কেবল গণপরিবহন ব্যবস্থাই ঢাকাকে মুক্তি দিতে পারে

মেহেদী আল আমিন ও ইয়ামিন সাজিদ |

ঢাকায় বর্তমানে পৌনে দুই কোটি মানুষের বাস থাকলেও দুই দশক পরে তা বেড়ে দাঁড়াবে সোয়া দুই কোটিতে। আর রাজপথে প্রতিদিনের ২ কোটি ৯০ লাখ ট্রিপ (যাতায়াত) ২০৩৫ সালে বেড়ে হবে ৫ কোটি ১০ লাখে। এ অবস্থায় রাজধানীকে বাসযোগ্য ও সচল রাখতে গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

সরকারের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) বড় কিছু প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হলেও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি ও গণপরিবহন ব্যবস্থার আশানুরূপ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ না থাকায় যানজট থেকে মুক্তি মিলবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিপরীতে তারা অধিক যাত্রী ধারণে সক্ষম বড় ও মানসম্মত বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি অধিক স্থান দখলকারী যান যেমন— অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল কমানোর কথা বলেছেন। একই সঙ্গে বাস, টেম্পো ও বাইসাইকেলের সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় অপেক্ষাকৃত কম বিনিযোগে যানজট নিরসন করে যাত্রীসেবা বাড়ানো সম্ভব বলে দেখিয়েছেন তারা।

আরএসটিপি বিশ্লেষণ করে ব্র্যাক ও কোপেনহেগেন কনসেনসাসের ‘ঢাকা’স ফিউচার আরবান ট্রান্সপোর্ট: কস্টস অ্যান্ড বেনিফিটস অব ইনভেস্টমেন্ট ইন পাবলিক অ্যান্ড প্রাইভেট ট্রান্সপোর্ট’ শীর্ষক যৌথ গবেষণায় দেখানো হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ১২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গতি প্রতি ঘণ্টায় ৬ কিলোমিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৩ দশমিক ৭ কিলোমিটারে উন্নীত হবে আগামী ২০ বছরে। তবে সরকারি বিনিয়োগ ঠিক রেখে (৪৫ বিলিয়ন ডলার) ব্যক্তি খাতের ব্যাপ্তি কমিয়ে মোট ১০৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগেই সুফল পাওয়া যাবে বেশি। তবে সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গাড়ি ও অটোরিকশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে কমানোর পাশাপাশি আধুনিকায়ন ঘটাতে হবে গণপরিবহন ব্যবস্থায়। এতে ১৭ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের পাশাপাশি সড়কের প্রয়োজন হবে কম।

গণপরিবহনের সংখ্যা ও মান বাড়ানোর পাশাপাশি বিকল্প এ প্রস্তাবে দক্ষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এর জন্য বাস লেন এবং বাস প্রায়োরিটিজ, সমন্বিত সড়ক ব্যবস্থা, সমন্বিত টিকিট ব্যবস্থা, মানসম্পন্ন বাস টার্মিনালের কথাও সুপারিশ করা হয়েছে। ভালো মানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের কথা বলা হয়েছে।

যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ঘটালে যাত্রীসেবা ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে আর রাস্তার ২০ শতাংশ কম ব্যবহার হবে, যা যানজট কমিয়ে গতি বৃদ্ধিতে আরো কার্যকর হবে। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে ২০৩৫ সালে প্রতিদিন যাতায়াত স্বাভাবিকের ৩১২ মিলিয়নের (প্যাসেঞ্জার-কিলোমিটার) পরিবর্তে হবে ৩৬০ মিলিয়ন (প্যাসেঞ্জার-কিলোমিটার)। ফলে ১৬ শতাংশ বেশি পথ ভ্রমণ সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা (ইউআরপি) বিভাগের অধ্যাপক ড. সারোয়ার জাহান বলেন, আরএসটিপি পরিকল্পনায় ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারকেই উত্সাহিত করা হচ্ছে। এ জাতীয় পরিকল্পনা করে যানজট কমানো যাবে না। যানজট কমাতে হলে সিঙ্গাপুর-হংকংয়ের মতো ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ওপর ৪০-৫০ শতাংশ জ্বালানি শুল্ক আরোপ করতে হবে। তখন মানুষ গণপরিবহনে চলাচলে আগ্রহী হবে।

