ব্লু ইকোনমি খুলে দেবে নতুন দিগন্ত

আবু আলী ।

সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে দেশ। সাগরের বিশাল জলরাশি এবং এর তলদেশের অফুরন্ত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক বিপ্লবের ঘটানো প্রক্রিয়া চলছে। সমুদ্র জয়ের পর সেই বিপ্লব বাস্তবায়নের রোডম্যাপ এগিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রসম্পদের সঠিক জরিপ ও তা আহরণ করতে পারলে দেশের অর্থনীতি পাল্টে যাবে। তাদের মতে, দেশের প্রবৃদ্ধি সাড়ে সাত শতাংশ থেকে ডাবল ডিজিটে নিতে সমুদ্র অর্থনীতির বিকল্প নেই। এ জন্য সমন্বিত উদ্যোগে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্লু অর্থনীতির ৩ থেকে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি মূল অর্থনীতিতে যুক্ত হবে, যা দেশ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে নিয়ামকের ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, সমুদ্র অর্থনীতিকে কাজে লাগাতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উপযুক্ত অংশীদার চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এ ছাড়া ১৭ মন্ত্রণালয় এবং ১২টি সংস্থার সমন্বয়ের জন্য ব্লু ইকোনমি সেল গঠন করেছে সরকার। এ সেলটি সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাজের সমন্বয় এবং তদারকি করছে। ব্লু ইকোনমি সেলের মূল সমন্বয়ক অতিরিক্ত সচিব গোলাম শফিউদ্দিন এনডিসি বলেন, সুনীল অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আমাদের কার্যক্রম চলছে। বিশাল সম্ভাবনাময় এ খাত পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে পারলে দেশের অর্থনীতির চিত্র পাল্টে যাবে।

জানা গেছে, ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। জাতিসংঘের সমুদ্রসীমাবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ১ লাখ ৮২ হাজার ৮১৫ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমা অর্জিত হয়। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশের সব প্রাণিজ-অপ্রাণিজ সম্পদে সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

সূত্র জানিয়েছে, এ সমুদ্রসীমায় তেল, গ্যাস, মূল্যবান খনিজ সম্পদ, মৎস্য আহরণ এবং সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয় ২০১৪ সালে। বিশ্ব অর্থনীতিতে তিন থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকা- হচ্ছে সমুদ্র ঘিরে। বিশ্বের ৪৩০ কোটি মানুষের ১৫ শতাংশ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ। ৩০ শতাংশ গ্যাস ও জ্বালানি তেল আসছে সাগর থেকে। সুনীল অর্থনীতি বাংলাদেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ঘটিয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও ভারত তাদের সমুদ্র এলাকা থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ এরই মধ্যে শুরু করেছে। প্রতিবেশী এ দুই দেশ সমুদ্র থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ শুরু করলেও বাংলাদেশ এখনো উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেনি। তবে আমাদের সীমার মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপক। প্রাকৃতিক গ্যাস পেতে দ্রুত জরিপ করে তা উত্তোলনের কাজ শুরু করতে হবে।

পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদ বলেন, মিয়ানমারসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে সমুদ্রে আমাদের বিপুল সম্ভাবনা আছে। সেগুলো কাজে লাগাতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে দেশ আরও এগিয়ে যাবে। আমরা সেখান থেকে তেল-গ্যাসসহ অন্য সম্পদ আহরণ করতে পারি। সমুদ্রের এ সম্ভাবনা বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাওসার আহমেদ বলেন, সমুদ্রের সম্ভাবনার একটি হচ্ছে গ্যাস। বর্তমানে আমাদের ল্যান্ডে গ্যাস আছে ১০ থেকে ১২ ডিসিএফ। প্রতিবছর ব্যবহার করি ১ ডিসিএফ। সে জন্য আমি বলি ১০-১২ বছর পর গ্যাসের সংকট দেখা দেবে। এ জন্য সমুদ্রে সম্ভাবনাময় গ্যাস কাজে লাগাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তা হলেই কেবল আমাদের গ্যাস সংকট অনেকটা দূর হতে পারে। তিনি আরও বলেন, সমুদ্রের এ বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে যে পরিমাণ জনসম্পদ দরকার, সে পরিমাণ দক্ষ জনসম্পদও আমাদের নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সমুদ্রবিজ্ঞান বিষয়ে সর্বপ্রথম পাঠদান করছি। পাঁচ বছর আগে থেকেই এ পাঠদান চলছে। এজন্য সমুদ্র বিষয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পাঁচ ধরনের কৌশল নেওয়া হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে সামুদ্রিক সম্পদের বহুমাত্রিক জরিপ দ্রুত সম্পন্ন করা, উপকূলীয় জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সমুদ্রবন্দরগুলোর আধুনিকীকরণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি, অগভীর ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কার্যক্রম জোরদারকরণ, সমুদ্রে ইকোটুরিজম এবং নৌবিহার কার্যক্রম চালু, সমুদ্র উপকূল ও সমুদ্রবন্দরগুলো দূষণমুক্ত রাখা। এসব কৌশল বাস্তবায়নে বেশকিছু সুপারিশও করা হয়েছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রে জরিপ, টেকসইভাবে আহরণ, সমুদ্র নিরাপত্তা, সমুদ্রবিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণাসহ বিভিন্ন বিষয়কে সমন্বিত করে প্রয়োজনে জাতীয় পর্যায়ে একটি নতুন সংস্থা বা অধিদপ্তর স্থাপন করা যেতে পারে। এ ছাড়া ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগাতে সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা বা পাহারা জোরদার এবং কেবল মৎস্যসম্পদ আহরণই নয়, পাশাপাশি সমুদ্র থেকে অন্য সম্পদ আহরণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে শুধু মাছই রয়েছে প্রায় ৫০০ প্রজাতির। এ ছাড়াও শামুক, ঝিনুক, শ্যালফিশ, কাঁকড়া, অক্টোপাস, হাঙরসহ রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী, যেগুলো বিভিন্ন দেশে অর্থকরী প্রাণী হিসেবে বিবেচিত। এ প্রাণিসম্পদ ছাড়াও ১৩টি জায়গায় আছে মূল্যবান বালু, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম। এগুলোয় মিশে আছে ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিমেনাইট, জিরকন, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইট। এসব সম্পদ অতিমূল্যবান। তা ছাড়া সিমেন্ট বানানোর উপযোগী প্রচুর ক্লে রয়েছে সমুদ্র তলদেশে। এসব প্রকৃতিক সম্পদ আহরণ করতে পারলে দেশের অর্থনীতি সত্যিকার অর্থেই পাল্টে যাবে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেভ আওয়ার সি’র তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্র থেকে মাছ ধরে শুধু রপ্তানি করেই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। গভীর সমুদ্র থেকে আহরিত টুনা মাছ সারাবিশ্বে খুবই জনপ্রিয়। সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী মাছটি দেশের আন্তর্জাতিকমানের হোটেলগুলোয় আমদানি করা হয়ে থাকে। এই মাছ সঠিকভাবে আহরণ করতে পারলে নিজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করাও সম্ভব।

সেভ আওয়ার সি’র নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল হক বলেন, বাস্তবতা হলো, দশ বছর পর দেশে কোনো গ্যাস থাকবে না। তাই সমূদ্রে সম্পদ আহরণের বিকল্প নেই। আমাদের সমুদ্রসম্পদ বলতে মাছ, তেল, গ্যাস ও খনিজ পদার্থ। এ সম্পদ আহরণে পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। এ জন্য আগে দরকার ওশান এক্সপ্লোরেশন বা সমুদ্রসম্পদ খুঁজে বের করা। কোথায় কী কী প্রজাতির এবং কী পরিমাণ মাছ আছে, কোন জায়গায় তেল গ্যাস রয়েছে- তা পরিবেশসম্মতভাবে খুঁজে বের করতে হবে। এরপরে বাইওডাইভারসিটি বা জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে সমুদ্রসম্পদ আহরণ করতে হবে। যেমন আজ থেকে দশ বছর আগে ইলিশের আকাল ছিল। এখন কিন্তু রপ্তানি হচ্ছে। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এগুলো শুধু টোনা ফিশ এবং শৈবাল রপ্তানি করেই বছরে বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারের জন্য ইতোমধ্যে জাহাজ কেনার নীতিমালা সহজ করা হয়েছে। পুরনো জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে ১০ বছরের পরিবর্তে ১৮ বছর করা হয়েছে। এ ছাড়া মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট ৯টি লং লাইনার এবং ৭টি পর্সনেইনার জাহাজ কেনার অনুমতি পেয়েছে। এ ছাড়া টুনা মাছ ধরার জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া গভীর সমুদ্রে কোন অঞ্চলে কী মাছ আছে তা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জানার জন্য বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানির যৌথ প্রকল্প নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট সূত্র জানিয়েছে, ১০ জন বিজ্ঞানীসহ ১০৫ জন ইনস্টিটিউটে কাজ করছে। নতুন করে আরও ২৮ জন বিজ্ঞানী নিয়োগ করা হবে। বিজ্ঞানীরা নৌবাহিনীর সহযোগিতায় সমুদ্রগামী জাহাজ ও মৎস্য অধিদপ্তরের আর ভি মিন সন্ধানী জাহাজে গবেষণা করছেন।

এ ছাড়া সামুদ্রিক মাছ থেকে খাবার, মাছের তেল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, শস, চিটোসান ইত্যাদি তৈরি করা সম্ভব, যার ফলে নতুন ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, সরকারের এসডিজির ১৪ নম্বর ধারায় টেকসই উন্নয়নের জন্য সামুদ্রিক সম্পদের অনুসন্ধান ও সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। আর তাই ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণে এই সামুদ্রিক সম্পদ আহরণে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। সমুদ্র অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করতে সরকার সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যকে ব্যবহার করে কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন এবং কুয়াকাটার পর্যটনশিল্পকে আরও বিকশিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

সূত্র: আমাদের সময়

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: