টপ টু বটম বিপর্যয়

সেই বহুদিন আগের বাংলাদেশ, যখন খেলতে নামার অর্থই  ছিলো বিরক্তিকর ব্যর্থতা, সময়ের সাথে সাথে সে চিত্রও পাল্টে গেছে – এখন আর পৃথিবীর কোন দেশই বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে কটু কথা বলার সাহস দেখান না। তারপরও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে এমন লজ্জাজনক পরাজয় দেশের মানুষকে কষ্টের সাগরে ভাসিয়েছে। অনেক দিন পর দেশের মানুষ ক্রিকেটের এমন টপ টু বটম বিপর্যয় দেখলো। তবুও আমরা আশায় থাকলাম – আগামী ওয়ান ডে ও টি২০ সিরিজে আমাদের এমন ব্যর্থতা দেখতে হবে না।

ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ করে আবারও হতাশ করল টাইগাররা। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে টেস্ট সিরিজে ধবল ধোলাই এড়াতে ড্র কিংবা জয়ের বিকল্প ছিল না বাংলাদেশের। কিন্তু ভাগ্যদেবী সঙ্গে না থাকায় কোনোটাই জুটল না মুশফিকদের কপালে। এর বদলে দীর্ঘদিন পর ইনিংস হারের স্বাদ নিল বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে জুটল হোয়াইওয়াশের লজ্জা। ব্লুমফন্টেইনে সিরিজের দ্বিতীয় তথা শেষ টেস্টে বাংলাদেশকে ইনিংস এবং ২৫৪ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে ফাফ ডু-প্লেসিসের দল।

দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে দ্বিতীয় টেস্টেও প্রতিরোধহীনভাবে হেরে গেল বাংলাদেশ। আজ ম্যাচের তৃতীয় দিনে বাংলাদেশ অল আউট হয়ে যায় ১৭২ রানে। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকা এই ম্যাচে জয়ী হলো ইনিংস ও ২৫৪ রানে। সিরিজটি দক্ষিণ আফ্রিকা জিতে নিলো ২-০-এ।
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রান করেন মাহমুদুল্লাহ। তিনি করেন ৪৩ রান। এছাড়া ইমরুল কায়েস করেন ৩২ রান।
দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে রাবাদা নেন ৫ উইকেট।

রাবাদার সেঞ্চুরি : শিকার মাহমুদুল্লাহ

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে আউট করার মাধ্যমে ১০০তম উইকেট শিকার করলেন দক্ষিণ আফ্রিকার দুর্ধর্ষ পেসার কাগিসো রাবাদা। আর এতে বাংলাদেশের অবস্থা আরেকটু করুন হলো। মাহমুদুল্লাহ আর লিটন দাস বিপর্যয় কাটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা ৪৩ রানের পার্টনারশিপও গড়েছিলেন। তারা দুজনই অল্প ব্যবধানে বিদায় নেন।
লিটন ১৮ রান করে আউট হন। এর পর মাহমুদুল্লাহ বিদায় নেন ৪৩ রান করে।

মাহমুদুল্লাহকে শিকারের মাধ্যমে মাধ্যমে টেস্টে ক্যারিয়ারের উজ্জ্বল এক মাইলফলকে পৌঁছালেন তিনি। পাশাপাশি দেশটির শততম উইকেট শিকারীদের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ হলেন ২২ বছর বয়সী এই ফাস্ট বোলার।

এর মাধ্যমে তিনি ছাড়িয়ে গেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার দু’জন গ্রেট ব্যাটসম্যানকে। তারা হলেন হিউজ টেফিল্ড ও অ্যালান ডোনাল্ড। তারা ১০০ উইকেট শিকার করেছেন ২২ টেস্ট খেলে। আর রাবাদা মাত্র ১৯ ম্যাচ খেলে।

এছাড়া তিনি পেছনে ফেলেছেন ২৪ ম্যাচে ১০০ উইকেট শিকার করা আরেক বোলার পিটার পোলককে।

বাংলাদেশের বিপক্ষে ব্লুমফন্টেইনে দুই ইনিংসে আটটি উইকেট শিকার করেছেন রাবাদা।

আশা জাগিয়ে ফিরে গেলেন মুশফিক
ক্রিজে থিতু হয়েই ফিরে গেছেন ওপেনার ইমরুল কায়েস। ক্রিজে এসেছিলেন মাহমুদুল্লাহ। দলের স্কোর বাড়াতে তাকে সাথে নিয়ে লড়াই করছিলেন অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। তার ব্যক্তিগত সংগ্রহ যখন ২৬ রান, তখনি পারনেলের শিকার হলেন তিনি। ফিরে যান সাজঘরে।
আফসোস, কেউ যদি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বলত…
সৌম্য সরকারের পর সাজঘরে ফেরেন মুমিনুল হকও। ১১ রানে রাবাদার শিকার হন তিনি। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের এই অসহায় অবস্থা দেখে ক্রিকইনফোর ধারাভাষ্যকার বলে উঠেন, ‘ইস, আফেসাস হচ্ছে। কেউ যদি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের গিয়ে বলত, একপেশে এই খেলায় যত সময় সম্ভব টিকে থাকটাই মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। তাই বলে রান তুলবে না কিন্তু নয়, রান নিতে তবে সেটা বল বুঝে-শুনে। বাজে বলে রান তুলতে হবে। এভাবে খেলে চতুর্থ দিন পর্যন্ত টেনে নিলেই বাংলাদেশের অবস্থার উন্নতি হবে।’

