নারীবাদীর প্রেম কেমন, দেখা বাকি

যে সারা জীবনের সব পরিশ্রম, সব সঞ্চয় স্বচ্ছন্দে দাবি করে কিন্তু শূন্য হাতে বাড়ি থেকে বার করে দেওয়ার ভয় দেখায় নিত্যদিন, সে-ও আপনজন। লিখছেন স্বাতী ভট্টাচার্য, আনন্দবাজার
শ্রীকান্ত সব বিষয়ে ইন্দ্রনাথের সাগরেদ। দূরত্ব টের পাওয়া গেল প্রথম যে দিন দু’জনে গিয়ে দাঁড়াল তেঁতুল-পাকুড়ের ছায়ায় অন্ধকার, ঝোপ-জঙ্গলে ঘেরা অন্নদাদিদির কুটিরে। শাহজি মুসলমান সাপুড়ে, হিন্দিতে কথা বলে। অন্নদার পরিধান মুসলমানীর, কিন্তু মাথায় মেটে সিঁদুর। স্বামী ঠগ, প্রতারক, সেই লজ্জা হাসি দিয়ে চাপা দিতে চায়। নেশার মাথায় দুর্দান্ত রাগে স্বামী লাঠি মেরে মাথা ফাটিয়ে দেয়, ইন্দ্রনাথ বহু কষ্টে তাকে কাবু করে বেঁধে ফেলে। স্ত্রী জ্ঞান ফিরে পেয়ে স্বামীর বাঁধন খুলে দিয়ে বলে, যাও ঘরে গিয়ে শোও। ইন্দ্র ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, কিন্তু অন্নদাকে নিজের মধ্যে অনুভব করতে পারে শ্রীকান্ত। যে দিন অন্নদা দুশ্চরিত্র স্বামীর জন্য ঘর ছেড়েছে, সে দিন থেকে তার নিজের হাতে নিজের মুখে কালি মাখানোর দিনও শুরু হয়েছে। যন্ত্রণা ছাড়া কিছু পাওয়ার নেই, অথচ ছেড়ে গিয়েই বা কী পাবে সে। ব্রাহ্মণ বিধবার প্রেম-মাধুর্যহীন জীবন থেকে মুক্তি পেতে অন্নদা বাঁধা পড়েছিল নির্যাতনের আবর্তে। দিদি বার বার দুই ভাইকে বলে, তোমরা আর এসো না।

অন্নদা একটা প্রোটোটাইপ। তাদের মতো মেয়েদের মার খেতে দেখে যাঁরা বাঁচাতে যান, তাঁদের শুনতে হয়, ওটা আমাদের ব্যাপার, আপনার কী। আহত হয়ে তাঁরা সরে আসেন, অনুভব করেন যে নির্যাতনের অনেকটাই চলে সম্মতিতে। মেয়েরা মার খেতে চায়, এমন নয়। কিন্তু মারের হাতকে সে ভেঙে দিতেও চায় না। যা আদরের, সোহাগের হাত, তা-ই চড়থাপ্পড় মারার হাত।

নির্যাতনকারীর সঙ্গে নির্যাতিতের এই যে ঘনিষ্ঠ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, যেখানে সব সময়ে প্রেম আর বিদ্বেষের একটা দোলাচল চলে, এই হল নারী নির্যাতনের অনন্য মাত্রা। কথাগুলো সম্প্রতি বলছিলেন শেফালি মৈত্র। দর্শনের অধ্যাপক, নারীবাদী লেখক তিনি। জাতীয় শিক্ষা পরিষদে একটি স্মারক ভাষণে বলছিলেন, ধারাবাহিক নির্যাতন তো শুধু মেয়েদের উপরেই হয় না। দলিত- জনজাতির উপর উচ্চবর্ণ, কালোর উপর সাদা, দরিদ্রের উপর ধনী, স্বল্পশিক্ষিতের উপর উচ্চশিক্ষিত দীর্ঘ দিন ধরে নির্যাতন চালিয়ে আসছে। সে নির্যাতনে চন্ডত্ব বা ভায়োলেন্স (মারধর, ঠ্যাঙানো) যেমন আছে, তেমনই হয়রানি, অতিষ্ঠ করা, পেছনে লাগা, এমন মানসিক হয়রানিও আছে। আবার শোষণ, বঞ্চনার মতো আর্থ-সামাজিক নির্যাতনও রয়েছে। কিন্তু প্রেম-অপ্রেম এ দুইয়ের দ্বান্দ্বিকতা কেবল মেয়ে-পুরুষ সম্পর্কেই রয়েছে। প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্কে তা মেলে না। যে নির্যাতন করছে, সে-ই যে ভালবাসার মানুষ। আর ভাল না বাসতে পারলে জীবনে রইল কী! তাই যে মারধর করে, বা ঠেস দিয়ে কথা বলে, অতিষ্ঠ করে, সবার সামনে অপমান করে, যে সারা জীবনের সব পরিশ্রম, সব সঞ্চয় স্বচ্ছন্দে দাবি করে কিন্তু শূন্য হাতে বাড়ি থেকে বার করে দেওয়ার ভয় দেখায় নিত্যদিন, সে-ও আপনজন। তার থেকে সরে আসার কথা ভাবতে গেলে নিজেকে আর খুঁজে পায় না মেয়েরা। এখানেই নারী নির্যাতন অন্য সকল নির্যাতনের থেকে পৃথক। ‘পিড়নকারীর সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েরা বলতে পারে না, শিকল ছাড়া আমার হারাবার কিছু নেই,’ বললেন শেফালি মৈত্র।
শিকল কি একটা? বরের সঙ্গে রয়েছে ঘর। নিজের হাতে সাজানো ঘর-গেরস্তালি ছেড়ে আসার চেয়ে হৃদপিণ্ডটা উপড়ে আনা সোজা। চালের বাতায় গোঁজা তালপাতার পাখা, ঘরের কোণে গুটোনো মাদুরটা পর্যন্ত গ্রামের মেয়েটির কাছে মহার্ঘ্য। নিজের হাতে সাজানো কালার-কোঅর্ডিনেটেড ড্রয়িং-ডাইনিং ছেড়ে চলে যাওয়ার চাইতে সর্বসমক্ষে দুটো কথা শোনা শহুরে মেয়েদের কাছে সোজা মনে হয়। ‘সারাদিন বাড়িতে থাকো, অমুকটাও করতে পারো না’ গোছের কথা হজম করার জন্য মেয়েরা এ ওকে বলে, ‘উফ আজ আমার বর আমাকে যা বকল।’ এ কেবল ন্যাকামো নয়, এ একটা কোপিং মেকানিজম – সহ্য করা, সইয়ে নেওয়ার কৌশল। এক ধরনের নীরব বোঝাপড়া, যা মেয়েদের প্রকাশ্য অসম্মানকে সহনীয়, এমনকী প্রার্থনীয় করে তোলে।

যে মেয়ে এই খেলায় যোগ দেয় না, বরং সম্পর্কে সাম্য বজায় রাখাকে অস্পষ্ট ধারণা থেকে দৈনন্দিন প্র্যাকটিসে আনতে চায়, সে ‘বহিরাগত।’ তাদের প্রতি অন্য মেয়েরা নির্মম হয়ে ওঠে। তাঁর টিফিন তাঁর বর তৈরি করে দেয়, এক তরুণী অধ্যাপিকা এ কথা বলতে কলেজের স্টাফ রুমে ঝড় বয়ে গিয়েছিল। ‘কী ভাল বর পেয়েছিস’ গোছের মিষ্টি কথার আড়ালে নিন্দা-অপবাদের ঝাঁঝ। এক সহকর্মী পড়াশোনার জন্য কিছু দিন বিদেশে ছিলেন। তাঁর ছেলেকে স্কুল-বন্ধুদের মায়েরা নিত্য শুনিয়েছেন, ‘তোর মা তো তোদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। তোকে ভালবাসে না।’

নারীর মর্যাদারক্ষায় আপসহীন হতে গেলে যেন প্রেম-সোহাগ, ঘর-গেরস্থালির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হয়। এটাই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটা মস্ত সঙ্কট। শিক্ষিত, রোজগেরে মেয়েরাও যে চট করে নারীবাদের দিকে ঝোঁকে না, তার কারণ তারা আন্দাজ করতে পারে, প্রচলিত প্রেম-ভালবাসা, ঘর-সংসারের সঙ্গে মেয়েদের অধিকার-স্বাতন্ত্র্যের কোথাও একটা সংঘাত রয়েছে। যে প্রেম মেয়েদের সমান অধিকার, সমান মর্যাদার জমিতে শিকড় গেড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, সে প্রেমের চেহারাটা কেমন, তা একবিংশের সদ্য-তরুণীর কাছেও স্পষ্ট নয়। বাংলা সিনেমা-সিরিয়াল-সাহিত্য, কোথায় তেমন রোম্যান্টিক প্রেম দেখেছে সে? একা মেয়ের লড়াই অনেক দেখেছে, তারা কেউ কেউ পুরুষদের পিটিয়ে পাট করে দিয়েছে। মেয়েদের যৌনতা, যৌন-ইচ্ছা, বিয়ের বাইরে স্বেচ্ছায় যৌন-সম্পর্ক, সে সব মেয়েরা পড়েছে, দেখেছে। মেয়েদের অসম্মতির অধিকার আছে, সে-ও তারা বিশ্বাস করে। ধর্ষণের বিরুদ্ধে মোমবাতি মিছিল করে, কলম-ক্যামেরা ধরে মিলেনিয়ামের মেয়েরা। কিন্তু প্রেম?

যেটাকে বলে ফ্লার্ট করা, বাংলায় ছেনালিপনা, তা ছেলে-মেয়ে দুজনেই আজ অবাধে করে। কিন্তু যখনই তা একটা সম্পর্কের দিকে যায়, নতুন বাড়ির দেওয়ালে প্রাচীন বটের চারা মাথা চাড়া দেওয়ার মতো মেয়েদের স্বেচ্ছা-অধীনতা কোথা থেকে উঠে আসে। দু’লক্ষ টাকা, নিদেন একটা মোটরবাইক, আসবাবপত্র তো দিতেই হবে, তার বয়ফ্রেন্ড কি ফেলনা। এমনই হয়, এটাই নিয়ম। ভালবাসে বলেই না চাইছে। না দিতে পারলে মার তো খেতেই হবে। যদি মাথায় ডান্ডা মেরে, গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মিতা দাসের মতো, মরে যেতে হবে। নইলে ওই তো পড়ে আছে নারী অধিকারের শ্মশানভূমি, সেখানে প্রেমের শব নিয়ে শক্তির সাধনা করো।

নারীবাদীর লড়াই কেমন, অনেক দেখা আছে। নারীবাদীর প্রেম কেমন, দেখা বাকি। এ বার তার খোঁজ করতে হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.