হাঁটার গতি গাড়ির গতি একই!

রাজধানী ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়৷ আর এই যানজটে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা জাতীয় বাজেটের ১১ ভাগের এক ভাগ৷ বুয়েটের গবেষণায়এই তথ্য উঠে এসেছে৷
শনিবার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের(বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট (এআরআই) এবং রোড সেফটি ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এই তথ্য জানান ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন৷ তিনি বলেন, ‘‘নগরের যানজট যদি ৬০ শতাংশ কমানো যায় তবে ২২ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো যাবে৷”

তিনি তাদের গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, ‘‘ঢাকায় যানজটের কারণে পিক আওয়ারে গণপরিবহনগুলোর গতিবেগ ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারে নেমে এসেছে, যেখানে পায়ে হেঁটে চলার গড় গতিও ৫ কিলোমিটার৷” তার মানে হল পিক আওয়ারে গাড়ির গতি এবং হাঁটার গতি একই৷
১২ বছর আগেও এই গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার৷ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার ফলে যাত্রীদের মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে৷ এই চাপ আবার কাজ করছে অন্যান্য রোগের উৎস হিসেবে৷ যানজট ৯ ধরনের মানবিক আচরণকে প্রভাবিত করছে৷

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিউটের অধ্যাপক ডা.তাজুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যানজটের কারণে মানুষের ধৈর্য এবং সহনশীলতা কমে যাচ্ছে৷ মানুষের মধ্যে খিটখিটে ভাব কাজ করছে৷ অল্পতেই মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়ছে৷ এ কারণে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা জাতীয় রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ৷ কেউ কেউ হিংস্র আচরণও করেন৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘এটা মানুষকে আইন এবং রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থার প্রতিও বীতশ্রদ্ধ করে তুলছে৷ মানুষের মধ্যে আইন অমান্য করার প্রবণতা বাড়ে৷ কারণ মানুষ যখন দেখে আইন অমান্য করলেই ভাল থাকা যায়, তখন সে আইন মানতে চাইবে না৷”

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশে এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নাই৷ তবে আমরা দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যানজটের এই নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করছি৷”

প্রতিমাসেই এখন এআরআই ঢাকার যানবাহন, সড়ক দুর্ঘটনা, যানজটের নানা দিক নিয়ে সেমিনার ও আলোচনার আয়োজন করে৷ গত মার্চে আরেকটি সেমিনারে একই গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘‘২০১৫ সালের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী, ঢাকায় দৈনিক প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ যাত্রা (ট্রিপ) হয়৷ একজন মানুষ কোনো একটি বাহনে উঠে নির্ধারিত গন্তব্যে নামলে একটি যাত্রা বা ট্রিপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷

বর্তমানে যানজটে দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে৷ ঢাকা শহরে গণপরিবহনগুলা প্রতিদিন ৩৬ লাখ ট্রিপে ৩৫ শতাংশ যাত্রীকে কর্মক্ষেত্রে নিয়ে যায়৷”

যানজটের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে নানা ধরণের গবেষণা হয়েছে৷ ২০ হাজার থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক ক্ষতির হিসাব দেয়া হচ্ছে৷ তার সেইসব হিসেবের গড় করে এআরআই যানজটের কারণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বলে হিসেব করেছে৷ সড়ক খাতে বিনিয়োগ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও যানজট নিরসনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই ক্ষতির অন্তত ৬০ শতাংশ বা ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব৷

এআরআই -এর অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ঢাকার গণপরিবহণ ব্যবস্থায় একটা নৈরাজ্য চলছে৷ এখানে গণপরিববহণের দিকে কারুর নজর নাই৷ বলা হচ্ছে তুমি যেভাবে পার ব্যবসা করো৷ কোনো সাবসিডি নাই৷ ফলে নিম্নমানের পরিবহণ ও চালক দিয়ে চলে গণপরিবহণ ব্যবস্থা৷ এই জনপরিবহণ দেখার জন্য ন্যূনতম লোকবলও নাই৷ নাই দক্ষ প্রতিষ্ঠান৷”

তিনি বলেন, ‘‘এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা৷ সেটা না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে৷”

গত বছর বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ বছরে ঢাকায় যান চলাচলের গড় গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে ৭ কিলোমিটার পর্যন্ত নেমে এসেছে৷ যানজটের কারণে বাংলাদেশের রাজধানীতে প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে৷

আর পরিবেশ আন্দোলন বাংলাদেশের ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখানো হয়, যানজটের কারণে দিনে ৮০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়৷

সড়ক ও জনপথ বিভাগের ২০১৩ সালে তার এক গবেষণায় দেখানো হয়, শুধু যানজটে কর্মঘণ্টা নষ্টের জন্য বছরে ক্ষতি হয় ১২ হাজার কোটি টাকা৷

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যানজটের কারণে অর্থিক ক্ষতি নিয়ে আরো অনেক গবেষণা আছে৷ কিন্তু আমরা দেখেছি ঢাকা শহরে যনজটের নানা কারণের মধ্যে একটি বড় কারণ হল ব্যক্তিগত যানবাহন (প্রাইভেট কার)৷ এই প্রাইভেট কার ব্যবহারের কারণে কম সংখ্যক মানুষ বেশি সড়ক ব্যবহার করছে৷ মাত্র চারজনের জন্য একটি প্রাইভেটকার যে পরিমান সড়ক ব্যবহার করে, গণপরিবণ ওই একই পরিমাণ সড়ক দখল করে ৬০ জন যাত্রী পরিবহন করে পারে৷ তাই আমরা যদি গণপরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত করতে পারি তাহলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমবে এবং যানজটও কমবে৷”

তিনি বলেন, ‘‘গণপরিবহণ ব্যবস্থা ভালো নয় বলেই অনেকে ধার করে বা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে একটি ব্যক্তিগত পরিবহণ কিনছেন৷ তিনি তাতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হয়ে আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে৷”

তিনি বলেন, ‘‘গণপরিবহনের জন্য এখন মেট্রোরেলের কাজ চলছে৷ এটা হয়তো কিছুটা সমাধান দেবে৷ কিন্তু আরো বিকল্প গণপরিবহণ দরকার৷ আর দরকার রাস্তা প্রশস্ত করা৷ আর এটা চাইলেইতো সম্ভব হয়না৷ তাই ঢাকার নৌপথ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা দরকার৷”
ডয়চে ভেলে।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: