নিউইয়র্কে যাপিত জীবনের কথকতা

রিমি রুম্মান, নিউইয়র্ক (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে |

নিউইয়র্কের যে এলাকায় আমার বসবাস সেখানে আমি আছি ষোলো বছর। আশপাশে বাঙালি পরিবার নেই। ছেলেকে নিয়ে মসজিদে যাওয়ার পথে দুই ব্লক দূরে একজন হিজাব পরিহিতা নারীকে দেখি গত বসন্তে। বাড়ির সামনে বাগান পরিচর্যা করেন মাঝে মাঝে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে ফায়ার হাইড্রেন্টের ঢাকনা খুলে সেখান থেকে প্রবল বেগে নির্গত পানি নিয়ে খেলা করছিল ও একে অপরকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল কিছু স্প্যানিশ ছেলেমেয়ে। একজন চেঁচিয়ে রূঢ় ভাষায় বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে হিজাব পরিহিতা নারীর সঙ্গে। একটু মনোযোগ দিতেই বুঝলাম, মেয়েটি সেই নারীর কন্যা। আমি ভীষণ অবাক হলাম। কেননা, মেয়েটির সংক্ষিপ্ত পোশাক, আচরণ ও মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার কোনোভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মেলাতে পারছিলাম না।

এ বছর বসন্তের শুরু কেবল। কেউ কেউ বাগান করার পূর্ব প্রস্তুতি শুরু করেছেন। গত সপ্তাহের এক বিকেলে ছেলেকে মসজিদে দিয়ে ফেরার পথে সেই নারীকে তার বাড়ির সামনের মাটি খুঁড়তে ও পরিষ্কার করতে দেখে কুশল বিনিময় করি। তার মেয়েদের কথা জিজ্ঞেস করি। বললেন, ওরা এখানে থাকে না। বড় মেয়েটি আঠারো বছর। স্প্যানিশ বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে চলে গেছে এই বলে যে, এ বাড়িতে তার কোনো প্রাইভেসি নেই। ছোট মেয়েটির বয়স তেরো বছর। সেও কখনো বাড়ি ফেরে, কখনো ফেরে না। আমি আঁতকে উঠি! মাত্র তেরো! আমার বড় ছেলে রিয়াসাতেরও যে তেরো চলছে! এর আগে দুবার এ বাড়িতে এসেছি, গল্প করেছি ও বৈকালিক চা পান করেছি। নামাজের ওয়াক্তে মেয়েদের বাবাকে বাড়ির পাশের মসজিদে যেতে দেখেছি। পর্দানশিন মা ও পরহেজগার বাবা। এমন পরিবারে এমন বেপরোয়া মেয়ে! বললেন, মেয়েদের সঠিক পথে আনবার জন্য তিনি তিলতিল করে গড়া ক্যারিয়ার, চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছেন। আমি বুঝি, দেরি হয়ে গেছে। বড় বেশি দেরি হয়ে গেছে।

বাড়ি ফিরছি। ভাবছি, অন্য শহরে থাকা আমার এক বন্ধুর কথা। গত সপ্তাহে সে জানিয়েছিল, তাদের পারিবারিক এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে জামিনে মুক্ত করে আনবার কথা। ভদ্রলোককে পুলিশে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তার নিজেরই টিনএজ মেয়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে। মেয়ের অভিযোগ বাবা-মা দিন রাত চাকনি নিয়ে ব্যস্ত থাকে, চার বছর বয়সী ছোট বোনটিকে তার তত্ত্বাবধানে রেখে। তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, বকাঝকা করে, কখনো কখনো গায়ে হাত তোলে ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

আমার শরীর অবশ হয়ে আসে। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের এ কেমন সম্পর্ক। এ কোন দেশে এলাম! একটু অবসর পেলেই যেখানে আমার বাবা-মার কথা মনে পড়ে। বুক ভেঙে কান্না পায়। বাবা-মার সঙ্গে থাকার সময়টা আমার এতটুকু জীবনের সেরা সময়। সেই সোনালি সময়টা ফিরে পেতে চাই সবকিছুর বিনিময়ে। অথচ, আজকালকার ছেলেমেয়েদের এ কোন অন্ধকার সময়! বিকেলের নরম সোনালি আলোয় হেঁটে যেতে যেতে আমার চারপাশ অন্ধকার লাগে। ভীষণ অন্ধকার!

