জীবন্ত কবরে ৬৯ দিন

২০১০ সালে চিলির এক খনি দুর্ঘটনায় প্রায় ৮০০ মিটার মাটির নিচে ৬৯ দিন আটক পড়ে থাকেন ৩৩ খনিকর্মী। সেই জীবন্ত গণকবরে তাদের দিনযাপন ও উদ্ধারের রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়ে পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক-লেখক হেক্টর টোবারের লেখা বইয়ের সারাংশ উপস্থাপন করেছেন হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

সান জোহে খনিটি অবস্থিত চিলির আতাকামা মরুভূমি এলাকায়। খনিতে ঢোকার যে ঢালু পথটি, সেটি শুরু হয়েছে একটি গোলাকার, পাথুরে পর্বতের প্রায় শীর্ষদেশ থেকে। এর প্রবেশদ্বার পাঁচ বাই পাঁচ মিটার আয়তনের হলেও এটি ক্রমেই সরু হয়েছে। এ পথ দিয়েই ট্রাক, ফ্রন্ট লোডার ও পিকআপ ঢোকে আর সংগৃহীত খনিজদ্রব্য নিয়ে বেরিয়ে আসে। এখানেই ঘটে সেই গা শিউরে ওঠা ঘটনাটি, যাতে ৩৩ জন খনিকর্মী ভূপৃষ্ঠ থেকে ৮০০ মিটার (প্রায় এক কিলোমিটার) নিচে আটকে ছিলেন দীর্ঘ ৬৯টি দিন ও রাত।
সেদিন ছিল ২০১০ সালের ৫ আগস্ট। সকালবেলা। খনিতে যথারীতি কাজ শুরু হয়েছে। অনেকে প্রায় ৮০০ মিটার নিচে কাজ করছিলেন। কাজ মানে সদ্য আহরিত লৌহ আকরিকগুলো ট্রাকে বোঝাই করা। তাদের ৩০ মিটার ওপরে কাজ করছিলেন আরো একদল কর্মী। মাটি থেকে ৭০০ মিটার নিচে আরেকটি কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন আরেক দল কর্মী। পাথর খোদাই করে এই কক্ষটি নির্মাণের উদ্দেশ্য এটি জরুরি অবস্থায় আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এর দেয়ালগুলো তেমন মজবুত, এর দরজা হেভি মেটালে তৈরি। বদ্ধঘরটির উত্তাপ কমানোর জন্য বাইরে থেকে পাম্প করে বাতাস আনার ব্যবস্থা আছে। সব মিলিয়ে দুর্যোগকালীন আশ্রয়স্থল হিসেবে ভালোই। তবে দুর্যোগ দুর্বিপাক তো আর প্রতিদিন আসে না, তাই খনিকর্মীরা একে বিশ্রামকক্ষ হিসেবেই ব্যবহার করে থাকেন।
সেদিন দুপুরের খানিক পরে ফ্রাঙ্কলিন লোবোস তার পিকআপটি নিয়ে বিশ্রামকক্ষের (আমরা এখন থেকে কক্ষটিকে এ নামেই ডাকব) দিকে নামছিলেন। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন একদল খনিকর্মী। তারা ওই পিকআকে চড়ে ওপরে উঠবেন এবং দুপুরের খাবার খাবেন। লোবোসের সাথে এ সময় ছিলেন আরেক খনিকর্মী জর্জ গ্যালেগুইলোস। পিকআপটি যখন ভূপৃষ্ঠের ৬শ’ মিটার নিচে, তখন গ্যালেগুইলোস হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘দেখেছ, একটা প্রজাপতি?’
‘আরে দূর, ওটা প্রজাপতি না। এটা সাদা পাথর।’ বলেন লোবোস। কিন্তু হার মানতে রাজি নন গ্যালেগুইলোস। তিনি আবারো বলেন, ‘ওটা প্রজাপতিই।’
মাটির এত নিচে, এমন ঘুটঘুটে অন্ধকারে প্রজাপতি আসবে-এটা বিশ্বাসই করেন না লোবোস। তবে এ নিয়ে গ্যালেগুইলোসের সাথে তর্কেও যান না তিনি। দু’জনই চুপ করে যান। হঠাৎ দু’জনই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠেন। শব্দটা এমন, যেন কোনো বহুতল ভবন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। সাথে সাথে তাদের সামনের দিকটা ধুলোয় ঢেকে গেল এবং তাদের পেছনে পথটি রুদ্ধ হয়ে গেল। বিস্ফোরণের ধাক্কায় বিশ্রামকক্ষের দরজাটি আপনাআপনি খুলে গেল। যেসব খনিকর্মী সুড়ঙ্গপথে দাঁড়িয়ে পিকআপের অপেক্ষায় ছিলেন, তারা দৌড়ে বিশ্রামকক্ষে ঢুকে গেলেন। দেখা গেল, বিশ্রামকক্ষে ডজন দুই লোক আশ্রয় নিয়েছে। কক্ষটিকে তখন মনে হচ্ছিল যেন কোনো পাহাড়ি গুহা। কয়েক মিনিট পর হইচই একটু কমে আসতেই কক্ষের লোকজন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল; যেমন হুড়মুড়িয়ে ঢুকেছিল, তেমন হুড়মুড় করে। ঢালু পথটি দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও ওপরে উঠবে এই তাদের প্রতিজ্ঞা।
এই সময়টাতে বিশ্রামকক্ষের কাছাকাছি ছিলেন আরো কয়েকজন। তাদের একজন লুইস উরজুয়া। তিনি খনির শিফট ম্যানেজার। সাথে ছিলেন তার সহকারী ফ্লোরেনসিও অ্যাভালস এবং ফ্রন্ট লোডার চালক মারিও সেপুনভেদা। তারা সবাই বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন এবং এর প্রবল কাঁপুনিও অনুভব করেছেন। উরজুয়ার সহকারী তাকে বললেন, ‘বস্, খনি কলাপ্স্ করেছে।’
বিপদ আঁচ করতে পেরে তিনজনই ছুটলেন বিশ্রামকক্ষের দিকে, যদি সেখানে কেউ থেকে থাকে তাহলে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু তারা দেখলেন, সেখানে কেউ নেই। এবার তারা ছুটলেন আরো নিচের দিকে। কারণ তারা জানেন, খনির আরো গভীরে কাজ করছেন আরো অনেকে। আটকে পড়া প্রতিটি মানুষকে বের করে আনা উরজুয়ার দায়িত্ব।
বিশ্রামকক্ষের ৪৫ মিটার নিচে সোনা ও তামাযুক্ত পাথর ট্রাকবোঝাই করছিলেন মারিও গোমেজ ও ওমর রেগাদাস নামে দুই প্রবীণ খনিকর্মী। তারা দু’জনই বিস্ফোরণের কাঁপুনি টের পেয়েছেন। কিন্তু রেগাদাস ভেবেছেন, এটা বুঝি শিফট ম্যানেজারের নির্দেশে কোনো রুটিন ব্লাস্ট। ট্রাকভর্তি হতেই সেটি চালাতে শুরু করলেন গোমেজ। কিন্তু ভূপৃষ্ঠে এক শ’ মিটার পথ বাকি থাকতেই ঘন ধুলার মেঘ তাদের পথ আগলে দাঁড়াল। এতই ঘন সেই ধুলার মেঘ, গোমেজ তার সামনে এক মিটারের বেশি দূর দেখতে পেলেন না। অগত্যা তিনি অন্ধকারেই সামনের দিকে চালাতে থাকলেন। এ সময় তার সামনে এসে হাজির উরজুয়া ও অন্য দু’জন। চোখের পলকে তারা ট্রাকে উঠে বসলেন আর চেঁচাতে থাকলেন, ‘চালাও, চালাও!’
ট্রাক চলতে থাকল। একটু পথ যেতেই দেখা গেল ধুলোয় ফের অন্ধকার হয়ে আছে পথটি। এবার ট্রাক থেকে নেমে পড়লেন মারিও সেপুলভেদা। তিনি টর্চ হাতে আগে আগে চললেন ট্রাককে দেখিয়ে। চলতে চলতে তারা দেখা পেলেন ক’জন মেকানিকের, যারা খনির কিছুটা ওপরের অংশে কাজ করছিলেন। আরো কিছু দূর গিয়ে তাদের সাথে দেখা হলো লোবোস ও গ্যালেগুইলোসের ট্রাকের।
ট্রাককে পথ দেখিয়ে নিতে নিতে সেপুলভেদা তার টর্চের আলো ফেললেন দুই ব্যক্তির ওপর। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মানুষ দুটো। লোবোস ও গ্যালেগুইলো বুঝলেন, ভাগ্যক্রমে বেঁচে আছেন তারা। এবার উরজুয়া তাদের আদেশ দিলেন, ‘গাড়ি ঘোরাও’। তা-ই হলো। গাড়ি এবার চলল খনিতে প্রবেশ প্রস্থানের ঢালু পথটি দিয়ে। এমনিতে ঘোরানো-প্যাঁচানো পথ, তার ওপর তাতে পড়ে আছে অসংখ্য পাথরের টুকরো। মনে হচ্ছিল, তারা যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে যাচ্ছেন।
একপর্যায়ে তাদের গাড়ি চলার পথ আর থাকল না। চার দিকে পাথর আর পাথর। বাধ্য হয়ে সবাই গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে চললেন। তারা পথ চলছিলেন হেডল্যাম্প ও টর্চের আলোয়। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ধুলোর ধোঁয়া কমে এলো আর তাতেই তারা ‘সত্যিকার প্রতিবন্ধকতাটির’ দেখা পেলেন। তারা দেখলেন, পুরো পথজুড়ে, ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত পর্বত ধসে পথটি বন্ধ হয়ে গেছে। পর্বতের ধসে পড়া অংশটি ৪৫তলা ভবনের সমান উঁচু এবং ওজন ৬,২৫,০০০ মেট্রিক টন।

 

কোনো পথ নেই

খনিকর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটখাটো মানুষটি হচ্ছে অ্যালেক্স ভেগা। তার উচ্চতা মাত্র এক দশমিক ৬৫ মিটার। তিনি বললেন, ‘আমি এই পাথরের ফাঁক ফোকরের ভেতর দিয়ে গিয়ে দেখে আসতে পারব, বের হওয়ার কোনো পথ আছে কি না?’
কিন্তু উরজুয়া সাফ বলে দিলেন, ‘না’। তার ধারণা, কাজটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। এ দিকে ভেগাও অনড়, তিনি যাবেনই। অগত্যা উরজুয়া তাকে অনুমতি দিলেন আর বললেন ‘খুব সাবধানে কিন্তু!’
শিফট ম্যানেজারের অনুমতি পেয়ে ভেগা তার ছোটখাটো শরীরটি ঢুকিয়ে দিলেন পাথরের স্তূপের ভেতর। হামাগুড়ি দিয়ে কোনোমতে তিন মিটার পর্যন্ত যেতে পারলেন। তারপর তাকে ফিরে আসতে হলো। বললেন, ‘বেরোনোর কোনো পথ নেই।’

 

প্রথম কয়েক ঘণ্টা

ভেগার কথায় সবার মধ্যে বিশেষ করে প্রবীণ খনিকর্মীদের ভেতরে তীব্র হতাশা নেমে এলো। তারা বুঝলেন, শেষের সেদিন সমাগত। যদিও তারা এর আগেও কখনো কখনো খনিতে আটকা পড়েছেন। হয়তো সেটা একটা বড় পাথরখণ্ড, বুলডোজার এসে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেটাকে সরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এটা তো কোনো পাথরখণ্ড নয়, আস্ত একটা দেয়াল। এর কথাই আলাদা।
গ্যালেগুইলো ভাবতে থাকলেন, আহা রে, আমার শিশু নাতিটারে আর বুঝি দেখা হবে না। ভাবতে ভাবতে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। এর আগে দুর্ঘটনায় হাতের দুটো আঙুল হারান গোমেজ। তার মনে হলো, আমার ভাগ্যটাই বুঝি এরকম। একবার গেল আঙুল, এবার যাচ্ছে জীবন।
আটকে পড়া খনিকর্মীরা এবার ভাবতে বসল, কী করা যায়। চিন্তাভাবনা করে তারা দুটো দল বানালো। আটজনের একটি দল খুঁজে দেখবে বাইরে বেরোনোর কোনো পথ পাওয়া যায় কি না। এ রকম একটি পথ খুব দরকার, যাতে বাতাস, পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যায়। তবে এরকম পথ খোঁজার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্তুটি হচ্ছে মই। কিন্তু সান হোসে খনিটি হচ্ছে স্বল্পপুঁজির ব্যবসা। মালিকেরা খরচ বাঁচানোর জন্য অনেকগুলো নিরাপত্তাব্যবস্থা ছেঁটে ফেলেছে। কাজেই এ মুহূর্তে মইয়ের বিকল্প হতে পারে অল্প ক’টি চিমনি।
অপর যে দলটি করা হয়েছে তাদের পাঠানো হলো বিশ্রামকক্ষের দিকে। দু’দল দু’দিকে চলে যেতেই সেকেন্ড ইন-কমান্ড ফ্লোরেনসিও অ্যাভালস উপস্থিত প্রবীণদের বললেন, ‘সাবধানে থাকবেন, কেউ যেন সুযোগের অপব্যবহার করতে না পারে। খানাপিনা আছে, কিন্তু কেউ যেন বেহিসাবি খেতে না পারে। কারণ, আমাদেরকে হয়তো বেশ কিছু দিন এ অবস্থায় থাকতে হবে।’ কথাগুলো তিনি বললেন খুব শান্ত গলায়, যেন এমনটাই স্বাভাবিক। কারণ তিনি আতঙ্ক ছড়াতে চান না।
এ দিকে বিশ্রামকক্ষে গিয়ে খনিকর্মীদের দলটি দেখতে পেল ভূপৃষ্ঠের সাথে এই কক্ষের সবরকম যোগাযোগ বিদ্যুৎ, ইন্টারকম সিস্টেম, পানি সরবরাহ ও বায়ু চলাচল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
অন্য দিকে প্রথম যে দলটি বেরোনোর পথ খুঁজতে বেরিয়েছে তারা একটি জাম্বো সাইজের লিফটারকে চিমনির দিকে নিয়ে গেল এবং ছাদে একটা ফুটো করে ফেলল। সেই ফুটোয় মাথা গলিয়ে সেপুলভেদা যা দেখলেন তা যেন নিজেই বিশ্বাস করতে পারলেন না। একটি মই! এবার তিনি ওপরের দিকে উঠতে লাগলেন, তার পেছনে চললেন রাউল বাসতোস। চার দিকে এমন ধুলো যে, তারা নিঃশ্বাস নিতে পারছিলেন না। আর্দ্রতার কারণে দেয়ালগুলোও পিচ্ছিল হয়ে আছে। এভাবে যাহোক পথ চলছিলেন তারা, এর মধ্যেই আরেক বিপদ মইটির একটি টুকরো ভেঙে সেপু ভেদার দাঁতে এস প্রচণ্ড আঘাত লাগালো। দাঁত থেকে রক্ত তার মুখ ভর্তি হয়ে গেল। তীব্র ব্যথায় বারবার মাথা ঝাঁকাতে লাগলেন সেপুলভেদা, কিন্তু চলা বন্ধ করলেন না।
এভাবে একসময় চিমনির শীর্ষে পৌঁছে গেলেন সেপুলভেদা। হাতের ফ্লাশলাইটের আলো ফেলে চার দিক একবার দেখে নিলেন। একটু পর উঠে এলো বাসতোসও। এবার দু’জন মিলে হেঁটে চললেন খনিতে ঢোকার সেই ঢালু পথটি বেয়ে, যা কিনা পর্বতধসে ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের মনে ক্ষীণ আশা, হয়তো এই ঘোরানো পথটির কোথাও একটুখানি ফাঁক পাওয়া যাবে, যা দিয়ে সবাই বের হতে পারবে। পথের খোঁজে তারা ফ্লাশলাইটের আলো ফেলেন। কিন্তু না, চার দিকে দুর্ভেদ্য দেয়াল পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে। সেপুলভেদা অনুভব করেন, তার শরীরের ভেতর এতক্ষণ যে আশার আলোটি মৃদুভাবে জ্বলছিল, তা নিভে গেছে। তিনি দিব্যচক্ষে দেখতে পান কী ঘটতে চলেছে।
এবার তারা পথ বদলান। খুঁজতে থাকেন নতুন কোনো বাঁক। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যান নতুন এক চিমনি। এটাতে উঠলে আরো ওপরে যাওয়া যাবে। টর্চের আলো ফেলেন তারা। দেখতে পান, এটাতে কোনো মই নেই। হতাশা আর চেপে রাখতে পারেন না সেপুলভেদা। ভাঙা গলায় বলেন, ‘এভাবে হবে না। কিন্তু আমরা ফিরে গিয়ে ওদের কী বলব?’
‘যা সত্য তা-ই বলতে হবে।’ ক্ষীণ গলায় বলেন বাসতোস।

 

আশার সন্ধানে

তা-ই করলেন তারা। চিমনির গোড়ায় ফিরে গিয়ে অপেক্ষমাণ সহকর্মীদের ঘটনা জানালেন। বললেন, খনির প্রবেশপথটি এদিক থেকেও বন্ধ। কাজেই বোরোনোর কোনো পথ নেই। লোকজনের মুখে কোনো কথা নেই। তারা নীরব চোখে তাকাল উরজুয়ার দিকে। তিনি শিফট ম্যানেজার; একটা সিদ্ধান্ত তো দেবেন এটাই যেন তাদের চোখের ভাষা। কিন্তু একটি কথাও বললেন না উরজুয়া। তাকে দেখাচ্ছিল পরাজিত মানুষের মতো। কী বলবেন তিনি। তার তো জানাই আছে খনিতে এভাবে চাপা পড়ে জীবন্ত কবরে মারা যায় কর্মীরা। কখনো মারা যায় খেতে না পেয়ে। জানেন তিনি যে, উদ্ধারকর্মীরা সাত-আট দিন কাজ করে কিছু না পেয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। এসব কথা জানেন বলেই কর্মীদের আশার বাণী শোনাতে মন চাইল না তার। আশার বাণী, সে তো ডাহা মিথ্যা! সবাইকে নিয়ে আগে যেখানে ছিলেন সেখানে ফিরে এলেন উরজুয়া। বললেন, এখন থেকে আমি আর তোমাদের বস নই। আমিও তোমাদেরই একজন। একসাথে সিদ্ধান্ত নেবো সবাই, একসাথে কাজ করব।
উরজুয়া ভেঙে পড়লেও মচকালেন না সেপুলভেদা। অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ তিনি। তার জীবনে একের পর এক দুর্যোগ এসেছে। সব বিপদের সাথে লড়াই করেই এ পর্যায়ে এসেছেন। জন্মের সময় হারিয়েছেন মাকে। তারা ছিলেন ১০ ভাইবোন। বাপ বদ্ধ মাতাল। এর মধ্যেই সংগ্রাম করে বেড়ে উঠতে হয়েছে তাকে। সংগ্রাম তার মজ্জাগত। খনির পদক্রম অনুযায়ী যা তার করার কথা নয়, তা-ই করতে চাইলেন সেপুলভেদা। তিনি পুরো পরিস্থিতি নিজ হাতে নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিলেন। নিজেকে এবং অন্য সবাইকে আশাবাদী করতে চাইলেন। এর মধ্যে ঘটে গেল আরেক ঘটনা। সুঁচিভেদ্য অন্ধকারে ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর কেউ কেউ হঠাৎ হামলে পড়ল খাদ্যভাণ্ডারের ওপর। তারা বিস্কুটের প্যাকেট ও দুধের কার্টন ভেঙে যা পেল হাতিয়ে নিলো এবং পাগলের মতো চিবাতে লাগল। সেপুলভেদা এবার কড়া গলায় হাঁক দিলেন, ‘করছেন কী সবাই? জানেন না এখান থেকে উদ্ধার পেতে আমাদের কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহও লেগে যেতে পারে!’
সেপুলভেদা এবার ইমারজেন্সি ক্যাবিনেটে কী আছে, তা হিসাব নিতে বসলেন। পেলেন পিচ ফল, মটরশুঁটি ও টুনা মাছের টিন। আছে ২৪ লিটার কনডেন্সড মিল্ক এবং ৯৩ প্যাকেট বিস্কুট। সবচেয়ে বড়কথা, কাছেই একটি ট্যাংকে আছে কয়েক হাজার লিটার পানি। ইঞ্জিন ঠাণ্ডা রাখার কাজে এগুলো ব্যবহার করা হয়। সামান্য তেল পড়ে পানির দূষণ কিছুটা ঘটেছে। তবে তারপরও পান করা যাবে, কাউকে পানির অভাবে শুকিয়ে মরতে হবে না।
আটকে পড়া মানুষদের কয়েকজন এবার আরেকটি কাজ শুরু করল। তারা যে এখানে আটকে আছে, ওপরের লোকদের সে কথা জানান দিতে তারা একটি ফ্রন্ট লোডারের হর্ন বাজাতে থাকল। কেউবা মেশিনটিকে জোরে দেয়ালের সাথে ধাক্কা লাগাল। কিন্তু না, ওপর থেকে কোনো জবাব এলো না।
রাত ১০টার দিকে সবাই ঘুমানোর জায়গা খুঁজতে ব্যস্ত হলো। বিপতœীক ওমর রেগাদাসের খুব করে মনে পড়তে লাগল তার ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনীদের কথা। তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গিয়ে পথের ওপর রাখা একটি ফ্রন্ট লোডারে গিয়ে বসে পড়লেন আর ভাবতে লাগলেন বিপর্যয় ঘটার সেই মুহূর্তটির কথা। ভাবলেন, কয়েক টন ওজনের পাথর ভেঙে পড়ল, অথচ একটা লোকও আহত হলো না। নিশ্চয়ই আমাদের ওপর সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ আছে।
একদল গেল সেই চিমনির কাছে, সেপুলভেদা ও বাসতোস যাতে চড়েছিলেন। তারা একটি এয়ার ফিল্টার ও একটি টায়ারে আগুন ধরিয়ে দিলেন। আশা, যদি ধোঁয়া ওপরে ওঠে, তাহলে তারা বুঝতে পারবে যে, ভেতরে আটকে আছে জীবন্ত মানুষ। তারা কোনো কোনো গ্যালারির পাথর সরানোর কাজে লাগাতে চাইল ফ্রন্ট লোডারকে। ভাবল, যদি একটুখানি জায়গা পরিষ্কার করা যায়, তবে ওপরে ওঠার পথ মিলতেও পারে। কিন্তু তারা যতবারই পাথর সরাতে গেল, ততবারই ওপর থেকে ঝুরঝুর করে আরো পাথর পড়ে সে জায়গা বন্ধ করে ফেলল।

দ্বিতীয় দিনের মধ্যাহ্ন। আটকে পড়া ৩৩ জন সবাই একসাথে বসেছে। সেপুলভেদা তাদের ‘দুপুরের খাবার’ দেবেন। খাবার বলতে প্রতিটি লোককে টিনজাত মাছের এক চা চামচ পরিমাণ এবং দু’টি করে বিস্কুট। এটুকু খেয়েই পরদিন দুপুরবেলা পর্যন্ত থাকতে হবে।
মাটির নিচে বেঁচে থাকা

এ দিকে ওপরের লোকজনও বসে নেই। তারা বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছে এবং খনির প্রবেশমুখে ধুলোর মেঘ বের হতে দেখেছে। উদ্ধারকর্মীদের একটি দল একটি পিকআপ ট্রাক নিয়ে ৪৫০ মিটার পর্যন্ত নিচে নামতে পারলেন। এরপর ধসে পড়া পর্বতের দেয়ালে বাধা পেয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন। আরেক দল উদ্ধারকর্মী চিমনির ভেতর দিয়ে রশি ফেলে দিলেন। কিন্তু একইভাবে বাধা পেয়ে তা-ও কাজ করল না।
বিপর্যয়ের খবর চলে গেল স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসে, জাতীয় ভূতত্ত্ব ও খনি কর্তৃপক্ষের কাছে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতরে। সবাই সক্রিয় হয়ে উঠলেন। এ দিকে খনি কোম্পানি তাদের কর্মীদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। কিন্তু তাতে কি আর খবর চাপা থাকে? চার দিক থেকে খনিকর্মীদের স্ত্রী, বান্ধবী, মা-বাবা ও ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে চলে আসতে থাকল।
এ দিকে মাটির নিচে আটকে পড়া মানুষগুলো অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় বিশ্রামকক্ষে সরে যেতে পারল। নিরাপদ হলেও জায়গাটিতে প্রচণ্ড গরম। গোসলবিহীন শরীর থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকল, সাথে ঘামের গন্ধ। ট্যাংকে কয়েক হাজার লিটার পানি আছে বটে, কিন্তু তা দিয়ে গোসল করার কথা ভাবলও না কেউ। কারণ এখানে কত দিন আটকে থাকতে হয়, এই পানি খেয়েই তো জীবন বাঁচাতে হবে।
নিজেরা যাতে হতাশায় ভেঙে না পড়েন, সে ব্যবস্থাও নিলেন আটকে পড়া মানুষগুলো। তারা নানারকম কথা বলতে লাগলেন, কৌতুক ও গল্প বলতে লাগলেন। ভিক্টর সেগোভিয়া নামে একজন ডায়েরি লিখতে থাকলেন, ‘বিরাট অসহায় অবস্থায় আছি আমরা। আমরা জানি না, আমাদের উদ্ধারের কোনো চেষ্টা হচ্ছে কি না। আমরা তো কোনো মেশিনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি না।’
আরেক খনিকর্মী হোসে হেনরিকুয়েজ খুব ধার্মিক মানুষ। তিনি কয়েক জনকে নিয়ে প্রার্থনায় বসে গেলেন, ‘প্রভু, আমরা সবচেয়ে ভালো মানুষ নই। তবু তুমি আমাদের প্রতি রহম করো।’ তারা হাঁটু গেড়ে বসে সৃষ্টিকর্তার কাছে কাতর নিবেদন করলেন যেন তিনি উদ্ধারকর্মীদের পথ দেখান, যেন উদ্ধারকর্মীরা তাদের খুঁজে পায়।
হেনরিকুয়েজের একটি মোবাইল ফোনও ছিল। সেটি কাজ করছিল না, তবে তা দিয়ে রেকর্ড করা যাচ্ছিল। একটি শর্ট ভিডিওতে পরে দেখা যায় লোকজন খাবার খাচ্ছে আর সেপুলভেদা বলছেন, ‘মটরশুঁটি দিয়ে টুনা মাছ। প্রত্যেকের জন্য আট লিটার করে পানি, এক টিন টুনা মাছ, কিছু মটরশুঁটি। এই দিয়ে আমাদের চলবে।’
খানাপিনা শেষ হতেই হঠাৎ তাদের কয়েকজনের ‘মাথা খারাপ’ হয়ে গেল। তারা বলল, খুব দূর থেকে তারা ড্রিলিংয়ের (খনন) শব্দ পাচ্ছে। এটা শুনে অপর ক’জন ক্ষেপে গেল, ‘বাজে বকো না তো! কিসের শব্দ, কোথায়? যত্তসব!’ এ নিয়ে তুমুল বাগি¦তণ্ডা।
সেগোভিয়া তার ডায়েরিতে লিখেছেন, এসব লোক আসলে ভেতরে ভেতরে উন্মাদ হয়ে গেছে। হওয়ারই কথা। আজ চার দিন হলো মাটির নিচে। ওপরের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। এর মধ্যে একজন তার পাঁচ কন্যার নাম লিখল। আরো লিখল নিজের নাম এবং মা-বাবার নাম। তারপর নামগুলোর চার পাশে হৃদয় আকৃতির বৃত্ত এঁকে লিখে দিলো, ‘আমার জন্য কেঁদো না।’
আটকে পড়ার ৭৮ ঘণ্টা পর ৮ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সেগোভিয়া নিজেই কিছু শব্দ রেকর্ড করলেন। শব্দগুলো শুনে মনে হয়, পাথরের ওপর কিছু একটা যেন আঘাত করছে। ড্রিল মেশিন।
সেপুলভেদা উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘শুনছ, শুনতে পাচ্ছ তোমরা? কী সুন্দর শব্দ!’ একজন খনিকর্মী জানালেন, এ রকম ড্রিল মেশিন দিয়ে দৈনিক এক শ’ মিটার পর্যন্ত খনন করা যায়। তার কথা শুনে সবাই বসে গেলেন হিসাব কষতে। ঠিক হলো, যদি বড় কোনো অসুবিধা না হয় তবে এখান থেকে পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে মুক্তি পাওয়া যাবে।

 

ডেসপারেট ড্রিলিং

খনি এলাকায় প্রথম ড্রিল প্ল্যাটফরমটি এসেছিল ওই দিনই, অর্থাৎ ৮ আগস্ট। ওটি আনা হয় পেট্রল ট্যাংকারের সমান লম্বা একটি গাড়িতে করে। উদ্ধারকর্মীরা নিজেদের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনার পর ড্রিলিং শুরু করেন। কাজ শুরু হতেই চিমনির পাইপ দিয়ে ধুলো ছড়িয়ে পড়ল। একই সময়ে নয়টি উদ্ধারকারী দল কাজ শুরু করল। তাদের মনোভাব নয়টি বুলেট ছুড়লাম, একটি না একটি তো লক্ষ্যভেদ করবেই। কর্মীরা যেখানে আটকে আছে সে পর্যন্ত যদি একটি ছিদ্র করা যায়, তাহলে তাদের জন্য কিছু খানাপিনা তো অন্তত পাঠানো যাবে।
ড্রিলিংয়ের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারিত হতে থাকল টেলিভিশনে। গোটা চিলি তখন টেলিভিশনের সামনে। উদ্ধার তৎপরতার দায়িত্ব দেয়া হলো খনিবিষয়ক মন্ত্রীকে। প্রেসিডেন্ট নিজেও একবার খনি এলাকা ঘুরে গেলেন। ড্রিলিং কার্যক্রম ষষ্ঠ দিনে গড়াল। এদিকে খনির প্রবেশমুখের পর্বতটি যেন মন্দিরে রূপ নিলো। আটকে পড়া মানুষদের স্বজনেরা সেখানে বসে আছে। তারা মোমবাতি জ্বালিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছে। এমন অসহায় অবস্থায় এ ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে!
১৫ আগস্ট আটকে পড়ার একাদশতম দিবস অতিবাহিত হলো। এদিন রাতে ড্রিল মেশিনটি প্রথম একটি ফাঁকা জায়গার সন্ধান পেল। এটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫০৩ মিটার নিচে, তবে খনিকর্মীরা যেখানে আটকে আছে তা আরো প্রায় দুই শ’ মিটার নিচে। ড্রিল মেশিনের করা ছিদ্র দিয়ে একটি লোহার পাইপ ঢুকিয়ে দিলেন উদ্ধারকর্মীরা। তারপর তাতে কান পাতলেন। ছন্দময় একটি শব্দ পেলেন, পানি পড়ার শব্দ। এবার তারা পাঠালেন একটি ক্যামেরা। ছবিতে কাউকে দেখা গেল না।
দিন যেতে লাগল আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল হতাশা। অনেকে বলতে থাকল, খনির ভেতরে আর কেউ বেঁচে নেই। আরেক দল বলল আরো অদ্ভুত কথা যে, তারা ৩৩ জন খনিকর্মীর আত্মাকে রাতে ঘোরাফেরা করতে দেখেছে।
এ দিকে খনির ভেতরে আটকে পড়া কর্মীদের কেউ কেউ চেকার্স খেলতে শুরু করেন। কেউ বা গল্প বলেন অথবা খানাপিনার কথা বলেন। সব কথার শেষ কথা হয় এরকম যে, যদি এখানেই তাদের মৃত্যু হয় তবে তাদের পরিবার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার পাবে। কম নয়, চিলির একজন সাধারণ শ্রমজীবীর ১০ বছরের মোট উপার্জনের প্রায় সমান।
ওপরে তখন চলছে আরেক খেলা। ড্রিল মেশিনগুলো চালু হয়, বন্ধ হয়। একবার বন্ধ হলে কয়েক ঘণ্টা। চার দিকে নেমে আসে নীরবতা। সে নীরবতাকে বড়ই নিষ্ঠুর মনে হয়। তাদের এ কাণ্ডকারখানা দেখে ধৈর্য হারায় কিছু লোক। তারা বলে, ‘ওরা কবে কী করবে, এজন্য বসে থাকা সম্ভব নয়। তা ছাড়া উদ্ধারকর্মীরা যেকোনো সময় তাদের কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করতে পারে। কাজেই দেখি আমরা নিজেরাই কিছু করতে পারি কি না।’ তারা একটি ডিনামাইট জোগাড় করে এবং তার বিস্ফোরণ ঘটায়। কিন্তু যাদের উদ্দেশে এ কাজ, তারা তো ৭ শ’ মিটার নিচে। ওপরে কী হলো তা শোনা কি তাদের পক্ষে সম্ভব?
আটকে পড়ার দ্বাদশ দিনে, ১৬ আগস্ট, সেগোভিয়া তার ডায়েরিতে লিখেছেন অবরুদ্ধ মানুষদের বিশ্বাস হারানোর কথা : ‘কেউ খুব একটা কথা বলছেন না। সবার গায়ের চামড়া হাড়ের সাথে লেগে গেছে। বুকের পাঁজর সব বেরিয়ে পড়েছে। হাঁটতে গেলে পা টলে।’
অবরুদ্ধ মানুষগুলোর শরীরের বিপাকক্রিয়া কমে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বলশালী যেজন, সেও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ঘুমাচ্ছে। তাদের চিন্তাভাবনাও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ অনাহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে : তাদের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নগুলো হচ্ছে অস্বাভাবিক রকম দীর্ঘ ও স্পষ্ট।
অবরোধের ষোড়শ দিবসে এসে লোকগুলো তাদের শেষ কথা ভাবতে ও বলতে শুরু করল। কেউ কেউ লিখল বিদায়ী চিঠি। মনে ক্ষীণ আশা, একদিন হয়তো এই বিদায়ী বার্তা কোনো উদ্ধারকর্মীর হাতে পড়বে। তাদের শরীর দুর্বল হতে থাকলো। মনেস হতে থাকলো যেন একবার ঘুমিয়ে পড়লে সেই ঘুম আর ভাঙবে না। কেউ কেউে হেঁটে বাথরুমে পর্যন্ত যেতে অক্ষম হয়ে পড়লেন। অপেক্ষাকৃত প্রবীণরা নিজেদের ছেড়ে দিলেন ভাগ্যের হাতে। ব্যতিক্রম শুধু একজন। তিনি ওমর রেগাদাস। তিনি বার বার জোর গলায় বলতে থাকলেন, আমাদের উদ্ধার করার জন্য ওরা আসছে।’
সপ্তদশ দিনে লোকজনের কানে এলো ড্রিলিংয়ের শব্দী। শব্দটা অপেক্ষাকৃত কাছে ও চড়া মনে হচ্ছে। এবার আশা ও নিরাশার দোলাচলে দুলতে লাগলেন তারা। সেগোভিয়ার বিশ্বাস হলো না যে ড্রিলিংয়ে ফল কিছু হবে। উল্টো তিনি সেপুলভেদাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, মৃত্যু ব্যাপারটাকে তোমার কেমন মনে হয়?’
সেপুলভেদা জবাব দিলেন, ‘মৃত্যু হলো ঘুমিয়ে পড়ার মতো, শান্তিময়। চোখ বন্ধ করো। বিশ্রাম নাও। ব্যস, তোমার সব দুশ্চিন্তা শেষ।’

 

