আগামী ২০ বছরের মধ্যে বসবাস অযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে প্রিয় ঢাকা!

পানির অভাবে আগামী ২০ বছরের মধ্যে বসবাস অযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে প্রিয় ঢাকা, এমন ভয়ঙ্কর তথ্যই দিয়েছে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)।

ঢাকা মহানগরীর জনস্বাস্থ্যের জন্য এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীগুলোর দূষণ এতোটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে সেগুলো নাব্যতা হারিয়ে এখন মৃতপ্রায়। অথচ ঢাকা ও আশপাশের পানির উৎস এই নদীগুলো।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’র একটি বিশেষজ্ঞ দল ২৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ ২০১৬ পর্যন্ত ৪ দিনব্যাপী ঢাকার পাশের এই চারটি নদীর দূষণ পরীক্ষা এবং দখল-ভরাট পর্যবেক্ষণ করে। আর এই পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা যায়- বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীর প্রায় অধিকাংশ স্থানের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যের কোঠায়। ফলে মৎস্য ও জলজ প্রাণীর বিলুপ্তিসহ নদীগুলো এখন মৃত প্রায়।

যেভাবে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি এবং তার ফলাফল :
ঢাকা মহানগরীতে পয়ঃবর্জ্যরে পরিমাণ ১৪ লাখ ঘনমিটার। যার মধ্যে পরিশোধন ক্ষমতা সম্পন্ন পাগলা পয়ঃবর্জ্য পরিশোনাগারের মাধ্যমে মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন করা হচ্ছে। বাকি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পানির গুণগত মানের অবনতি; মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতি; শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ও গৃহস্থালী কাজে ব্যবহার অনুপযোগী; জীবানুজনিত দূষণ; মানুষের স্বাস্থ্যের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে দৈনিক ২২ হাজার কিউবিক মিটার অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে পড়ছে। এসব বর্জ্যে রয়েছে ক্রোমিয়াম, লেড, সালফিউরিক এসিড ইত্যাদি। ট্যানারি থেকে নির্গত বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্য শুধু বুড়িগঙ্গার পানিকেই দূষিত করছে না, নদীর তলদেশ ও উভয় পাড়ের মাটি এমনকি বাতাসকেও ভয়াবহভাবে দূষিত করছে। নদী পাড়ের মানুষগুলো পানি ও বাতাসবাহিত নানা রোগে ভুগছেন। ট্যানারিগুলো সাভার ও কেরানীগঞ্জে চামড়া শিল্প নগরীতে সরানোর কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন না হওয়ায় নদী দূষণ অব্যাহতভাবে চলছেই।

টেক্সটাইল কারখানার বর্জ্যসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার ১ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য নদীতে পড়ছে। অনেক শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধনাগার নেই, আবার যেসব শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধনাগার রয়েছে সেসব শিল্পকারখানা তা পরিচালনা করে না। ফলে শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে।

ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নৌযানের মাধ্যমে যাতায়াত করে থাকে। এছাড়াও নৌযানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মালামাল পরিবহন করা হয়ে থাকে। নৌযানগুলোর সৃষ্ট বর্জ্য সংরক্ষণ বা ধারণ করার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় সেই বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা মহানগরী ও আশেপাশের এলাকার গৃহস্থালী বর্জ্য, শিল্পকারখানা ও হাসপাতালের কঠিন বর্জ্যরে ৪০ শতাংশ যা প্রায় ৩ হাজার টন নালা-নর্দমা, খাল, জলাভূমি হয়ে নদীতে পড়ছে।

সর্বোপরি ঢাকা মহানগরী ও আশেপাশের টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ এলাকার পয়ঃবর্জ্য এবং গৃহস্থালী বর্জ্য, শিল্পকারখানা ও হাসপাতালের কঠিন বর্জ্য, হাজারীবাগ এলাকায় অবস্থিত ট্যানারি বর্জ্য, শিল্প কারখানার বর্জ্য বিশেষ করে টেক্সটাইল ডাইয়িং কারখানা, নৌযান নির্মাণ, মেরামত ও রঙকরণ, নৌযান থেকে নির্গত তেল এবং নৌযানের বর্জ্য নদী দূষণের অন্যতম কারণ।

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষিত ১৩টি নদীর মধ্যে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীর পানির মান খুব খারাপ। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে কোনো প্রাণ বাঁচতে পারবে না বলেও উল্লেখ করা হয়। যদিও শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব এই পরিবেশ অধিদপ্তরেরই।

অপরদিকে নদীর দূষিত পানি ব্যবহার অনপুযোগী হওয়ায় প্রয়োজন মেটাতে আমরা ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছি। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর ১০ ফুট করে নীচে নেমে যাচ্ছে। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবনাক্ত পানি উজানে প্রবাহিত হচ্ছে। আর এমতাবস্থায় নদীগুলো দূষণমুক্ত করার পাশাপাশি পানি প্রবাহ বৃদ্ধি না করা হলে, আগামী ২০ বছরের মধ্যে পানির অভাবে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।

নদী দূষণরোধে পরিবেশবাদীদের সুপারিশ :
আরো পয়ঃবর্জ্য পরিশোনাগার স্থাপন করতে হবে; গৃহস্থালী বর্জ্য পানি প্রবাহে ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে; ট্যানারিগুলো জরুরিভিত্তিতে স্থানান্তর এবং বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন ও বর্জ্য পরিশোধন করতে হবে; শিল্পকারখানায় বর্জ্য পরিশোনাগার স্থাপন এবং নিয়মিত তা পরিচালনা করতে হবে; নৌযানের ডিজাইনে বর্জ্য সংরক্ষণ বা ধারণ করার স্থায়ী কাঠামো গড়ে তুলতে হবে; বিআইডব্লিউ কর্তৃক নৌযানের বর্জ্য সংগ্রহকরণ ও তা পরিশোনপূর্বক পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; নৌযানের বর্জ্য ও তেল নদীতে ফেলা থেকে বিরত থাকাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে পানির এই সঙ্কটাপন্নবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পবার সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশবিদ প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান।

বাংলামেইল২৪ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.