তোমাকে পাওয়ার জন্য হে বিশ্বকাপ

কাল থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া উৎসব ফুটবল বিশ্বকাপ-যেটিকে গ্রেটেস্ট শো অন দা আর্থ বলা হয়।

সব প্রস্তুতি শেষ হয়ে এখন ক্ষণগণনা চলছে বিশ্বকাপের।

অংশগ্রহণকারী দলগুলোর পাশাপাশি এসব দেশের হাজার হাজার সমর্থকও ইতোমধ্যেই পৌঁছে গেছেন মস্কোতে।

এর বাইরেও বাংলাদেশসহ অনেক দেশ থেকেই সাংবাদিক ও দর্শক গেছেন রাশিয়ায়।

ফুটবল বিশ্বকাপ কাভার করতে বাংলাদেশী সাংবাদিক শামীম চৌধুরী এখন মস্কোতে।
মস্কো থেকে শামীম চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে মস্কোসহ রাশিয়ার শহরগুলো ইতোমধ্যেই বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে।

“লাতিন দেশগুলো থেকে প্রচুর মানুষ এসেছে। ফ্যান ফেস্টে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, কলাম্বিয়া, পেরু-এসব দেশ থেকে বেশি এসেছে মানুষ”।

এর মধ্যেই মেক্সিকো বলছে তাদের অন্তত চল্লিশ হাজার সমর্থক রাশিয়ায় এসেছে এবং মস্কোসহ বিভিন্ন শহরে ঘোরাফেরা করছে।

আর্জেন্টিনার সমর্থকরাও মস্কোতে জড়ো হয়েছে এবং সমর্থকদের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ হাজার।

মিস্টার চৌধুরী বলছেন পেরু চল্লিশ বছর পর বিশ্বকাপে খেলছে তাই তাদের সমর্থকদের উপস্থিতি ও উৎসাহ বেশ চোখে পড়ছে।

“তারা ট্রেন-বাস স্টেশন ও সড়কে দলবেঁধে উৎসব করছে। তাদের বিশ্বকাপ উপস্থিতিতে স্মরণীয় করছেন”।

ইউরোপীয় ঘরানার দর্শকের চেয়ে লাতিন ঘরানার দর্শকই এখন বেশী চোখে পড়ছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশীদের উপস্থিতি কতটা রাশিয়ায়?

শামীম চৌধুরী বলছেন, বাংলাদেশের জন্য টিকেট বেশী থাকেনা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন মাত্র ২৯০টি টিকেট পেয়েছে। এর বাইরে অনলাইনে কিছু সৌভাগ্যবান ব্যক্তি টিকেট সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

“তারা আসতে শুরু করেছে। বেশ কিছু বাংলাদেশীকে দেখা গেছে। সম্ভবত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যায়ে আরও বেশি দর্শককে দেখা যাবে বাংলাদেশের”।
বিশ্বকাপের দলগুলো পৌঁছে গেছে মস্কোতে?

শামীম চৌধুরী জানান, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ দলই পৌঁছে গেছে। আর্জেন্টিনার বেস ক্যাম্প এখন অনেক জমজমাট।

“এছাড়া মস্কো শহরে যে বেস ক্যাম্পগুলো আছে তারা চলে এসেছে। দশটি শহরে এগারটি ভেন্যু। তবে সব জায়গাতেই নিজ নিজ দলের বেস ক্যাম্প ঘিরে সমর্থকরা অবস্থান নিয়েছেন”।
রাশিয়ানদের উন্মাদনা কতটা?

শামীম চৌধুরী বলেন বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সাজসজ্জা শুধু স্টেডিয়াম কেন্দ্রিক। লুঝনিকিসহ কয়েকটি স্টেডিয়ামে ব্রান্ডিং ভালো হয়েছে।

তবে রাশিয়ানদের মধ্যে ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা এখনো খুব বেশি চোখে পড়েনা। যদিও রাশিয়া স্বাগতিক দেশ হিসেবে খেলার সুযোগ পাচ্ছে।

“২০০২ সালের পর এবারই তারা বিশ্বকাপে খেলছে। বিশ্বকাপে রাশিয়ার ইতিহাস যেহেতু খুব বেশি সমৃদ্ধ নয়। সে কারণে স্থানীয়দের বিশ্বকাপ ক্রেজ খুব একটা পায়নি। ফেন ফেস্টে গেলে অবশ্য রাশিয়ার তরুণদের অনেককে দেখা যায়”।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন?