চেষ্টা হলো সফল
২২ আগস্ট ভোর ৬টা। ড্রিল প্ল্যাটফরমে ঘুমিয়ে ছিলেন ক’জন মানুষ। এদের একজনের চোখে হঠাৎ পড়ল অদ্ভুত ব্যাপারটি। লোহার যে টিউবটি ছিদ্র দিয়ে খনির গভীরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, সেটি যেন নড়তে শুরু করেছে। এ সময় হঠাৎ চিমনি দিয়ে ধুলা বের হওয়া বন্ধ হয়ে গেল এবং প্রেসার গজ জিরোতে নেমে এলো। তিনি ড্রিল বন্ধ করে দিলেন।
অনেক নিচে, খনি কর্মীরা যেখানে আটকে আছেন, সেখানে তাদের কেউ কেউ হঠাৎ যেন বিস্ফোরণের শব্দ শুনলেন আর পেলেন যেন খানিকটা তাজা হাওয়া। ব্যাপার কী জানতে দু’জন ছুটে গেলেন শব্দের দিকে। দেখলেন, পাথর ভেদ করে একটি লোহা নিচে আসছে। একটি ড্রিল বিট একবার ওপরে উঠছে একবার নিচে নামছে। একজন গিয়ে লোহার পাইপটি জোরে মুচড়ে দিলো। গভীর আবেগে পাইপটিকে জড়িয়ে ধরল আর পাগলের মতো বলতে থাকল : আমরা বেঁচে আছি, আমরা এখানে আছি, আমরা…।’
ভূগর্ভে হঠাৎ সাড়া পড়ে গেল। অবরুদ্ধ মানুষেরা সবাই লোহার পাইপ ও ড্রিল বিটের চার পাশে জড়ে হলো। তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরল এবং ফুঁপিয়ে কাদতে থাকল। হোসে হেনরিকুয়েজ সবাইকে ডেকে ডেকে বলতে লাগলেন : ‘সৃষ্টিকর্তা আছেন। তিনি আছেন…।
এদিকে ওপরে ড্রিল অপারেটর লোহার পাইপের নড়াচড়া দেখে কান পাতলেন এবং একটু পরেই চিৎকার দিলেন : ‘ওরা আছে।’
দ্রুত খবর চলে গেল সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে। অন্য ড্রিল মেশিনগুলোও বন্ধ করে দেয়া হলো। উদ্ধারকারীরা ড্রিলিং বিট ও লোহার পাইপ তুলে ফেললেন। আটকে পড়া মানুষেরা পাইপের নিচের দিকে রঙ দিয়ে লিখে দিলেন : ‘আমরা এখানে ভালো আছি। ৩৩ জন।’
ছিদ্রপথে এবার পাঠানো হলো একটি ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন। একটু পরেই খনিকর্মীদের উল্লাস ও আবেগসূচক শব্দ স্পিকার ফোনের সাহায্যে শুনতে পেল ভূপৃষ্ঠের লোকজনও। এবার আরেকটি টিউবে ছোট ছোট বোতলে পাঠানো হলো গ্লুকোজ মিক্সচার। সঙ্গে কাগজে লেখা সতর্কবাণী: ‘তাড়াহুড়া করে গিলে ফেলো না।’ কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষ সেকথা শুনলে তো! তারা ঢক ঢক করে গিলল এবং তাতে কয়েকজনের প্রচণ্ড পেটব্যথা হতে থাকল।
এবার আরো গ্লুকোজ পাঠানো হলো। সঙ্গে কিছু ওষুধপত্র ও খাদ্য। এরপর অবরুদ্ধ খনিকর্মীরা তাদের পরিবার-পরিজনের কাছ থেকে প্রথম চিঠি পেলেন।
আটকে পড়ার ২৫তম দিনে, ৩০ আগস্ট, উদ্ধারকারীরা খনিকর্মীদের বের করে আনতে রেসকিউ হোল খনন করতে শুরু করলেন। প্রথমে পরিকল্পনা করা হয় ৩৮ সেন্টিমিটার চওড়া সুড়ঙ্গ করা হবে। পরে তা বাড়িয়ে ৭১ সেন্টিমিটার করা হয়, যাতে একটি ক্যাপসুলে করে কয়েকজনকে একসঙ্গে তুলে আনা যায়। অবশ্য উদ্ধারকর্মীরা ছিলেন খুবই সতর্ক। আটকে পড়া কর্মীদের অবস্থান এবং এক শ’ বছরের পুরনো খনিতে আবার কোনো বিপর্যয়ের সম্ভাব্যতাটি সারাক্ষণ মাথায় রেখেছিলেন তারা। এবং এসব কারণেই উদ্ধারকাজ শেষ হতে কয়েক মাস লেগে যায়।

 

দুঃস্বপ্নের সমাপ্তি
এভাবে কেটে গেল ৬৯টি দিন ও রাত। অবশেষে ১২ অক্টোবর রাতে উদ্ধারকর্মী ম্যানুয়েল গনজালেস একটি ক্যাপসুলে করে খনির ভেতরে নেমে গেলেন। পুরো উদ্ধারকার্যক্রম সমন্বয় করবেন তিনি।
ফ্লোরেনসি ও অ্যাভালস হলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি সবার আগে ওপরে উঠবেন। ক্যাপসুলে উঠতে উঠতে তিনি সতীর্থদের বললেন, ওপরে গিয়ে আমাদের সবার সাথে সবার দেখা হবে। ওপরে উঠতে তারা সময় লাগল ৩০ মিনিট।
পরদিন সন্ধ্যানাগাদ ৩৩ খনিকর্মীর সবাই জীবন্ত গণকবর থেকে পৃথিবীতে উঠে এলেন। সবার শেষে এলেন উদ্ধারকর্মী ম্যানুয়েল গনজালেস।
আটকেপড়া মানুষেরা কেউ আহত নন, তবে অসুস্থ। এ অসুস্থতা শারীরিক ও মানসিক। তারা পৃথিবীতে ফিরেও দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকেন, ভুগতে থাকেন মানসিক বৈকল্য এবং সদ্যাসক্তি বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে।
অবশ্য পরে তারা এসব সমস্যা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। চিলি সরকার তাদের মোটা অঙ্কের পেনশন দেয়, যতটা তারা বৃদ্ধ বয়সে অবসর নিলেও হয়তো পেতেন না। তরুণ খনিকর্মীদের বেশিরভাগই কাজে ফিরে গেছেন। তবে কেউ কেউ ন্যাশনাল মাইনিং কোম্পানিতে কাজ নিয়েছেন, খনিতে আর নয়। যেমন একজন হয়েছেন ট্রাক ড্রাইভার। আরেকজন করছেন ফলের ব্যবসা। জীবনের এই রোমাঞ্চকর অধ্যায় এবং এর ব্যাপক প্রচার থেকে খনিকর্মীদের কেউ আর্থিকভাবে লাভবান হননি, হননি ধনীও। তবে তারা সবাই এখনো বেঁচে আছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.