দুর্নীতির বাড়ি কই?

জিয়াউদ্দিন সাইমুম।
দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের শাস্তির হুমকি দিতে আমাদের সরকার প্রধানরা কখনই ভুল করেন না। কিন্তু এটা বলেন না, ‘দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদরাও শাস্তি পাবেন’। ভাবখানা যেন এই, ‘রাজনীতিবিদরা তো দেশের সেবা করতে করতে হয়রান হয়ে যান, তাদের দুর্নীতির সুযোগ কোথায়?’

প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি করতে দেখেই শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তারাও দুর্নীতিতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। অবসরে যাবার পর এ সরকারি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ আবার রাজনীতিতেও নাম লেখান। কারণ তারা দুর্নীতিতে স্থায়ীভাবে জড়াতে চান। আবার প্রশাসনের কিছু ক্ষেত্রে যিনি যত বড় দুর্নীতিবাজ, তাকেই পরবর্তী সরকার আরও কাছে টানেন।

রাজনীতিবিদরা ভালো করেই বোঝেন, এ জাতীয় কর্তাদের মাধ্যমেই বিশেষ বিশেষ এসাইনমেন্ট কাভার দেয়া সম্ভব। এদের কদর কখনই কমে না।

চাকরি নেই, ব্যবসা নেই। মন্ত্রিত্ব শেষ হয়েছে পনের বছর আগে। তারপরও জৌলুস একটুও কমেনি, এমন মন্ত্রীর সংখ্যা বাংলাদেশে কম না। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা দিয়েই এরা সারাজীবন রাজার হালে থাকেন।

আমাদের দেশে মাঝে মাঝে হরেক কিসিমের ‘সংস্কার’ এর জোয়ার ওঠে। আমি বিশ্বাস করি, সংস্কার যদি হতেই হয়, তাহলে প্রথমে রাজনৈতিক দলগুলোরই হওয়া উচিত। রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিমুক্ত হতে না পারলে অথবা দুর্নীতির কারণে অভিযুক্তদের দল থেকে বহিষ্কার করার মতো উদ্যোগ না নেয়া হলে রাজনীতিবিদরা দুর্নীতির তুফান মেইল ছুটিয়ে যাবেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের দাবি তোলার আগে আসুন জেনে নেই, দুর্নীতি কাকে বলে বা দুর্নীতির বাড়ি কোথায়?

বাংলা উইকিপিডিয়া মতে, দুর্নীতি শব্দটি যখন বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন সাংস্কৃতিক অর্থে ‘সমুলে বিনষ্ট হওয়াকে’ নির্দেশ করে। আর দুর্নীতি শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন আরিস্ততল। তারপর ব্যবহার করেন সিসারো যিনি ঘুষ এবং সৎ অভ্যাস ত্যাগ প্রত্যয়ের যোগ করেছিলেন। তবে রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক মরিস লিখেছেন, দূর্নীতি হল ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার। চেম্বার্সের টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ডিকশনারি অনুসারে করাপ্ট শব্দটির অর্থ হচ্ছে টু মেইক পিউট্রিড অর্থাৎ টু টেইন্ট, টু ডিবেইজ, টু স্পয়েল, টু ডেসট্রয় দি পিউরিটি অব।

আবার করাপশন শব্দটির অর্থ করা হয়েছে পচা, ঘুষ, ভেজাল, কৃত্রিম ও নকল হিসেবে। তবে হাল আমলের উইকিপিডিয়া মতে দর্শন, ধর্মশাস্ত্র অথবা নৈতিকতার আলোকে দুর্নীতি হচ্ছে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অবক্ষয় অথবা অর্থনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুতি। সে পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতিকে অনার্জিত আয় বলা যাবে, যা প্রাপ্তিতে আইন ও বিধি স্বীকৃত রোজগারের পন্থা অনুসৃত হয়নি।

দুর্নীতিকে অনেকেই ঘুষ, কিকব্যাক অথবা বকশিশের আরেক নাম বলে অভিহিত করেন। আবার রাজনৈতিক দুর্নীতি বলতে সাধারণত সরকারি (পাবলিক) ক্ষমতাবলে প্রাপ্তসম্পদের অপব্যবহারকে বোঝায়, যার পিছনে অবৈধ ব্যক্তিগত লাভক্ষতির বিবেচনা কাজ করে। এ ধরনের দুর্নীতিতে সরকারি কর্মকর্তারা জনস্বার্থ উপেক্ষা করে এবং আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঘুষ ও ভোট কেনাবেচার মাধ্যমে বিশেষ করে স্বার্থান্বেষী মহলের অনুকূলে সরকারি সিদ্ধান্ত করে দেন। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে একটি লাভের বিনিময়ে পণ্যসেবা হিসেবে বিক্রি করা হয়। তবে সিস্টেমিক করাপশন অর্থাৎ সর্বগ্রাসী কাঠামোবিস্তৃত দুর্নীতিটাই সবচেয়ে মারাত্মক।

বোঝা যাচ্ছে, সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘রাজনৈতিক দুর্নীতির’ দায় থেকে রাজনীতিবিদরা ইনডেমনিটি এমনিতেই পেয়ে গেছে। কারণ ‘রাজনৈতিক দুর্নীতির’ জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের দায়ী করা হলেও রাজনীতিবিদদের বিবেচনায় আনা হয়নি। রাজনীতিবিদদের সুবিধা এখানেই।

লেখক: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.