নুহাশপল্লীতে একদিন

হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী ।
আসলে প্ল্যান-প্রোগ্রাম করে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, সেটা এই নাগরিকজীবনে ঠিক হয়ে ওঠে না। তার ওপর ওই মানুষটি যদি হোন মিডিয়াকর্মী অর্থাৎ সাংবাদিক, তাহলে তো আর কথাই নেই।

আমার হয়েছে সেই দশা। বাসায় কতোবার আলোচনা করেছি, ‘নুহাশপল্লীতে একবার বেড়াতে যাওয়া দরকার, একবার অবশ্যই যেতে হবে’ ইত্যাদি। কিন্তু জীবনের ক্রিকেটমাঠে ব্যাটে-বলে কি আর সহজে মিলে! কাজেই ‘যাব-যাই-যাচ্ছি’ করেই কেটে গেল অনেক, অনেকগুলো দিন-মাস-বছর।

এর মধ্যে গত ১৭ ডিসেম্বর বল এসে আঘাত হানলো উইকেটে। ঘটনাটি এরকম : ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে যখন অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত (পাঠক লক্ষ্য করুন, সেদিন কিন্তু বিজয় দিবস অথচ ছুটি নেই), বউ এসে জানালো, পরদিন ছেলে-মেয়ে দু’জনের কারোই কোচিং নেই। মেয়েটা অনেকদিন ধরে বলছে নুহাশপল্লী দেখবে। কাল কি কি যাওয়া যাবে?

অনুজপ্রতিম (শাহ মুহাম্মদ) মোশাহিদকে ফোন করলাম নুহাশপল্লী পর্যন্ত যাওয়ার সুলুকসন্ধান পেতে। মোশাহিদ শুধু সাংবাদিক-ছড়াকারই নয়, জনাদুই বন্ধুকে নিয়ে ছোটখাট একজন ট্যুর অপারেটরও। মোশাহিদ জানালো, মতিঝিল থেকে ঢাকা পরিবহনে চড়ে বসলেই হবে। ওরা সব চেনে।

কিন্তু পরদিন সকালে সকালে মতিঝিল গিয়ে দেখলাম, ওরা আসলে কিছুই চেনে না। কী করা! অবশেষে ঢাকা পরিবহনের একজন হোতাপাড়া এলাকাটি চিনলো।

এমন সকালেও যানজট। তার মধ্য দিয়েই রিকশার গতিতে চলছে আমাদের বাস। টঙ্গি গিয়ে কেমন যেন সন্দেহ হলো। হোতাপাড়া চিনতেপারা সেই কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা তো মনে হয় হোতাপাড়া যাও না। আমাদের কোথায় নামাবে?

কন্ডাক্টর এবার আসল কথা বললো। আমাদের নামতে হবে গাজীপুর চৌরাস্তা। সেখান থেকে হোতাপাড়া যাওয়ার অনেক গাড়ি মিলবে।

তা-ই হলো। গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে হোতাপাড়া ১২ কিলোমিটার দূরে। যেতে হলো লেগুনায়। হোতাপাড়া থেকে পিরুজালি গ্রাম অর্থাৎ নুহাশপল্লীর দূরত্ব আরো আট কিলোমিটার। যেতে হবে রিকশা, অটোরিকশা অথবা অটোবাইকে। পেলাম একটা অটোবাইক। ভাড়া হাঁকল দুই শ’ টাকা।আপত্তি জানাতেই বাইকঅলা বিনয়ের অবতার : ‘আপনারা যদি না দেন…’

অবশেষে দেড় শ’ টাকায় রফা করে চলতে শুরু করলো অটোবাইক। চলছে তো চলছেই। এ পথ যেন ফুরোবার নয়। গ্রামীণ রাস্তা। লোক চলাচল বলতে গেলে নেইই। দু’পাশে বিরান ক্ষেত, মাঝে মাঝে দুএকটা জীর্ণ বাড়ি, একটা-দু’টো টিনের বাড়িও আছে। বোঝাই যায়, সেই চিরকালীন গ্রামবাংলা ; দারিদ্র্য যার অঙ্গের ভূষণ।