শামীম চৌধুরী বলছেন বিশ্বকাপকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই ভালো।

“হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পাব কিংবা আবাসনের জায়গা গুলোতে সার্বক্ষিনক নজরদারি হচ্ছে। পুলিশের সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে”।

সবমিলিয়ে নিরাপত্তা আসলেই অনেক কঠোর বলেই মনে হচ্ছে জানান মিস্টার চৌধুরী।

ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন যে খেলোয়াড়রা

লিওনেল মেসি

সবচেয়ে কাছাকাছি গিয়েছিলেন মেসি – গত বিশ্বকাপে। কিন্তু আর্জেন্টিনা ফাইনালে হেরে যায় জার্মানির কাছে।

এবার বিশ্বকাপে কারা হবেন ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়া খেলোয়াড়? এ প্রশ্নের জবাব দিতে গেলে প্রথমেই মনে আসবে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির নাম। বিশ্বকাপ না জিতলেও – শুধু ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনার হয়ে তার খেলা দেখেই – অনেক ফুটবল পন্ডিত যাকে শুধু এ যুগের নয়, ‘সর্বকালের সেরা’ ফুটবলারদের একজন বলতে চান।

লিওনেল মেসির বয়স এখন প্রায় ৩১ – হয়তো এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, গতি, সৃষ্টিশীলতা, অসাধারণ পাসিং আর গোল করার ক্ষমতা মিলিয়ে তিনি এখনো যে কোন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেবার মতোই খেলোয়াড়, কোন সন্দেহ নেই।

ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো

পর্তুগালের রোনাল্ডো – প্রকৃতপক্ষে এ দুজনের মধ্যে মেসি বড় খেলোয়াড়, নাকি রোনাল্ডো, এই বিতর্ক বোধ হয় কোনও দিনই শেষ হবে না।

রোনাল্ডো পর্তুগালকে ইউরো জিতিয়েছেন। কিন্তু রোনাল্ডো কি এই পর্তুগাল দলটিকে নিয়ে বিশ্বকাপ জিততে পারবেন? পারলে তা হবে এক অসামান্য অর্জন – মারাডোনার ১৯৮৬র বিশ্বকাপ জেতার মতোই।

কিন্তু রোনাল্ডোর পর্তুগালের চাইতে দল হিসেবে হয়তো মেসি-র আর্জেন্টিনাই এগিয়ে, এমনটাই মনে করেন বেশির ভাগ ফুটবল পন্ডিত।

কিন্তু একা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেবার ক্ষমতায় রোনাল্ডো মেসির চাইতে একটুও কম নন – একথাই বলবেন সবাই।

নেইমার

একা ম্যাচ বের করে আনার ক্ষমতা রাখেন ব্রাজিলের নেইমারও – এবং তার সাথে আছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ব্রাজিল দল, এবং এবারের ব্রাজিল দলটি গত বিশ্বকাপের চাইতেও ভালো – বলছেন বিবিসির দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল বিশ্লেষক পিয়ের ভিকারি।

“গত বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে ব্রাজিলের হারার কথা কেউই ভুলে যেতে পারবেন না। কিন্তু ওটা একবার ঘটেছে, খুব সম্ভবত: আর ঘটবে না। গতবারের দলটি যেমন নেইমারের ওপর নির্ভরশীল ছিল – এবার তা নয়।

কথাটা সত্যি। কারণ নেইমারের পেছনে মিডফিল্ডার হিসেবে ব্রাজিল দলে আছেন ফেলিপ কুতিনিও, উইলিয়ান, কাসেমিরো, ফার্নান্দিনিও, ফ্রেড বা ডগলাস কস্তার মতো অসাধারণ সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডাররা – যারা নেইমারকে বল যোগান দেবেন।”

কথাটা সত্যি। কারণ নেইমারের পেছনে মিডফিল্ডার হিসেবে ব্রাজিল দলে আছেন ফেলিপ কুতিনিও, উইলিয়ান, কাসেমিরো, ফার্নান্দিনিও, ফ্রেড বা ডগলাস কস্তার মতো অসাধারণ সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডাররা – যারা নেইমারকে বল যোগান দেবেন।

“ম্যানেজার হিসেবে চিচি দায়িত্ব নেবার পর থেকে ব্রাজিল ক্রমাগত উন্নতি করেছে, আর নেইমারের এখন যা বয়েস তাতে তিনি তার শ্রেষ্ঠ সময়ের কাছাকাছি আছেন বলা যায়। তাই এবারের ব্রাজিল দলটি হয়তো নেইমারের সেরা খেলাটা খেলার উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করে দেবে” – বলেন পিয়ের ভিকারি।

লুইস সুয়ারেজ

বার্সেলোনায় একসময় ত্রিমুখী আক্রমণভাগ গড়ে উঠেছিল মেসি-নেইমার-সুয়ারেজকে নিয়ে। উরুগুয়ে দলে সেই লুইস সুয়ারেজ প্রধান ভরসা, এবং সবচাইতে বড় তারকা। তার সাথে আছেন এডিনসন কাভানি।

লুইস সুয়ারেজ মাত্র ১৯ বছর বয়েসে ইউরোপে প্রথম খেলতে আসেন । ইউরোপে তার শুরু ডাচ ক্লাব গ্রোনিংগেন, এর পর আয়াক্স, লিভারপুল এবং সেখান থেকে বার্সেলোনায়। শুরু থেকেই তিনি তার সহজাত গোল করার ক্ষমতা দিয়ে সবার নজর কেড়েছেন।

এ ছাড়া আলোচিত হয়েছেন অন্তত: তিন বার প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের কামড়ে দিয়ে।

উরুগুয়ে এবার বিশ্বকাপ জিততে পারে এমন কথা কোন ফুটবল পন্ডিতই বলছেন না। তবে লুইস সুয়ারেজ এমন একজন খেলোয়াড় – যাকে উরুগুয়ের সব প্রতিপক্ষই সমীহ করে চলবে, কারণ তিনি যে কোন পরিস্থিতিতে গোল করে খেলার ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন।

টমাস মুলার আর মেসুত ওজিল

বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে জার্মানি – তাদের দলে তারকারও অভাব নেই। কিন্তু কেন যেন জার্মান তারকারা অন্যদের মত অতটা বর্ণময় নন।

জার্মানদের দলীয় সংহতি আর খেলার শৃংখলা এমনই যে হয়তো একক প্রতিভার দ্যুতি সেভাবে আলাদা করে চোখে পড়ে না।

কিন্তু টমাস মুলার বা মেসুত ওজিলের মত তারকারা যে কোন ম্যাচের মোড় ঘুরিযে দিতে পারেন।

বায়ার্ন মিউনিখের টমাস মুলার বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত ১০টি গোল করেছেন। কে জানে, এবার জ্বলে উঠলে তিনি হয়তো বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬টি গোলের যে রেকর্ড এখন আরেক জার্মান মিরোস্লাভ ক্লোসার দখলে – তা ভেঙে দিতেও পারেন।

মেসুত ওজিল

মিডফিল্ডার মেসুত ওজিল খেলেন ইংলিশ লিগে আর্সেনালের হয়ে ।

দেখা গেছে, যেদিন ওজিল ভালো খেলেন সেদিন তিনিই মাঠের রাজা। আবার একেক দিন এমন হয় যে ওজিল যে মাঠে আছেন এটাই বোঝা যায় না।

তাই ওজিল ফর্মে থাকলে প্রতিপক্ষের জন্য তিনি বিরাট বিপদ।

কেভিন ডি ব্রাইনা

বেলজিয়াম দলে এডিন আজার্ড, আর রোমেলু লুকাকু দুই নামী ইংলিশ ক্লাব চেলসি আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে খেলার জন্য সবার পরিচিত তারকা।

কিন্তু বেলজিয়াম দলের মিডফিল্ডের আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হচ্ছেন ম্যানচেস্টার সিটি কেভিন ডি ব্রাইনা – যার আছে মাঠের যে কোন জায়গা থেকে গোলের সুযোগ সৃষ্টি করার মতো পাস দেবার ক্ষমতা, যা প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে বলকে এনে দেয় স্ট্রাইকারের পায়ে।

সেদিক থেকে বেলজিয়াম এবার কি করতে পারে তার অনেকখানিই নির্ভর করে কেভিন ডি ব্রাইনা কেমন খেলেন তার ওপর।

পল পগবা

ফ্রান্সের পল পগবা জুভেন্টাসে থাকার সময়ই বিশ্বমানের তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন – কিন্তু ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে এসে তিনি এখনো হয়তো ফ্যানদের সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেন নি।

কিন্তু ফ্রান্সের হয়ে মাঠে হয়তো ভিন্ন এক পগবাকে দেখা যেতে পারে। ফ্রান্স এবার দারুণ এক দল। তাদের স্ট্রাইকারদের মধ্যে আছেন আঁতোয়াঁ গ্রিজম্যান, কাইলিয়ান এমবাপ্পি, ওসমান ডেমবেলে, অলিভার জিরু, বা টমাস লিমারের মতো তারকারা।

মিডফিল্ডার হিসেবে এদের বল যোগান দেয়া, প্রতিপক্ষের সামনে যাওয়া ঠেকানো আর আক্রমণে সহায়তা দেয়া – সব ক্ষেত্রেই ফ্রান্স দলে পল পগবাই হচ্ছেন কেন্দ্রবিন্দু।

পগবা ফর্মে থাকলে ফ্রান্স হয়ে উঠতে পারে অপ্রতিরোধ্য এক দল।

ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে এটলেটিকো মাদ্রিদের উত্থানের পেছনে ফ্রান্সের আঁতোয়াঁ গ্রিজম্যানের ভুমিকা অনস্বীকার্য। তিনি, এবং দুই উঠতি স্ট্রাইকার উসমান ডেমবেলে আর কাইলিয়ান এমবাপ্পি – এদের যে কেউ এবার বিশ্বকাপের আসরে নিজেদের বড় তারকা হয়ে উঠতে পারেন।

সেরজিও এগুয়েরো

আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির জন্য কারো কারো হয়তো এগুয়েরোর কথা মনে না পড়তে পারে। কিন্তু ম্যানচেস্টার সিটির এই তারকা বছরের পর বছর দেখিয়েছেন তার গোল করার ক্ষমতা। তিনি দারুণ ফিনিশার অর্থাৎ গোলমুখে এসে ভুল করেন খুব কম।

এমন হতে পারে যে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা মেসিকে আটকাতেই বেশি ব্যস্ত থাকলে এগুয়েরোর সামনেই হয়তো বেশি গোলের সুযোগ আসতে পারে।

তাই এগুয়েরো হয়ে উঠতে পারেন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া খেলোয়াড়। তার সাথে আরো আছেন গনজালো হিগুয়াইন আর পাওলো দিবালা – যারা ক্লাব স্তরে জুভেন্টাসে খেলেন।

মোহাম্মদ সালাহ

এবার আফ্রিকা মহাদেশের দলগুলো গ্রুপ পর্ব ছাড়িয়ে খুব বেশি দূর যাবে এমনটা অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন না। সাবেক নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড পিটার ওদেমউই্ঙ্গি বলছিলেন, তার মতো আফ্রিকান ফুটবল নিয়ে ১৯৯০এর দশকে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল তা পিছিয়ে গেছে। কিন্তু এবার বিশ্বকাপে দেখা যাচ্ছে তিনটি উত্তর আফ্রিকান দেশ তিউনিসিয়া, মরক্কো আর মিশরকে – যাদের ফুটবলাররা ওদেমউইঙ্গির ভাষায় ‘বেশি বুদ্ধিমান’ এবং শারীরিকভাবেও বেশি হালকাপাতলা, দ্রুতগতি সম্পন্ন।

এর সেরা উদাহরণ বোধ হয় মিশরের মোহাম্মদ সালাহ। তার দেশ মিশর বিশ্বকাপে খেলছে ২৮ বছর পর। মোহাম্মদ সালাহ লিভারপুলের হয়ে ইউরোপ মাতিয়েছেন এ মওসুমে, করেছেন একটার পর একটা বুদ্ধিদীপ্ত সব গোল।
সালাহকে কিভাবে দেখেন তার নিজ শহরের লোকেরা?

মোহাম্মদ সালাহ এখন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের চোট থেকে সেরে ওঠার পথে। তিনি কি মিশরকে কোয়ার্টার ফাইনাল পেরিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন? মিশরের গ্রুপে আছে উরুগুয়ে, সৌদি আরব আর স্বাগতিক রাশিয়া।

ইসকো

স্পেন ও রেয়াল মাদ্রিদের ইসকোকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। তিনি এবার এমন একটি স্পেন দলের অন্যতম সদস্য – যাতে তারকার ছড়াছড়ি।

স্পেন ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দাভি দা হে’ অনেকের মতেই পৃথিবীর সেরা গোলরক্ষক । তার সাথে আছেন ম্যানচেস্টার সিটির দাভিদ সিলভা, এ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের দিয়েগো কস্তা, বার্সেলোনার আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জেরার্ড পিকে, জর্ডি আলবা, আর সেরজিও বুসকেট, আর রেয়াল মাদ্রিদের মার্কো আসেনসিও, সেরজিও রামোস, আর ড্যানি কারভায়াল।

এত তারকার মধ্যেও ইসকোকে মানা হয় স্পেনের ভবিষ্যত উজ্জ্বল তারকা হিসেবে । তার ড্রিবলিং ও পাসিং দক্ষতা এবং খেলার গতিপথ বুঝতে পারার ক্ষমতার মধ্যে অনেকে জিনেদিন জিদানের ছায়া দেখতে পান।

স্পেন এবার রয়েছে পর্তুগাল. মরক্কো আর ইরানের সাথে। ২০১০-এর বিশ্বকাপ জয়ী স্পেন আর ইউরোজয়ী পর্তুগাল এক গ্রুপে – তাই এটিকেই বলা হচ্ছে ‘গ্রুপ অব ডেথ’।

হ্যারি কেন

ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন প্রিমিয়ার লিগে টটেনহ্যামের হয়ে তিন মৌসুমে ১৫০টি ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ১০৮টি , ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন ২৪টি আতর্জাতিক ম্যাচ – গোল করেছেন ১৩টি।

তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন এক অসাধারণ স্ট্রাইকার হিসেবে – যাকে নিয়ে টটেনহ্যাম গত মৌসুমে রেয়াল মাদ্রিদের মত দলকে হারিয়েছে। গোলস্কোরার হিসেবে হ্যরি কেনের শুটিং এবং হেডিং দুটোই সমান কার্যকর।

রেয়ালের ম্যানেজার এবং ফুটবল কিংবদন্তী জিনেদিন জিদানের মত লোকও বলেছেন, হ্যারি কেন একজন পূর্ণাঙ্গ খেলোয়াড়।

ইংল্যান্ডকে নিয়ে কোন ফুটবল পন্ডিতই বেশি কিছু আশা করেন না – কিন্তু এবারের দলটি নিয়ে ইংলিশ ফুটবল ভক্তরা গোপনে গোপনে একটা ভালো কিছুরই আশা করছেন।

সে আশার পেছনে একটা বড় কারণ যে হ্যারি কেন – তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

বিবিসি বাংলা

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সমর্থক আর্জেন্টিনার৷ সাফল্য না পেলেও সমর্থক সংখ্যা বেড়েছে৷ কেন ভালেবাসি, এর যুক্তিগ্রাহ্য কোনো ব্যাখ্যা হয়তো আসলে থাকেই না৷ ভালোবাসা অকারণ!
আপনি আর্জেন্টিনা ফুটবলের পাগল সমর্থক? তাহলে আগে ক্রিকেটকে বলুন ধন্যবাদ!

ভাবছেন ফুটবল ভানতে ক্রিকেটের গীত কেন গাইছি? মশাই, আর্জেন্টিনায় ফুটবল এসেইছিল ক্রিকেটের হাত ধরে৷ আর্জেন্টিনার ইতিহাসে প্রথম ফুটবল ম্যাচটা হয়েছিল ক্রিকেট মাঠে৷ আর্জেন্টিনা আগে ক্রিকেট শিখেছিল, তারপর ফুটবল৷ বললে কেমন দেখাবে জানি না, ভারতে প্রথম আনুষ্ঠানিক ক্রিকেট ম্যাচের ৩০ বছর আগে আর্জেন্টিনার মাটিতে প্রথম কোনো ক্রিকেট ম্যাচ হওয়ার রেকর্ড আছে!

ভাগ্যিস ক্রিকেটের জ্বরটা তাদের পেয়ে বসেনি! প্যাড-হেলমেট পরে লিওনেল মেসি ব্যাট করতে নামছেন, সার্জিও আগুয়েরা করছেন স্পিন, আর পেস বোলিং করতে গিয়ে গঞ্জালো হিগুয়েইন একের পর এক ওয়াইড দিচ্ছেন (কেন, বুঝছেন তো!)…ভাবতেই কেমন জানি লাগছে৷

ব্রিটিশরা যেখানেই গেছে, সঙ্গে করে নিয়ে গেছে ফুটবল আর ক্রিকেট৷ এক সময় আর্জেন্টিনায় ঢল নেমেছিল ব্রিটিশদের৷ আর্জেন্টিনার বাণিজ্য সম্ভাবনা হাতছানি দিয়ে ডাকছিল সেই সুদূর দক্ষিণ আমেরিকায়, জাহাজে করে যেখানে যেতে লেগে যেত কয়েক মাস৷ ১৮৩০-এর দিকে বাকি সব কমনওয়েলথ রাষ্ট্রের চেয়ে আর্জেন্টিনায় ব্রিটিশদের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি৷ আর্জেন্টিনার কাছ থেকে তারা ট্যাঙ্গো শিখেছেন৷ আর আর্জেন্টিনাকে শিখিয়েছেন ক্রিকেট-ফুটবলের কায়দা-কানুন৷

default
বিশ্বকাপ রাশিয়ায় না বাংলাদেশে?
পল্টন ময়দানে মুখোমুখি তারা

ঢাকার পল্টন ময়দানে আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিলের ম্যাচ৷ নাইন স্টার যুব সংঘ নামের একটি ক্লাব এই প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করে৷ এর আগেও দু’বার তারা এমন ম্যাচের আয়োজন করেছিল৷

12345678910111213

বুয়েনস আইরেসে চাকরি করতেন এমন কিছু সাহেব-সুবো ক্রিকেট শুরু করে দেন, সেটা ১৮০০ সালের শুরুর দিকের কথা৷ তার কিছুকাল পরে শুরু হয় ফুটবল৷ আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে ক্রিকেটকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই৷ কারণ, ব্রিটিশরা যখন প্রথম ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের উদ্যোগ নিলো, দেখা গেল, খেলার মতো মাঠই নেই৷ ক্রিকেট সংস্থাকে অনুরোধ করা হলো, তারা কি খেলা স্থগিত রেখে ফুটবলকে এক দিনের জন্য মাঠটা ছেড়ে দেবে? ক্রিকেট সানন্দে রাজি হলো৷ তখন কি আর ক্রিকেট জানতো, এই এক দিনের জন্য ছেড়ে দেওয়া মাঠটি আসলে চিরদিনের জন্যই আর্জেন্টিনায় ফুটবল উন্মাদনা গ্রাস করবে প্রলয়-বেগে!

শুধু আর্জেন্টিনা নয়, ফুটবল নামের এক চর্ম গোলকের এই খেলা পরে সারা পৃথিবীতেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে৷ আর এর পেছনে দক্ষিণ অ্যামেরিকা মহাদেশটির অবদান অনেক৷ ফুটবল ইউরোপে জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে দক্ষিণ অ্যামেরিকায়৷ আর আর্জেন্টিনা গর্ব করতে পারে, দক্ষিণ অ্যামেরিকায় ফুটবলটা শুরু হয়েছিল তাঁদের দেশেই৷

আপনার ব্রাজিল সমর্থক বন্ধুরা সব সময় হলুদ জার্সির ইতিহাস আর ঐতিহ্য নিয়ে খোঁচায়? চুপি চুপি আপনাকে কিছু দারুণ তথ্যের অস্ত্র দিয়ে রাখি৷ ব্রাজিলে প্রথম ফুটবল ম্যাচ হয়েছিল ১৮৯৪ সালে, আর আর্জেন্টিনায় ১৮৬৭ সালে৷ ১৮৯১ সালেই আর্জেন্টিনায় ফুটবল লিগ শুরু হয়ে যায়৷ সারা বিশ্বেই এর আগে মাত্র চারটি ফুটবল লিগ ছিল, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড আর হল্যান্ডে৷ ব্রাজিলে প্রথম ফুটবল ম্যাচ হওয়ার এক বছর আগেই আর্জেন্টিনায় ফুটবল সংস্থা (এএফএ) প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়৷ বয়সের দিক দিয়ে এএফএ ইতিহাসে অষ্টম৷

default
মারাদোনার খেলা দেখে পানির উপর মাঠ তৈরি!
জেলেদের গ্রাম

ছবিতে চারদিক পানি দিয়ে ঘেরা ছোট্ট একটি গ্রাম দেখতে পাচ্ছেন৷ থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত পানইয়ে দ্বীপের এই গ্রামের বাসিন্দাদের আয়ের উৎস একসময় ছিল মাছ ধরা৷ এখন তাতে যোগ হয়েছে পর্যটন৷

123456789

দ্রুত আর্জেন্টিনা জাতীয় দলও গড়ে ওঠে৷ ১৯০১ সালের ১৬ মে আর্জেন্টিনা তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে৷ প্রতিপক্ষ ছিল উরুগুয়ে, যে নামটির সঙ্গে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস এর পরের কয়েক বছরেও হাত ধরাধরি করে হেঁটেছে৷ ১৯১৬ সালে চালু হয় কোপা অ্যামেরিকা৷ আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে প্রাচীন টুর্নামেন্ট৷ আর্জেন্টিনার স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছিল এই টুর্নামেন্ট৷ কিন্তু স্বাগতিক আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায় উরুগুয়ে৷ এই দুই দেশের ফুটবলীয় সম্পর্ক রীতিমতো শত্রুতায় রূপ নিতে থাকে তখন থেকেই৷ অথচ তখনো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ সেভাবে জমেই ওঠেনি৷

ব্রাজিল যে পরে ফুটবল শুরু করেও আর্জেন্টিনাকে টপকে যেতে শুরু করেছে, এ ব্যাপারে প্রথম আঁচ আর্জেন্টাইনরা পায় ১৯১৯ কোপা আমেরিকায়৷ তত দিনে দু’টি কোপা আমেরিকার আসর হয়েছে৷ দুবারই আর্জেন্টিনাকে রানার্স আপ বানিয়েছে উরুগুয়ে৷ আর আর্জেন্টিনার বুকে প্রতিশোধের লাভা জমেছে বিষ্ফোরিত হবে বলে৷ কিন্তু কোপার তৃতীয় আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায় ব্রাজিল৷ চতুর্থ আসরে আবার উরুগুয়ে৷ অবশেষে ১৯২১ সালে আর্জেন্টিনা প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফির স্বাদ পায়৷ কিন্তু ১৯২২ সালে ব্রাজিল আর ১৯২৩ সালে উরুগুয়ে আবার কোপা অ্যামেরিকার ট্রফি জিতে নেয়৷

শুধু দক্ষিণ অ্যামেরিকা নয়; উরুগুয়ে যে সারা বিশ্বের ফুটবল পরাশক্তি হয়ে উঠেছে, সেটা দেখানোর সুযোগ তাদের সামনে ছিল না৷ তখন আন্তর্জাতিক ফুটবল তো আর এত সহজ ছিল না! উরুগুয়ে বাকি পৃথিবীকে নিজেদের ফুটবল জাদু দেখানোর সুযোগ পেলো ১৯২৪ অলিম্পিকে, ১৯২৩ কোপা অ্যামেরিকার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে৷ আর প্রথমার অংশ নিয়েই সোনা জিতলো উরুগুয়ে৷ সোনা জিতলো ১৯২৮ অলিম্পিকেও৷

এবার আর্জেন্টিনার দুঃখ হয়ে এলো উরুগুয়ে৷ এই অলিম্পিকে সুযোগ পেয়ে আর্জেন্টিনা উঠে গিয়েছিল ফাইনালে৷ এবার সুযোগ সোনা জেতার৷ কোপা অ্যামেরিকার চেয়েও বড় গর্বের হয়ে থাকবে এই সোনার মেডেল৷ কিন্তু কোথায় কী! প্রথম ম্যাচটা ১-১ ড্র হওয়ায় তিন দিন পর ফিরতি ম্যাচ হলো৷ সেখানে আর্জেন্টিনা হেরে গেল ২-১ গোলে৷ আর্জেন্টিনা কি তখনো ভেবেছিল, এর চেয়েও বড় দুঃখ তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে!
১৯৩২ অলিম্পিকে ফুটবল বাদ দেওয়া হলো৷ আর খেপে গিয়ে ফিফা ঠিক করলো, দরকার নেই অলিম্পিকের৷ আমরা নিজেরাই সারা বিশ্ব থেকে দল নিয়ে আয়োজন করবো টুর্নামেন্ট৷ এভাবেই জন্ম নিলো বিশ্বকাপ, ১৯৩০ সালে৷ আর তখনকার টানা দুবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ছিল বলে আয়োজক দেশ হওয়ার মর্যাদা পেলো উরুগুয়ে৷

ফাইনালে মুখোমুখি হলো সেই উরুগুয়ে আর আর্জেন্টিনাই৷ দুই দেশের ফুটবল-সম্পর্ক ততদিনে সাপে-নেউলে চেহারা নিয়েছে৷ ফাইনালে কোন দলের বল নিয়ে খেলা হবে, এ নিয়ে শুরু হয়ে গেল ঝগড়া৷ আর্জেন্টিনা উরুগুয়ের দেওয়া বল দিয়ে খেলতে রাজি নয়৷ নিজের দেশে বিশ্বকাপ হচ্ছে, আর উরুগুয়ে খেলবে আর্জেন্টিনার বল দিয়ে? আপোশ হলো৷ দুই অর্ধে খেলা হবে দুই দলের বল দিয়ে৷

প্রথম অর্ধে খেলা হয়েছিল আর্জেন্টিনার বল দিয়ে৷ প্রথমার্ধ শেষে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে এগিয়েও ছিল৷ কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে তিনটা গোল হজম করে বসে তারা৷ বলটা যে উরুগুয়ের ছিল!

আর্জেন্টিনার এই যে বিশ্বকাপ দুঃখ শুরু হলো, তা ঘোচেনি ১৯৭৮ সালের আগ পর্যন্ত৷ তত দিনে ব্রাজিল তিনবার আর উরুগুয়ে দু’বার চ্যাম্পিয়ন হয়ে বসে আছে! মজার ব্যাপার হলো, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতার ৪৪ বছর আগেই বিশ্বকাপ জেতা হয়ে গিয়েছিল ‘আর্জেন্টিনার’৷ ১৯৩৪ বিশ্বকাপ জয়ী ইতালি দলের চারজন খেলোয়াড় ছিল আর্জেন্টিনার৷ এর মধ্যে লুইস মন্টি ছিলেন ফুটবল বিশ্বের প্রথম দিকের তারকাদের একজন৷
১৯৭৮ বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল আরও একটি কারণে৷ সেবারই প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক হয়েছিল দেশটি৷ আর এর দুই বছর আগে ক্ষমতায় আসা আর্জেন্টিনার স্বৈরশাসক বিশ্বকাপটিকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে চেয়েছিল৷ পেরেওছিল কিছুটা৷ তবে ফুটবল ব্যাপারটা আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে কতটা পাগলামীর, সেটা বিশ্ববাসী জানলো ৮ বছর পর৷

