নতুন রাজধানী গড়ার সুপারিশ

ঢাকার যানজট কমানো নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত বিশেষজ্ঞরা

নতুন রাজধানী গড়ার সুপারিশ

 

রাজধানী ঢাকার যানজট কমানোর উপায় কী? কারো মতে, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ। কেউ বলেছেন, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ (এক রুটে এক কোম্পানির বাস)। কেউ আবার বাস সার্ভিস পুরোপুরি বন্ধের পক্ষে। মত এসেছে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও মেট্রোরেল চালু করার পক্ষে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও রিকশা নিয়ন্ত্রণের কথাও বলেছেন কেউ কেউ। তবে যানজট কমাতে অধিকাংশেরই সুপারিশ নতুন রাজধানী গড়ার।

গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আয়োজনে ‘নগর ঢাকায় যানজট: উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে নানামুখী মতামত শুনে অনেকটাই হতাশ হন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। তিনি বলেন, ঢাকা শহর এখন আইসিইউর রোগী। মেয়র তার ডাক্তার, যিনি ডাক্তারি পড়েননি। ডাক্তারের জ্ঞান কম, কিন্তু সাহস বেশি। তাই রোগীকে বাঁচাতে হবে। রোগী মরে যাচ্ছে আর আমরা শুধু গবেষণা করছি, তা হবে না। ঢাকাকে বাঁচাতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। সমস্যা ৪০-৫০ শতাংশ কমাতে হবে।

রাজধানীর উত্তরা থেকে হাতিরঝিল পর্যন্ত যানজট কমাতে ছয়টি ইউলুপ নির্মাণের সুপারিশ করে এজন্য প্রয়োজনীয় জমি সরবরাহের আহ্বান জানান আনিসুল হক।

উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের বক্তব্য শুনে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আপনি এক ঝুড়িতে এত ডিম রাখলে হবে না। আগে ছোট পরিকল্পনা নিন, বাস্তবায়ন করুন। সিস্টেমেটিক ওয়েতে (পদ্ধতিগতভাবে) কাজ করুন। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে না পারেন, রাস্তা দখলমুক্ত করেন। সবাই ভালো ভালো কথা বলে। কিন্তু অ্যাকশন নেই। পাশাপাশি অবৈধ রিকশা বন্ধের সুপারিশ করেন মন্ত্রী।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা রিকশা বন্ধের প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, এতে উত্তরবঙ্গের বিশেষত মঙ্গাকবলিত এলাকার যেসব লোকজন ঢাকায় এসে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন, তারা বেকার হয়ে পড়বেন। এজন্য রিকশাচালকদের পুনর্বাসনের সুপারিশ করেন তিনি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করেন। এক্ষেত্রে সপ্তাহে একদিন জোড় ও একদিন বিজোড় নম্বরের গাড়ি চলাচলের পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

যানজট, জলজট ও অবকাঠামো উন্নয়নে নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে রাজধানী ঢাকা এখন বাস অযোগ্য নগরীতে পরিণত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলেন, এ শহরে ট্রাফিক ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। সর্বত্র যানবাহন চলাচলে আইন লঙ্ঘনের অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের লোকজনের সামনেই যেখানে সেখানে যানবাহন পার্কিং ও ফুটপাতসহ রাস্তার অনেকাংশ অবৈধ দখলে থাকে। পাশাপাশি নানা উন্নয়ন প্রকল্পের অনুন্নত ব্যবস্থাপনায় রাজধানী ঢাকার যানজট ক্রমান্বয়ে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। তাই রাজধানী যানজটমুক্ত করতে শুধু স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই চলবে না। পাশাপাশি প্রয়োজন মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

গোলটেবিল আলোচনায় চারটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। প্রথম প্রবন্ধে পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) খন্দকার গোলাম ফারুক যানজটের ২৯টি কারণ ও তা দূরীকরণে ৩৯টি সুপারিশ তুলে ধরেন। পাশাপাশি মেট্রোরেল নির্মাণকালীন নাগরিক দুর্ভোগ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। তিনি বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য আগামী ডিসেম্বরে শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হবে। তখন ঢাকা শহরে চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ থেকে কিছুটা হলেও বাঁচতে শাজাহানপুর থেকে মগবাজার হয়ে মহাখালী পর্যন্ত সড়কটি রিকশামুক্ত করতে হবে। তাহলে বিকল্প সড়কের সুফল পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, ট্রাফিক সিগন্যালে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। এ থেকে বাঁচতে স্বল্পমেয়াদে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ইউলুপ নির্মাণ করা দরকার। তবে ঢাকা শহরের সড়ক পর্যাপ্ত চওড়া নয়। তাই বিকল্প সমাধান হিসেবে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে বিআরটি ও মেট্রোরেলগুলো দ্রুত চালু করতে হবে। তবে ঢাকার যানজট কমানোর জন্য নতুন রাজধানী গড়া এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ঢাকার যানজট কমাতে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজে গুরুত্ব দেয়া উচিত। এতে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে, দক্ষতাও বাড়বে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় ইউলুপ নির্মাণ করতে হবে। তবে মেট্রোরেল বা লাইট (হালকা) রেল দিয়ে যানজট কমানো যাবে না। পরিকল্পিতভাবে নতুন রাজধানী গড়ে তুলতে হবে।

এদিকে রাজধানীর যানজট নিরসনে বাস ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করেন ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্সের সভাপতি অধ্যাপক এম শামিম জেড বসুনিয়া। তিনি বলেন, উত্তরা থেকে বাস আসছে, মিরপুর থেকে আসছে, নিউমার্কেট থেকে আসছে। সবার গন্তব্য গুলিস্তান বা মতিঝিল। ১০০ বাস যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে। এজন্য একটাই রুট শাহবাগের মোড়। এতে শাহবাগে প্রচুর যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। তাই বাস বন্ধ করে দেয়া উচিত। পাশাপাশি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের সমালোচনাও তিনি করেন।

আরবান হ্যাবিটেড লিমিটেডের চেয়ারম্যান স্থপতি তানওয়ার নেওয়াজ বলেন, বসুনিয়া সাহেবের ধারণা পুরোপুরি ভুল। বাস বন্ধ করে কখনই ঢাকার যানজট কমানো যাবে না। বরং ঢাকায় প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এজন্য যানজট হ্রাসের মহাপরিকল্পনার (এসটিপি) সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাস ছাড়া এ শহরে মুক্তি নেই উল্লেখ করে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, যানজট সমস্যা রাজধানীতে প্রকট আকার ধারণ করেছে। মূলত নিয়ন্ত্রণহীন, মানহীন সেবা ও প্রয়োগহীন আইনি পরিবেশ আজকের এ অবস্থার জন্য দায়ী। মাত্র ৬ শতাংশ প্রাইভেট কার মূল রাস্তার ৮০ শতাংশ দখল করে রাখে। তাই আমাদের যেটুকু সড়ক, ততটুকু যদি গণমানুষের কথা চিন্তা করে সুপরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারি, তবে যানজট অনেকটা কমে যাবে। গণপরিহনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আর মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর যানজট খুব বেশি কমবে না। আবার এর ভাড়াও হবে ১০০ টাকার বেশি। এতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে না। তাই ঢাকার ওপর চাপ কমাতে নতুন নগর গড়তে হবে।

ডিএনসিসির মেয়র আনিসুল হকের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি স্থপতি আবু সাঈদ এম মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক স্থপতি কাজী এম আরিফ, ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিএম এনামুল হক, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ প্রমুখ।

উল্লেখ্য, গোলটেবিল বৈঠক আয়োজনে যৌথভাবে সহায়তা করে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স ও ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ। বণিক বার্তা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.