উচ্চ মূল্যের পোশাকে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

প্রচলিত পোশাকের চেয়ে দাম কয়েকগুণ বেশি৷ বাজারও বাড়ছে দ্রুত৷ তাই সম্ভাবনাও অনেক৷ পোশাকে বিশ্বের দ্বিতীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও দামি ফ্যাশন পণ্যের এই বাজারে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে৷

একটি সাধারণ পোলো র্শাট রপ্তানি করলে ৩ ডলার দাম পাওয়া যায়৷ সেখানে সুতা, কাপড়ের মান ভিন্ন হলে কিংবা বাড়তি এমব্রোয়ডারি, প্রিন্টিং, ওয়াশ যুক্ত হলে দাম পাওয়া যায় কমপক্ষে আট ডলার, বলছিলেন বাংলাদেশের জায়ান্ট অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক হাসান৷ গত কয়েক বছর ধরে তিনি প্রচলিত পোশাকের বাইরে এমন দামি আর ফ্যাশনেবল পণ্য তৈরি ও রপ্তানির চেষ্টা করছেন৷
ফারুক হাসানের মতে, বাংলাদেশের অনেক তৈরি পোশাক কারখানার উদ্যোক্তাই এখন ফ্যাশনেবল ও দামি পোশাকের এই বাজার ধরার চেষ্টা করছেন৷ আবার নতুন অনেক কারখানাই গড়ে উঠছে শুধু এ ধরণের পোশাক তৈরির জন্যে৷ কিন্তু বাজারটি ধরতে কিছুটা বেগও পেতে হচ্ছে৷
তৈরি পোশাকের দামি পণ্যের বাজারটাই এমন৷ কম দাম দিয়ে ক্রেতা আকর্ষণ করা যাবে এমন নয়৷ আবার ভালো পণ্য তৈরির সক্ষমতা থাকলেই হবে না, অন্য অনেক কিছুই এর সাথে নির্ভর করে, বলেন এই খাতের গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম৷

কোন পোশাকের দাম বেশি
পোশাকের দাম কেমন হবে তা নির্ভর করে কাপড়ের ধরন আর ডিজাইনের উপর৷ তুলা ছাড়াও বিভিন্ন উদ্ভিদের পাতা, মাশরুমসহ নানা জৈব উপাদান থেকেও এখন সুতা তৈরি হয়৷ সেগুলো দিয়ে তৈরি কাপড়ের পোশাকের দাম হয় বেশি৷ আবার সাধারণ শার্ট, প্যান্ট, টি শার্টের তুলনায় বিশেষায়িত বাহিনীগুলোর ইউনিফর্মধর্মী পোশাকও বেশি দাম দিয়ে কেনেন ক্রেতারা৷ এর বাইরে আছে স্পোর্টস আর অ্যাথলেটিক আইটেমও৷ স্যুট-ব্লেজারধর্মী পোশাকেও কয়েকগুণ বেশি দাম পাওয়া যায় বলে জানান ফারুক হাসান৷

বিশ্বে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে পোশাকেও তার ছোঁয়া লাগছে৷ যুক্ত হচ্ছে সেন্সর, ডিভাইস বহন করা যায় এমন সুবিধা৷ থ্রিডি প্রিন্টারসহ আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যেও এখন পোশাক তৈরি হয়৷ এমন ‘স্মার্ট পোশাকের’ বাজারও দিন দিন বাড়ছে৷ গত বছর ঢাকায় আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ফ্যাশনোলজি সামিট’এ যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফ্যাশন প্রযুক্তি ম্যাগাজিনের সম্পাদক মুচানেতা কাপফুন্দে এই বাজারের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন৷ তাঁর হিসাবে ২০২০ সালের মধ্যে স্মার্ট ফেব্রিক্স দিয়ে তৈরি ফ্যাশনের বাজারের আকার দাঁড়াবে ১৩ হাজার কোটি ডলার৷ এই ধরণের পোশাকের বড় আকারের উৎপাদন এখনও সেভাবে শুরু হয়নি৷ যারা এখন থেকেই প্রস্তুতি নিবে তারাই এই বাজারে এগিয়ে যাবে বলে জানান তিনি৷

রপ্তানির ৯০ ভাগই কম দামি
২০১৭-১৮ অর্থবছরে তৈরি পোশাক থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৩,০৬১ কোটি ডলার৷ এর মধ্যে শার্ট, ট্রাউজার, জ্যাকেট, টি-র্শাট, সোয়েটার এই ৫টি পণ্য থেকেই এসেছে ২,২৪০ কোটি ডলার৷ বাংলাদেশে পোশাক রপ্তানির ৭০ থেকে ৮০ ভাগ বরাবর এই পণ্যগুলোরই দখলে থাকে, বিশ্ববাজারে যার দাম তুলনামূলক কম৷ এই বাজারে পোশাক সরবরাহকারীদের প্রতিযোগিতাও বেশি৷ বিজিএমইএ-র সহ-সভাপতি ফারুক হাসান মনে করেন বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৯০ ভাগই এখন এমন পণ্যের দখলে৷ বাকি ১০ ভাগ ফ্যাশনেবল বা দামি পণ্য, যার আকার দাঁড়াচ্ছে ৩০০ কোটি ডলারের মতো৷ অথচ এই পণ্যের বিশ্ববাজার ১৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি বলে জানান তিনি৷
দামি বা সৌখিন পোশাকের এই বাজার প্রতি বছরই বাড়ছে৷ বিশ্বের ফ্যাশন শিল্পের ট্রেন্ডস নিয়ে প্রতিবছর প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘ম্যাককেনসি অ্যান্ড কোম্পানি’৷ তাদের ‘দ্যা স্টেইট অব ফ্যাশন ২০১৯’ অনুযায়ী, চলতি বছর পোশাকের বাজার ৪ থেকে ৫ ভাগ বাড়বে৷ আর লাক্সারি বা বিলাসবহুল পণ্যের বাজার বাড়বে ৪.৫ থেকে ৫.৫ শতাংশ৷
তবে বিলাসবহুল পণ্য ব্যবহারকারীর ৭০ শতাংশ বলছেন, তাঁরা টেকসইভাবে উৎপাদিত পোশাকের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে বেশি দাম দিতেও রাজি আছেন৷

২১ ভাগ কারখানার সক্ষমতা আছে
ক্রেতারা ছবি আর একটি নমুনা পাঠান৷ সেই আদলে পোশাক তৈরি করা হয় কারখানাগুলোতে৷ এজন্য নির্দিষ্ট কাপড় কেটে, সেগুলোকে নমুনামত সেলাই করে জোড়া লাগালেই হয়৷ বাংলাদেশে সিংহভাগ শ্রমিক শেষ স্তরের কাটা এবং সেলাইয়ের এমন কাজেই জড়িত৷ দামি পোশাক তৈরির ক্ষেত্রে এর বাইরে আরো কিছু বাড়তি মূল্য সংযোজনের প্রয়োজন হয়৷ এজন্য টেকনোলজিক্যাল আপগ্রেডেশন জরুরি বলে জানান বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. মোয়াজ্জেম৷ তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর মধ্যে ২১ ভাগ মাত্র এই প্রযুক্তিগত ‘আপগ্রেডেশন’ করেছে৷ ‘‘এখন সব কারখানাতেই সাধারণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয়৷ কিন্তু যেগুলো দিয়ে কারখানার কমপ্লায়েন্স বোঝায় কিংবা সক্ষমতা বোঝায় সেগুলো মাত্র ৫ ভাগের এক ভাগ কারখানা ব্যবহার করছে৷” তাঁর মতে, এই ২১ ভাগ কারখানা যে-কোনো ক্রেতার চাহিদা মেটাতে বা উচ্চ মূল্যের পোশাক তৈরিতে সক্ষম৷ তবে শুধু উচ্চ মূল্যের পোশাকের বাজার ধরতেই নতুন করে বিশেষায়িত অনেক কারখানা গড়ে উঠছে বলেও জানান তিনি৷
বিজিএমইএ-র ওয়েবসাইটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার হাজার কারখানা রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত৷ তাদের মধ্যে প্রায় আড়াইশটি এখন উচ্চ মূল্যের পোশাক রপ্তানি করছে বলে জানান সংগঠনটির সভাপতি ফারুক হাসান৷ তিনি বলেন, ‘‘স্যুট, ব্লেজার এই ধরনের ভ্যালু অ্যাডেড প্রোডাক্টের দিকে আমরা যাচ্ছি৷ আগে শুধু নরম্যাল ওয়াশের ডেনিম করতাম, এখন ইলাস্ট্রেন্ট ডেনিম, লাইক্রা ডেনিম, নিট ডেনিম করছি৷ বিভিন্ন ধরণের ওয়াশ হচ্ছে৷ গার্মেন্টেও ভিন্নতা আসছে৷” সবার সহযোগিতা পেলে সামনে আরো এগিয়ে যাওয়ার সম্ভব বলে মনে করেন তিনি৷
গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানি করলেও এই বাজারে প্রবেশ করেছে এক দশকেরও কম সময়ে৷ তখন যারা প্রথম এই উদ্যোগ নেয় তাদের মধ্যে একটি ইপিলিয়ন গ্রুপ৷ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন আল-মামুন ডয়চে ভেলেকে জানান বিলাসি পোশাকের ব্র্যান্ডগুলো এখন ধীরে ধীরে বাংলাদেশে আসছে এবং তাদেরকে তারা সন্তুষ্টও করতে পারছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘আগে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এ ধরনের কাজ করতে পারতাম না৷ কিন্তু গত দশ বছরে আমরা এই দক্ষতাটা অর্জন করেছি৷” একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেকে যেখানে ৫ ডলারের হুডি রপ্তানি করছে সেখানে তারা ২০ ডলার মূল্যের হুডিও ব্র্যান্ডগুলোর কাছে বিক্রি করেছেন৷

বছরে ইপিলিয়ন ২৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে৷ যার অর্ধেকই এখন আসছে এই ধরনের পণ্য থেকে৷ রিয়াজ আল মামুন বলেন, মূলত গত তিন বছর ধরে তারা বাজারটি ভালোভাবে ধরতে পেরেছেন৷ এক্ষেত্রে তুরস্কের সাথে তাদের প্রতিযোগিতা হচ্ছে৷ ‘‘ওদের ওখানে আগে যেসব কাজ যেত তার কিছু এখন আমরা পাচ্ছি,” বলে জানান তিনি৷
দামি পোশাকের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতকারক চীন৷ তাদের রপ্তানি আদেশের কিছুটাও বাংলাদেশ ধরতে পারছে বলে জানান রিয়াজ আল মামুন৷

সমস্যা ভাবমূর্তি
রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানায় ব্যাপক সংস্কার উদ্যোগ নেয়া হয়৷ এর ফলে কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা যে মানে বেড়েছে তা পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে নেই বলে দাবি করেন রিয়াজ৷ তাঁর কারখানাটিও সর্বোচ্চ মানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘লিড গোল্ড’ সনদ অর্জন করেছে৷
বাংলাদেশে যত সবুজ কারখানা আছে, তা আর কোনো দেশে নেই বলে দাবি করেছেন ফারুক হাসানও৷ কিন্তু তারপরও দামি পোশাক বাজার ধরার ক্ষেত্রে ইমেজ সংকট একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে জানান তাঁরা৷ ‘‘ভালো পণ্য তৈরি করলেই বিক্রি হবে না৷ কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংটাও এক্ষেত্রে জরুরি,” বলেন ফারুক হাসান৷ বিষয়টির সাথে একমত প্রকাশ করে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ওভারঅল আমরা ইমেজ সংকট কাটিয়ে উঠতে পেরেছি৷ কিন্তু হাই ভ্যালু প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো জরুরি৷ সেটার জন্য বন্দরের প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকা জরুরি৷” তাঁর মতে, কারখানার বাইরের যে ব্যবসার পরিবেশের ইস্যু আছে সেখানটাতে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে৷ এজন্য উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি৷ ‘‘এই এফোর্ট শুধু সাপ্লায়ার পর্যায়ে দিলে হবে না এজন্য জাতীয় পর্যায়ে চেষ্টা করতে হবে,” বলেন তিনি৷ তাঁর মতে শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে সামনের দিনে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে উচ্চ মূল্যের পোশাকের বাজার ধরার কোনো বিকল্প নেই৷

সূত্র: ডয়চে ভেলে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.