আজ বসন্ত . . . .

`ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত…।

আজ পয়লা ফাল্গুন, ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। কোকিলের মায়াবী সুরে শ্যামলিমার জেগে ওঠার দিন আজ।পলাশ, শিমুলে লেগেছে আগুন,  জবুথবু শীতের আষ্টেপৃষ্ঠে বন্ধন থেকে জীর্ণতা সরিয়ে প্রকৃতির ফুলে ফুলে সেজে ওঠার দিন এই বসন্ত।

বসন্ত মানে নতুন প্রাণের কলরব। বসন্ত মানেই মৃদু হাওয়ায় প্রিয় মানুষের হাত ধরে হাঁটা। মিলনের ঋতু বসন্তই মনকে সাজায় বাসন্তী রঙে, মানুষকে করে জীর্ণতা সরিয়ে নতুন শুরুর প্রেরণা। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় বসন্তের শাশ্বত রূপটি তাই এমন- ‘ফুল ফুটুক, আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত।’

বসন্ত কচিপাতায় আনে নতুন রঙ, আলোর নাচন। সাথে মানব মনেও হয়তো। তাই তো সবুজ পত্রপল্লবের আবডালে লুকিয়ে বসন্তের দূত কোকিল শোনায় মদির কুহুকুহু ডাক। আর এই ডাকে ব্যাকুল হয় বিরহী মন।

সাহিত্যে প্রেম আর মিলনের ঋতু বলেও বসন্ত সুপরিচিত। বসন্তের শুরুর দিনে রাঙা মনের সৌন্দর্য ফুটে উঠে পোশাকেও, থাকে ফাগুনের আগুন ঝরানো রং। বসন্তের বাতাস যেমন প্রকৃতিকে জাগিয়ে তোলে নতুনভাবে।

বসন্তের আগমনী গানে পুরো বাংলাদেশ যেন আটপৌরের আগল ভেঙে বসন্তের আহ্বানে জেগে ওঠে। তরুণীদের পরনে শোভা পায় বাসন্তী রঙের শাড়ি, খোঁপায় বাসন্তী ফুল। গালে বসন্তের মনকাড়া আল্পনা। তরুণদের বসনেও বাসন্তী ছোঁয়া। বাদ যায় না শিশু কিংবা বয়োবৃদ্ধরাও। সবার মন তাই গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে ‘আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে/এত বাঁশি বাজে/ এত পাখি গায়…।’

তবে বসন্ত শুধু বাঙালি জীবনে কেবল আনন্দের নয়। ফাগুনের শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার লাল রং মনে করিয়ে দেয় বায়ান্নর শহীদদের কথা। ফুল-ফাগুনের এই বসন্তেই ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার। যাঁদের রক্তে আমরা পেয়েছিলাম প্রাণের ভাষা বাংলা।

আর ভাষা শহীদের স্মৃতিকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করে নতুনের আবাহনে তারুণ্য মেতে ওঠে বসন্ত উৎসবে।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে সেই তারুণ্যের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে শাহবাগ, রমনা বটমূল, ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে রাজধানীজুড়ে; শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে নিভৃত পল্লীর ধুলোমাখা পথেও।

আর এত আয়োজন আর উপলক্ষের মাঝে গাঁয়ের সবুজ বনের আড়াল থেকে একটি কোকিল বুঝি সুরে সুরে মনে করিয়ে দেয় প্রিয়জনের কথাই। যানজট আর ব্যস্ত জীবনের নানা জটে থাকা নগরীর মানুষের কানেও কালেভদ্রে কোকিল শুনিয়ে দেয় বসন্ত এসে গেছে। তাই তো বসন্ত হয়ে ওঠে ভালোবাসার ঋতু; প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার ঋতু।

বসন্তের সাজ

প্রথমে ঠাণ্ডা পানিতে মুখ ধুয়ে প্যান কেক বা কমপ্যাক্ট পাউডার দিয়ে মুখে বেইসকরে নিন। বসন্তের সকালে ও রাতে বাদামি, গাঢ় বাদামি বা পিচ রঙের ব্লাশনব্যবহার করতে পারেন। সাদা ও সোনালি রঙের মিশ্রণে আইশ্যাডো দিয়ে চোখসাজাতে পারেন। স্লিভলেস ব্লাউজ পরলে চোখকে স্মোকি করে সাজাতে হবে।ঠোঁটে হালকা রঙের লিপস্টিক ব্যবহার করতে হবে। তবে সাজে ভিন্ন মাত্রাআনতে চাইলে হালকা মেকআপের সঙ্গে ঠোঁটে চড়া লাল রঙ দিতে পারেন।কপালে দেয়া টিপ আপনার সাজকে আরও উৎসবমুখর করবে।

বসন্তের পোশাক

বসন্তে সব মেয়েরই পছন্দ শাড়ি। তবে বর্তমানে একরঙা শাড়ির ট্রেন্ডটাই বেশি।এর সঙ্গে হালকা সাজটা বেশ মানিয়ে যায়। শাড়ি এক রঙের পরলে ব্লাউজটাবাহারি ভালো লাগে। হালকা হলুদ জমিন ও কমলা পাড়ের শাড়ির সঙ্গে লালব্লাউজ মানানসই। কমলা রঙের ব্লাউজ পরতে পারেন হালকা সবুজ জমিন হলুদপাড়ের শাড়ির সঙ্গে। পয়লা ফাল্গুনে ঘটি হাতা, খাটো হাতার ব্লাউজের আবেদনতো আছেই। ব্লাউজে ছোট ঘণ্টা, কলকা ব্যবহার করা যেতে পারে। শাড়ির সঙ্গেকনট্রাস্ট করে ব্লাউজের রংটা বেছে নিন।ফাল্গুন মানেই ফুলে ফুলে প্রকৃতি ছেয়ে যাওয়া। সেই সঙ্গে নারীদের বাসন্তী শাড়িরসঙ্গে ফুলের সাজ। বাসন্তী তাঁতের শাড়ী পরে খোপা কিংবা এলো চুলে কয়েকটিফুল না হলে কি চলে? ফালুনের পুরো সাজটাই যেনও মাটি হয়ে যায় ফুল ছাড়া।

