পাকিস্তানের গুহাবাসী গ্রাম

হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী ।
পাকিস্তানে তীব্র আবাসন-সংকটের কথা সবার জানা। দেশটিতে চলছে তীব্র অর্থনৈতিক টানাপোড়েনও। তা সত্ত্বেও সেদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দেশবাসীকে ওয়াদা দিয়েছেন ৫০ লাখ নতুন বাড়ি বানিয়ে দেয়ার। এতেই বুঝা যায়, আবাসনসঙ্কট দেশটির সরকার ও জনগণকে কতখানি পীড়িত করছে।

এ-ই যখন অবস্থা তখন চলুন যাওয়া যাক সেদেশের রাজধানী ইসলামাবাদের কাছে একটি গ্রামে। ইসলামাবাদ মহানগরী থেকে উত্তরপশ্চিম দিকে ৬০ কিলোমিটারের মতো দূরে অবস্থিত গ্রামটির নাম হাসান আবদাল। সেই গ্রামের হাজারতিনেক মানুষ বাস করে মাটির নিচে গুহা বানিয়ে তৈরি করা বাড়িতে।

ভাবছেন, কী অসভ্যতা! এ যুগেও গুহাবাসী! যা-ই ভাবুন, গুহাবাড়িগুলো বোমাহামলা থেকে নিরাপদ, ভূমিকম্প প্রতিরোধক এবং দামে সস্তা – জানালেন গ্রামবাসী হাজী আবদুল রশীদ, যিনি নিজেও একটি গুহাবাড়ির বাসিন্দা, যেসব বাড়িকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘বুরাই’।

তা হাজী রশীদ সাহেবের ‘বুরাই’টি কেমন? না, এমন আর কী! এই কয়েকটি অগোছালো কামরা আর একটি জানালা। জানালাটি দিয়ে হু হু করে হাওয়া ঢোকে।

এলাকার মজুররাই হাতে কোদাল চালিয়ে এসব গুহা কেটে থাকে। গুহার দেয়ালটি কাদা দিয়ে ভালোভাবে লেপে দেয়া হয়। তারা বলে থাকে যে এরপর আর ভূমিধ্বসেও বাড়ির কোনো ক্ষতি হবে না। হাজি রশীদ বলেন, ”এমন জিনিস আর কোথাও পাবেন না। ধরুন, আপনি একখানা মাটির ঘর বানালেন। বৃষ্টি পড়লে সেটি ধ্বসে যেতে পারে। কিন্তু এই বাড়ি বৃষ্টিতে কিসসু হবে না। বোমা পড়ুক কী ভূমিকম্প হোক, এসব বাড়ি সবকিছু থেকে নিরাপদ।”

এ এলাকাটি পত্তন করেছিল মোগল বংশের একটি শাখা। সে হিসেবে গত প্রায় ৫০০ বছর ধরে এখানকার বাসিন্দারা গুহাবাড়িতে বাস করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব বাড়ি ও শহরাঞ্চলের বাড়ির দামের তফাৎ আকাশপাতাল হয়ে যাওয়ায় গুহাবাড়ির দিকে সবার নজর পড়েছে। আমির উল্লাহ খান নামে এক বাসিন্দাও সেকথাই বললেন।
আধুনিক যুগের গুহাবাসীরা আরো একটি কারণে এসব বাড়ির গুণগান করেন। কারণটি হলো, পাকিস্তানের আবহাওয়ায় এসব বাড়ি বেশ আরামদায়ক – গ্রীষ্মে যখন দেশটির আবহাওয়া ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে উঠে যায় তখন গুহাবাড়িগুলো থাকে ঠাণ্ডা আর প্রচণ্ড শীতের সময় থাকে উষ্ণ।

কথা হলো মুহাম্মদ সোহাইল নামে একজনের সঙ্গে। তিনি বছরের বাকি সময়টা অন্যখানে কাটালেও গ্রীষ্মের শুরুতেই চলে আসেন হাসান আবদাল গ্রামে। গ্রীষ্মটা গুহাবাড়িতেই আরামে কাটে তাঁর।

এতসব সুবিধা শুনে গুহাবাড়িকে স্বর্গ মনে হচ্ছে? এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। এখানে সুবিধার পাশাপাশি কিছু অসুবিধাও আছে। এই যেমন ধরুন, বাড়িগুলোতে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায় না। টিভি চালাতে কিংবা মোবাইল ফোনে চার্জ দিতে বিদ্যুৎসংযোগের ক্ষেত্রেও অনেক ঝামেলা। বাড়িতে পানি সরবরাহ, সে তো রীতিমতো বিলাসিতা!

তারপরও গুহার দিকে ঝুঁকছে কিছু মানুষ। কারণ, যে গুহাবাড়িটি কমবেশি ৪০,০০০ রূপীতে মিলবে, সেরকম একটি ইটের বাড়ির দাম শুরুই হবে আড়াই লাখ রূপি থেকে। এলাকাবাসী বলে, এমনকি গ্রামের চাইতেও সস্তা এসব গুহা। রিয়্যাল এস্টেট এজেন্ট সাখি রিয়াজের কথায়, এমনকি নিভৃত গ্রামেও যদি বাড়ি বানানোর জন্য ছোট এক টুকরা জমি কিনতে চান, কমপক্ষে পাঁচ লাখ রূপির নিচে তো পাবেনই না। সূত্র : সউদি গেজেট

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: