনাস ইত্যাদির মতো আর্থিক সুবিধা পরিশোধে এই অটোমেটেড পেমেন্ট বা স্বয়ংক্রিয় ইলেকট্রনিক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার আওতায় যাচ্ছে। যার ফলে সময়, বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে, মানুষের ভোগান্তি লাঘব হচ্ছে, ব্যবস্থাপনায় গতি বেড়েছে তুলনামূলকভাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারে ত্রুটির ফলে গত ফেব্রুয়ারি থেকে আরটিজিএস ব্যবস্থায় লেনদেন বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। গত জুলাইয়ে এটা ঠিক হলেও এখন পর্যন্ত লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে সৃষ্ট আতঙ্কভাব কাটেনি। ফলে এ ব্যবস্থায় লেনদেন অনেক কমে এসেছে। গত আগস্টে আরটিজিএসে ৭৬ হাজার ১৯২টি লেনদেনের বিপরীতে ৩৩ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা পরিশোধ হয়েছে। সমস্যা শুরুর আগের মাস গত জানুয়ারিতে মোট ১ লাখ ১২ হাজার লেনদেনের বিপরীতে পরিশোধ হয়েছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে লেনদেন কিছুটা বাড়লেও এখন পর্যন্ত আগের অবস্থায় ফেরেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, দেশের ৫৫টি ব্যাংক বর্তমানে ৫৫টি আরটিজিএসে যুক্ত। এসব ব্যাংকের ১০ হাজার ৫৮টি শাখার মধ্যে এ ব্যবস্থায় লেনদেন করছে ৭০০ শাখা। দ্রুত লেনদেন নিষ্পত্তির সর্বাধুনিক প্রযুক্তির আরটিজিএস ব্যবস্থার বাইরে থাকা শাখার অধিকাংশ রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের শাখাগুলোকে দ্রুততম সময়ে আরটিজিএসে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

যেসব ব্যাংক এখনো ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা চালু করেনি শিগগির চালু করে তাদের আরটিজিএসে যুক্ত হতে হবে। ইলেকট্রনিক লেনদেন বিষয়ে ধারণা দিতে ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং গ্রাহকদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ, সভা-সেমিনারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক বৈঠকে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বেশিরভাগ শাখা ইলেকট্রনিক পরিশোধ ব্যবস্থায় যুক্ত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে আছে সরকারি ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংককে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত না করা পর্যন্ত পুরো সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না।

সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদেরও মাসিক বেতনভাতা, বোনাস এখন ইএফটিএনের মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছে বর্তমানে। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন পরিশোধ, বিভিন্ন কেনাকাটা, উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থ পরিশোধে ইএফটিএনের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবে কোটি টাকারও বেশি অর্থ স্থানান্তর হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইএফটিএন গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকা পালন করছে সন্দেহ নেই। দেশের পেমেন্ট সিস্টেমে নতুন এক বিপ্লবের সূচনা হয়েছে এর মাধ্যমে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম পরিশোধ, তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশ পরিশোধ, সরকারি কর পরিশোধসহ নানা ধরনের প্রয়োজনীয় আর্থিক লেনদেন ইএফটিএনের মাধ্যমে চমৎকারভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যতবেশি গতিশীলতা আনা যায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর অনুকূল একটা প্রভাব পড়ে। ডিজিটাল ট্রান্সফারের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার পাশাপাশি গতিশীলতা আনা অনেকটাই সম্ভব। এ কাজে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বীমা, সরকারি-বেসরকারি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো বর্তমানে ডিজিটাল ট্রান্সফারকে বেছে নিচ্ছে। এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি প্রমাণ করে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুযোগ-সুবিধাগুলো জনজীবনে বেশ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। আগামী দিনগুলোতে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ডিজিটাল ব্যবস্থা আরো গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে।

দেশের ব্যাংক খাতে প্রযুক্তিনির্ভর পরিশোধ ব্যবস্থার যেমন প্রসার ঘটছে এর পাশাপাশি নতুন নতুন ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। এ বাস্তবতায় এ ধরনের লেনদেনে মানি লন্ডারিং এবং অন্যান্য ঝুঁকি কমাতে গ্রাহক, ব্যাংকারসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে। দিনে দিনে গোটা ব্যাংকিং ব্যবস্থা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ায় শুধু আইটিবিষয়ক কর্মকর্তাদের নয়, পুরো ব্যাংকিং খাতের কর্মীদের আইটি বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। বর্তমানে আমাদের এখানে অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমে গতি বাড়লেও যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। প্রযুক্তিভিত্তিক পরিশোধ ব্যবস্থায় মানবসম্পদকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি এনবিআর, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নির্বাচন কমিশন, আইসিটি মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

লেখক : ব্যাংকার

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: