অনলাইনে ঘৃণার চাষবাস

বড় কোনো ঘটনার পর আমি মন দিয়ে অনলাইনে প্রাসঙ্গিক মন্তব্য পড়ার চেষ্টা করি৷ বলা বাহুল্য, বেশিক্ষণ সম্ভব হয়ে ওঠে না৷ অসুস্থ বোধ করি৷ বিপুল সংখ্যক মানুষ কী পরিমাণ ঘৃণা আর হিংসা প্রকাশ করেন, সেটা দেখলে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার কথা৷
মুহম্মদ জাফর ইকবালকে আক্রমণ করা হয়েছে– এই খবরের নীচে পাবেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল কেন মারা গেলেন না সেটা নিয়ে আফসোস৷ তাঁর নামে বিষোদগার, গালাগালি৷ নেপালে আমাদের একটি উড়োজাহাজ ক্র্যাশ করেছে, সেটাকে ঘিরে পাবেন নারীরা কেন উড়োজাহাজ চালায়, সেটা নিয়ে নারীদের বিরুদ্ধে গালাগালি, কুৎসিত যৌনরসাত্মক মন্তব্য৷ ক্রিকেট দল কোনো একটি ম্যাচে পরাজিত হয়েছে, সেই দলের ধর্মীয় সংখ্যালঘু খেলোয়াড়টিকে তাঁর ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ– এসব আকছার ঘটছে৷

মনোবিকারগ্রস্ত এই হাজার হাজার মানুষ আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে– এটি ভাবলেই মনটা বিষন্ন হয়ে উঠে৷ অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না৷ এই ভূখণ্ডের মানুষ সবসময়ই সহমর্মী, মমতাময়ী, পরষ্পরের বিপদে-আপদে উড়ে এসে সহায়তা করা মানুষ৷ এদের একটি বড় অংশ কেন হিংসাত্মক হয়ে উঠছে এর কারণ বের করা জরুরি৷
অনেকেই বলার চেষ্টা করেন যে, এই হিংস্র ও কদর্য মন্তব্যকারীদেরকে আইনের আওতায় আনলেই এই বাড়াবাড়ি বন্ধ হয়ে যাবে৷ আমি খানিক দ্বিমত পোষন করি৷ প্রথম কথা হচ্ছে, এরা সংখ্যায় অগুনতি, এদেরকে আইনের আওতায় আনার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা আইনশৃংখলা বাহিনীর নেই৷ দ্বিতীয়টি আসলে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ৷ আপনি আইনের শক্তিতে এদেরকে হয়তো ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পারবেন, কিন্তু এদের মনের যে ঘৃণা, সেটিকে নির্মূল করা হবে না৷ এই সম্মিলিত ঘৃণার একটি প্রকাশ সমাজের উপর রয়েই যাবে৷

তাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মানসিক বিকৃতির কারণ খুঁজে বের করা এবং সেই কারণগুলো নির্মূল করা৷ আমার মনে হয়, শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বেই এখন এটি একটি বড় সমস্যা হিসেবে ধরা দিচ্ছে৷ আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকালীন সময়টিও মিডিয়ায় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন করেছি৷ সেখানে হোয়াইট সুপ্রিমেসি’র বর্ণবাদ এবং ইমিগ্র্যান্ট মানুষদের প্রতি বিরূপ মনোভাব একটি বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে৷ একই কাণ্ড হয়েছে ইংল্যান্ডে৷ ব্রেক্সিট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় অনেক মানুষকে আমি প্রকাশ্যেই ইমিগ্র্যান্টদের প্রতি প্রবল ঘৃণা উগড়ে দিতে দেখেছি৷

আশা করি মনোবিজ্ঞানীরা এর সঠিক কারণ গবেষণা করে বের করবেন৷ আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণে আমি সাদামাটাভাবে কিছু কারণ ভেবে বের করেছি৷ একটি বড় কারণ হতে পারে মানুষের জীবনযাত্রায় নিয়ত অস্থিরতা৷ মানুষ জীবনের চাপ অত্যধিক করে ফেলেছে৷ প্রতিমুহূর্তে চাহিদা বাড়ছে, প্রতিক্ষণ প্রতিযোগিতা বাড়ছে৷ এই চাপ নেয়ার জন্য আমাদের মানসিক গড়ন প্রস্তুত নয়৷ সুতরাং মন বিদ্রোহ করছে, এই চাপ ও চাহিদার নিয়ত যুদ্ধে পড়ে যাওয়ার কারণে আশেপাশের সবকিছুর বিরুদ্ধেই একটি বিরূপ মানসিকতার জন্ম হচ্ছে৷

বাংলাদেশের মতো দেশে এর ছাপ আরো অনেক বেশি কারণ, এই দেশে আমরা সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি৷ সমাজে এক শ্রেণির লোক নানান ছলচাতুরি করে সব দখল করে নিচ্ছে, অন্যদিকে বিশাল একটি গোষ্ঠী পিছিয়ে পড়েছে৷ এরা যথেষ্ট শিক্ষা পায় না, বিনোদন পায় না, সমাজের মূল নেতৃত্বে আসতে পারে না৷ না পারার এই ব্যর্থতার জন্য তারা বাকি সবাইকে দায়ী করছে৷ পিছিয়ে পড়ার কারণে এরা মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে৷ সেই মানসিক পঙ্গুত্বের কারণেই তারা বাকি মানুষদেরকে বিচার করছে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের মতো ক্ষুদ্র মানদণ্ডে৷
মানুষের মব মেন্টালিটি উগরে দেয়ার যে অবারিত দ্বার ইন্টারনেটের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে, সেই খোলা পথে তাই এরা উগরে দিচ্ছে মনের ভেতর চেপে থাকা সকল ঘৃণা৷ যে নারী তার চাইতে এগিয়ে, সেই নারীকে সে সহজেই সেক্সিস্ট মন্তব্য করতে পারছে, যে মানুষ তার চাইতে বেশি আলোকিত, তাঁকে হত্যা করতে চাইছে৷ মানুষের মনের ঘৃণা বন্ধ করতে হলে এই বৈষম্য কমিয়ে আনার ব্যাপারে সিরিয়াসলি কাজ করা দরকার৷ নৈতিক, উদারমুখী শিক্ষাব্যবস্থা সবার জন্য নিশ্চিত করা জরুরি৷ সামাজিকভাবে ভালোবাসা ও সহমর্মিতাকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন৷ এটি একদিনের কাজ নয়, কিন্তু এই কাজটি গুরুত্বের সাথে শুরু করার এখনই সময়৷

আমরা যদি মানুষকে মানুষ বানাতে না পারি, তাহলে এই সম্মিলিত ঘৃণা একদিন আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে ঘায়েল করে ফেলবে৷ সভ্যতার পথে পৃথিবী অনেক হাজার বছর হেঁটে এসেছে, এখনই যদি আমরা পরষ্পরের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এক পৃথিবী বানাতে না পারি, তাহলে আর কবে পারবো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.