দিনরাত কাজে ডুবে থাকা, ডলারের পিছু ছুটে চলা বাবা-মায়ের সন্তানেরা একাকী তলিয়ে যাচ্ছে গহিন কূপের অন্ধকারে একটু একটু করে। দেশে থাকতে আমার বাবা-মা দুজনই ব্যবসা আর চাকরির পাশাপাশি সময় দিয়েছেন আমাদের। আমরা দুপুর ও রাতের খাবার একসঙ্গে বসে খেয়েছি। খাবারের টেবিলে হাসিঠাট্টা, গল্প, সারা দিনের ঘটে যাওয়া ঘটনা শেয়ার করেছি। আমাদের কখনো বিদেশ ঘোরা হয়নি, এমনকি পাশের দেশ ভারতও নয়। কিন্তু মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় বাবা আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন কাপ্তাই, রাঙামাটি, চন্দ্রঘোনা। পাহাড় দেখিয়েছেন। জঙ্গল দেখিয়েছেন। চাকমা রাজবাড়িতে নিয়ে গিয়েছেন। কীভাবে কাগজ তৈরি হয়, কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে…সব, স-ব। অতঃপর সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাওয়ার সময় আমার বোনটি অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় সেবার আর সমুদ্র দেখা হয়নি আমাদের।

rr

 

আমার তেরো বছরের ছেলে রিয়াসাত স্কুল ট্রিপে গেলে মাঝে মাঝে কিছু ডলার হাতে দিয়ে বলি, কিছু খেতে মন চাইলে খেয়ো। সে নেয় না। কিছুতেই নেয় না। বলে, মানি লাগবে না, স্কুল থেকে লাঞ্চ দেয়। এক জোড়া জুতো নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আরেক জোড়া কিনতে রাজি হয় না। আমার মুখে হাসি না দেখলে জড়িয়ে ধরে জানতে চায়, তার কোনো আচরণে কষ্ট পেয়েছি কি না।

 

পাঁচ বছরের ছেলে রিহান প্রতি ভোরে স্কুলের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয় যখন, সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে শেষ দুই সিঁড়ি ওপরে থেমে থাকে। আমি দ্রুত পায়ে নেমে গেলে সে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ওঠে, আম্মু তুমি জিতেছ। নিজে হেরে গিয়ে মাকে জিতিয়েই তার দিন শুরুর আনন্দ! আবার দুপুরে স্কুল গেটে আমাকে দেখেই দৌড়ে এসে বলে, তুমি জানো আমি কি এনেছি তোমার জন্য? আমি রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে বলি, কি? অতঃপর ব্যাগ থেকে আপেল কিংবা কমলা বের করে আনে। জিজ্ঞেস করে, তুমি লাইক কর? আমি চোখ গোলাকৃতি করে পৃথিবীর সমস্ত বিস্ময়, আনন্দ ঢেলে দিয়ে বলি, তুমি কীভাবে জানলে, আমি এটি লাইক করি! সেই সুযোগে রিহান আমার গায়ে গা ঘেঁষে আস্তে করে জেনে নেয়, তুমি রিহান লাভ করো? আমি তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরি, শক্ত করে। ভীষণ ভাবে। বলি, আই লাভ ইউ, বাপ।
এই যে এদের এমন করে ভালোবাসি, আগলে রাখি প্রতিনিয়ত এসব কী বৃথা যাবে?

 

এই যে এই বিদেশ বিভুঁইয়ে ওদের রেখে কোনো দিন এক মুহূর্তের জন্যও চাকরি করিনি, ডলারের পিছু ছুটিনি—এর মূল্য শুধু সময়ই জানে, আর জানেন আমার স্রষ্টা।দেশে গেলে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন, বিদেশের বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি না করলে নাকি সংসার চালানো কঠিন। একজনের আয়ে কেমন করে চলে? আমি বলি, কঠিন নয়। চলা যায়। সুন্দরভাবেই চলা যায়। যদি না অপচয় করি, যদি না বিলাসিতা করি। যদি কৃচ্ছ্রতা সাধন করি। চলতে পারা, না পারা নির্ভর করে শুধুই চাহিদার ওপর।

 

লেখাটি লিখবার সময় চোখ আঁটকে থাকে টেবিলে রাখা পত্রিকায়। নিউইয়র্ক শহরের সেরা হাইস্কুলগুলোতে ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে গত সপ্তাহে। বাংলাদেশি ছাত্র-ছাত্রীদের সাফল্য ঈর্ষণীয়। ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা। যেসব বাবা-মা তাঁদের সন্তানদের সময় দিয়েছেন, কঠোর পরিশ্রম করেছেন এ আনন্দ কেবলই তাঁদের।
শুভকামনা সকল সন্তানদের।
শুভকামনা সকল বাবা-মাকে…।

Source: lekhapora24.com

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.