গবেষণায় স্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকলে ২০৩৫ সালে ঢাকায় রাস্তায় কতটি যানবাহন থাকতে পারে তার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে বিকল্প প্রস্তাবে কোন যান কত শতাংশ হারে বাড়ালে বা কমালে যানজট নিরসন করে রাজধানীকে সচল ও গতিশীল রাখা যাবে, তারও একটি হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বাভাবিক হারে প্রতি বছর ৪ শতাংশ করে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩৫ সালে ঢাকায় বাসের সংখ্যা হবে ১১ হাজার ৭৪০টি। বিকল্প প্রস্তাবে প্রতি বছর তা ৬ শতাংশ করে বাড়িয়ে বাসের সংখ্যা ২০ হাজার ২৫৬টিতে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প প্রস্তাবে টেম্পোর সংখ্যা বার্ষিক ৩ শতাংশের পরিবর্তে ৬ শতাংশ করে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৪০১টিতে উন্নীত করতে হবে বলে জানানো হয়েছে। একইভাবে বাইসাইকেলের সংখ্যা বার্ষিক ২ শতাংশের পরিবর্তে ৪ শতাংশ করে বাড়িয়ে ৪ লাখ ২১ হাজার ৩৭০টিতে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে ব্যক্তিগত গাড়ি ও জিপের সংখ্যা বার্ষিক ৫ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩৫ সাল নাগাদ ৫ লাভ ৭৯ হাজার ৯১০টি হবে ধরে নিয়ে বিকল্প প্রস্তাবে তা ২ শতাংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে ৩ লাখ ২২ হাজার ৪৫২টিতে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। অটোরিকশা বার্ষিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩৫ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৭৮টি হবে বলে ধারণা করা হয়েছে। বিকল্প প্রস্তাবে তা বার্ষিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে ৭০ হাজার ১৪০টিতে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়। আর বার্ষিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩৫ সালে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪৭৯টি হবে বলে ধারণা করে এ বৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশে রেখে ১ লাখ ১১ হাজার ৯০৬টিতে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, সড়কে অল্প জায়গা নিয়ে অধিক যাত্রী পরিবহন করতে পারে এমন যানবাহন বৃদ্ধি করতে হবে। এক্ষেত্রে আধুনিক ও মানসম্পন্ন বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে কঠোর না হলে এসব বিনিয়োগ কাজে আসবে না। বিনামূল্যে সড়ক ব্যবহারের সুযোগ কমিয়ে আনতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় এখন আর পুরোপুরি বিনা পয়সায় রাস্তা ব্যবহার করা যায় না। যে যত বেশি রাস্তা ভ্রমণ করবে, তাকে তত বেশি টাকা পরিশোধ করতে হবে। সরকারের অন্যান্য সেবার মতো সড়ক ব্যবহারকেও একটি সেবা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে মূল্য পরিশোধের মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

ঢাকা শহরের যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি। প্রায় ৩৮ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করে থাকে ব্যক্তিগত গাড়ি, যেগুলোয় গড়ে দেড় (১ দশমিক ৫) জন করে যাতায়াত করে। আর ৩৮ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করে বাস, যেগুলোয় গড়ে ৫০ জন করে যাতায়াত করে। এছাড়া ১২ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করে রিকশা, যেগুলোয় গড়ে দুজন করে যাতায়াত করে। অবশিষ্ট ১২ শতাংশ সড়ক অন্যান্য যানবাহন চলাচলে ব্যবহার হয়।বণিক বার্তা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.