ফাল্গুনের সারাদিন প্রকৃতি যেমন ফুলে ফুলে বসন্তকে বরণ করে নেবে, তেমনিবাঙালী ললনারাও প্রকৃতির সাথে নিজেদের একাত্মতা ঘোষনা করবে। ফুলেফুলে সবার খোপা দুলে উঠুক এটাই কাম্য।

ফুলের রিং
আগে নারীরা ফাল্গুনে যেমন খোপার এক পাশে একটি বা দুটি ফুল গুঁজে দিতোএখন সেই স্টাইল অনেকটাই চলে গিয়েছে। ফুলের গহনা ও ফুল লাগানোরধরণে এসেছে অনেক পরিবর্তন। খুব ছিম ছাম গহনা পরে মাথায় একটি বড়ফুলের রিং পরার প্রচলনটাই বেশি এখন। গত কয়েক বছর ধরেই এই প্রচলনটাবেশি দেখা যাচ্ছে।

তরুণীরা শাড়ি, সেলোয়ার কামিজ কিংবা ফতুয়ার সঙ্গে মাথায় এই ফুলের রিং গুলো পরতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। সব ধরণের সাজের সঙ্গেই মানিয়ে যায় এই ফুলের রিং গুলো। একটি বোহেমিয়ান ধাঁচের এই ফুলের রিং গুলো সাজে আনে ভিন্নতা ও আভিজাত্য।

খোলা চুলে ফুল
চুলে ফুল পরতে হলেই চুল বাধতে হবে এমন ধারণায় এসেছে পরিবর্তন। এখনতরুণীরা খোলা চুলেই পরছে নানান রকমের ফুল তবে গোলাপ ফুল পরার প্রচলনএকেবারেই কমে গিয়েছে। ফ্যাশন সচেতন নারীরা এখন জারবেরা কিংবা অর্কিডলাগাতেই বেশি পছন্দ করে।

বেনীতে ফুল
ইদানিং বেনির মাঝে মাঝে একটি একটি করে ছোট ফুল গুঁজে দেয়ার চলএসেছে। এই ফাল্গুনে আপনিও বেনির মাঝে ছোট ছোট ফুল গুঁজে নিতে পারেন।

কৃত্রিম ফুল
তাজা ফুলের পাশাপাশি কৃত্রিম ফুলও চলচে সমান তালে। গতবারের মতএইবারের ফাল্গুনেও নারীদেরকে চুলে কৃত্রিম ফুল কিংবা ফুলের ক্লিপ পরতে দেখাযাবে।

গহনা
ফাল্গুনে ফুলের গহনাটাই বেশি চলে। গাদা ফুল কিংবা রজনীগন্ধা দিয়ে তৈরী করা তাজা ফুলের গহনা গুলো শাড়ির সঙ্গে বেশ মানিয়ে যায়। ইদানিং কৃত্রিম ফুলের গহনাও খুব চলছে। এবারের ফাল্গুনে কৃত্রিম ফুলের গহনার বেশ চাহিদা রয়েছে। এছাড়াও বরাবরের মতই লম্বা মালার চলও থাকবে। সেই সঙ্গে হাত ভরে পরে নিন রংবেরঙের কাঁচের চুড়ি।

মেকআপ
দিনের বেলা বাইরে গেলে মুখে হালকা করে ফেসপাউডার লাগিয়ে নিন। কন্সিলার দিয়ে মুখের ছোটখাটো দাগ ঢেকে দিতে পারেন। মুখে হালকা ব্লাশন দিন। এই বছর লালের চাইতে কমলা লিপস্টিক চলছে বেশি। তাই সাজের সঙ্গে মানিয়ে গেলে কমলা লিপস্টিক দিয়ে ঠোট জোড়াকে রাঙিয়ে নিতে পারেন। চোখে হালকা আই শ্যাডো দিন। এক্ষেত্রে ন্যুড, ব্রাউন, গোল্ডেন, কপার ইত্যাদি রঙ গুলো বেশি ভালো লাগবে।

ছেলেদের সাজ

পোশাক
পাঞ্জাবী, ফতুয়া, টি-শার্ট যাই পড়ুন না কেন তাতে রাখুন ফাল্গুনের ছোঁয়া। পছন্দ করুন লাল, হলুদ, সবুজ রঙের অথবা এগুলোর চেক মিশেলের কাপড়। বেশ মানিয়ে যাবে।

আনুসাঙ্গিক
ছেলেদের তো গহনা বা মেকআপের প্রয়োজন হয় না। তবে একটু টুকিটাকি আনুসাঙ্গিক যেমন- হাতঘড়ি, সানগ্লাস, রুমাল প্রভৃতি সঙ্গে রাখতে পারেন। দারুণ মানিয়ে যাবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বঙ্গাব্দ ১৪০১ সাল থেকে প্রথম ‘বসন্ত উৎসব’ উদযাপন করার রীতি চালু হয়। সেই থেকে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ বসন্ত উৎসব আয়োজন করে আসছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আজ দিনভর চলবে তরুণ-তরুণীদের বসন্তের উচ্ছ্বাস প্রকাশ। ফোন, ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলবে শুভেচ্ছা বিনিময়। আজ নানা আয়োজনে বসন্তকে বরণ করবে বাঙালি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.