ততক্ষণে ক্রিজে এসেছেন অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। রাবাদার শেষ বলটি মোকাবেলা করেছেন তিনি। কোনো রান নেননি।
তখনি আরেক ধারাভাষ্যকার বললেন, ‘কী করার চেষ্টা করেছিল সে? আমি এই ম্যাচ দেখে খুব হতাশ হচ্ছি। কেউ না, দলের কেউ ম্যাচ বাঁচানোর চেষ্টা করছে না।’
বাংলাদেশের সংগ্রহ তখন ২ উইকেট হারিয়ে ৪০ রান।

রাবাদার ৫০তম শিকার সৌম্য
তৃতীয় দিনের ব্যাটিং শুরু হতেই রাবাদার শিকার হন সৌম্য সরকার। মাত্র ৩ রানে সাজঘরে ফিরেন এই ওপেনার। আর তাকে শিকারের মাধ্যমেই চলতি বছরে ৫০তম উইকেট ঝুলিতে পুরলেন রাবাদা।

তৃতীয় দিনের খেলা শুরু
আজ রোববার ব্লুমফন্টেইন টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলা শুরু হয়।
গতকাল ব্যাটসম্যানদের আসা যাওয়ার মিছিলে ইনিংস শেষ হয়েছে ১৪৭ রানে। ফলো অন লজ্জায় ডুবে বাংলাদেশকে আবারো নামতে হয়েছে ব্যাটিংয়ে।

কেন ব্যাটসম্যানদের অসহায় আত্মসমর্পণ?
ব্লুমফন্টেইন টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানদের প্রথম চারটি শতকের স্কোর ছিল ১৪৩, ১৩৫, ১৩২ ও ১১৩। যে পিচে দক্ষিণ আফ্রিকা মাত্র ৪ উইকেটে করেছে ৫৭৩, একই পিচেই কিনা সব বাংলাদেশী ব্যাটসম্যান মিলে করলেন মাত্র ১৪৭ রান! উইকেট আচমকা এতো পরিবর্তন হলো কিভাবে? টাইগারদের এমন ব্যাটিং বিপর্যয়ের উত্তর কি? দ্বিতীয় দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের অসহায় আত্মসমর্পণের কারণ জানিয়েছেন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান লিটন কুমার দাস।

বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের মধ্যে লিটনের ৭০ রান ছাড়া বলার মতো আর কোনো স্কোর নেই। বাংলাদেশের টেস্ট অনেকটাই নির্ভর করে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের ব্যাটের উপর। তিনিই করেছেন মাত্র ৭ রানেই আউট হয়েছেন গালিতে দাঁড়িয়ে থাকা ফিল্ডার টেম্বা বাভুমার অসাধারণ এক ক্যাচে।

লিটন মনে করেন এই ক্যাচটিই মাচের মোর ঘুড়িয়ে দিয়েছে, “আমি মনে করি মুশফিক ভাইয়ের আউটটা ম্যাচের মোমেন্টাম ঘুরিয়ে দিয়েছে। বাভুমা অসাধারণ একটি ক্যাচ নিয়েছে। কোনো কোনো সময় একটি ক্যাচ পুরো ম্যাচের মোমেন্টাম বদলে দিতে পারে। মুশফিক ভাই আমাদের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। যখন তিনি এভাবে আউট হয়ে যান সেটা অবশ্যই দলের উপর চাপ সৃষ্টি করে।”
বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের অসহায় আত্মসমর্পণ দেখলে মনে হবে উইকেট অনেক ভয়ঙ্কর ছিল! কিন্তু আদৌতে কি তাই? টাইগার ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার জন্য কন্ডিশনকেই দায়ী করেছেন লিটন। পাশাপাশি দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো করার আশা ব্যক্ত করেছেন।

লিটন বলেন, “ব্যাট করার জন্য উইকেট কঠিন ছিল না। আউট হওয়ার জন্য আপনার একটি বলের দরকার। মাঝে মধ্যে আপনি ভুল করেন। আপনাকে বুঝতে হবে যে আমরা এখানে দশ বছর পর খেলতে এসেছি। এই কন্ডিশনে আমরা অভ্যস্ত নয়। যদিও এ ধরনের অজুহাত দেখানো ঠিক হবে না, কিন্তু এটি আমাদের মনের মধ্যে আছে। আমরা এর চেয়ে ভালো দল।”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.