সামরিক শাসনের ক্ষত হিসেবে পুরো আর্জেন্টিনা তখন অস্থিতিশীল৷ চারদিকে ঠাসা নিদারুণ হতাশা৷ সেই সময় দিয়েগেো মারাদোনা হয়ে উঠেছিলেন শেষ আশ্রয়স্থল৷ সেই ক্ষতের একমাত্র প্রলেপ; মহামারির একমাত্র ওষুধ৷ ব্যাপারটাকে আরও বেশি রাজনীতিক মসলা মাখালেন মারাদোনা নিজেই৷ কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হলো আর্জেন্টিনা৷ ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি তখনো টাটকা৷ টাটকা সেই যুদ্ধে আর্জেন্টিনার সেনাবাহিনীর নিদারুণ পরাজয়ের লজ্জামাখা স্মৃতি৷

খেলাধুলাকে যতই সম্প্রীতির হাতিয়ার ভাবা হোক, ফুটবল মাঠ কখনো কখনো যুদ্ধক্ষেত্রই৷ ফুটবলাররা যেন গ্ল্যাডিয়েটর৷ মারাদোনা নিজের ফুটবলের সর্বোচ্চ বিন্দু নির্মাণ করতে বেছে নিলেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটাই৷ প্রথমে হাত দিয়ে করলেন সেই গোল যেটিকে মারাদোনা বলেছিলেন ‘হ্যান্ড অব গড’৷ কিন্তু ম্যাচটা মারাদোনা তাঁর প্রতারণার জন্য স্মরণীয় করে রাখতে চাননি৷ এরপর করলেন প্রকৃত অর্থেই বিখ্যাত হওয়ার মতো গোল, গোল অব দ্য সেঞ্চুরি৷ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুটি গোলের জন্ম হলো মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে! ম্যাচ শেষে মারাদোনা বললেন, ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টিনার সন্তানদের হয়ে তিনি প্রতিশোধ নিলেন৷ আর এই প্রতিশোধে তাঁর পাশে ছিলেন স্বয়ং ঈশ্বর৷ হাত দিয়ে গোলটা তিনিই করিয়েছেন!

আর কিছু লাগে? মারাদোনা সারা আর্জেন্টিনায় চিরকালের জন্য হয়ে গেলেন মহানায়ক৷ অমর এক কিংবদন্তি, অক্ষয় এক রূপকথা৷ শুধু আর্জেন্টিনা? সারা বিশ্বেও৷ আর সেই ধাক্কা এসে লেগেছিল বাংলাদেশে৷
এ এক অদ্ভুত ব্যাপার৷ প্রায় কুড়ি হাজার কিলোমিটার দূরের দুটো দেশ৷ দূরত্বের চেয়েও বেশি দূরত্ব দুই দেশের ভাষায়৷ সংস্কৃতিতে৷ কিন্তু মিল আছে একখানে৷ আবেগের উথলানো জোয়ারে৷ দুই দেশের মানুষই ভীষণ রকমের আবেগপ্রবণ৷

আর সেই আবেগটাই যেন নাড়ির বন্ধন হয়ে গেছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে৷ দক্ষিণ অ্যামেরিকার অনেক দূরের আর্জেন্টিনাকে এই দেশের মানুষ ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়েছে৷ ফুটবলের সূত্রে তো বটেই, তবে তার চেয়েও বড় যোগসূত্রের নাম মারাদোনা, সেই ফুটবলার, যিনি খেলাটাকেও ছাপিয়ে গিয়েছিলেন৷ ফুটবলের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল একজন ফুটবলার৷

সেই ভালোবাসা আরও প্রবল হলো ১৯৯৪ সালে, ডোপ টেস্টে ধরা পড়ে মারাদোনা যখন বহিষ্কৃত! এ ব্যাখ্যাতীত৷ এ-ও যেমন ব্যাখ্যাতীত, গত ২৫ বছরে আর্জেন্টিনা কোনো ট্রফিই জেতেনি৷ কোপা অ্যামেরিকা জিতেছিল সেই ১৯৯৩ সালে৷ সর্বশেষ বিশ্বকাপ জিতেছে ৩২ বছর আগে৷

তবে ৩২ বছরের শিরোপা খরায় ভালোবাসা কমেনি, বরং আরও প্রবলতর হয়েছে৷ কেন? সেটা অনুমান করা যায়৷ কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা না করে ভালোবেসে যাওয়াই তো বিশুদ্ধতম ভালোবাসা৷ আর আর্জেন্টিনা সেই অহংকারী প্রেমিকা, প্রেমিককে যে অনবরত কাঁদায়৷ চোখের জল কখনো শুকোতে দেয় না৷ ডয়চে ভেলে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.