অনেক পথ পেরিয়ে, অনেক সময় কাটিয়ে আমরা এসে নামলাম নুহাশপল্লীর গেটে। ঢুকতে হয় টিকেট কেটে। টিকেটের দাম শুনে দ্বিতীয় দফা ভিরমি খেলাম – মাথাপিছু দুই শ’ টাকা! কী আর করা। পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে।

এতো কিছু সেরে নুহাশপল্লীতে ঢুকতেই মনটা জুড়িয়ে গেলো। প্রিয় লেখকের স্বপ্ন ও স্মৃতিমাখা নন্দনকানন এটাই! কতো যত্ন করে হুমায়ূন আহমেদ সাজিয়েছিলেন এই সবুজ স্বর্গ! তিনি আজ কোথায়! ভাবতেই বিষাদে ছেয়ে গেল মনটা।

পল্লীর মূল ফটক পেরোলেই চোখে পড়বে সবুজ ঘাসের গালিচা। হাঁটতে লাগলাম। ১৯৯৭ সালে হুমায়ূন আহমেদ গড়ে তোলেন নুহাশ পল্লী । ৪০ বিঘার এ বাগানবাড়িতে আছে আড়াই শ` প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ওষধি গাছ। প্রতিটি গাছের গায়ে সেটে দেয়া আছে পরিচিতি ফলক।

খোলা মাঠের মাঝখান ধরে হাঁটছি। একটু এগোতেই গাছের ওপর ছোট একটি ঘর। উঠতে হবে মই বেয়ে। কৌতুহলী দর্শকদের ভিড় ওখানে। সবার চোখেমুখে অব্যক্ত জিজ্ঞাসা, কী আছে ওখানে?

অল্পক্ষণ পরে শুনি এক মহিলা বলাবলি করছেন, কী দেখার আছে এখানে। এসব তো আমাদের গ্রামেও আছে।
কাকে বলি, কীভাবে বলি যে, এখানে কিছুই নেই। আছেন শুধু হুমায়ূন আহমেদ ; অদৃশ্যে যদিও।

পল্লীতে ঢুকেই হাতেরডানে হুমায়ূন আহমেদের পাথরে আঁকা প্রতিকৃতি, যেন আগত মানুষদের একমনে দেখে চলেছেন তিনি। মনে পড়লো রবীন্দ্রনাথকে : দিনের পথিক মনে রেখো আমি এসেছিলাম রাতে/ সন্ধ্যাপ্রদীপ নিয়ে হাতে।

অল্প কিছুদূর যেতেই বৃষ্টিবিলাস। এই বাড়ির খোলা আঙ্গিনায় বসে বৃষ্টি উপভোগ করতেন হুমায়ূন আহমেদ।

ভেষজ বাগানকে বামে রেখে ডানে তাকাতেই ছোট একটি পুকুর, তাতে এক মৎস্যকন্যা। আবার সামনে যাই। ডানে ডাইনোসরের ভাস্কর্য, বাঁয়ে গ্রামীণ বাড়ি। তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলা হলো।

পল্লীর শেষ প্রান্তে দীঘি লীলাবতী। সেই দীঘির একেবারে মধ্যিখানে একটি টংঘর। হুমায়ূন আহমেদ নৌকায় করে ওই টংঘরে গিয়ে একা বসে থাকতেন। কী ভাবতেন, কে জানে!

দীঘির সুন্দর ঘাটে, তার চারপাশে দর্শনার্থী একেবারে কম নয়। তারা হুমায়ূন আহমেদের হাতে গড়া নন্দনকাননে আছে, কিন্তু কারো চিন্তা-চেতনায় হুমায়ূন আহমেদ নামের অসম্ভব মেধাবী ও সৃষ্টিশীল মানুষটি আছেন বলে মনে হলো না। সবাই হাসছে, কলকল করছে, ছবি তুলছে।

nuhash-polli001

হুমায়ূন আহমেদের সমাধিস্থলে গিয়েও একই দৃশ্য। দু’জনকে দেখা গেল সেলফি তোলায় ব্যস্ত। কী অদ্ভুত এই জেনারেশন!

অবশ্য নুহাশপল্লী দেখাশোনার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত, তারা দর্শনার্থীদের কাছ থেকে মাথাপিছু দুই শ’ টাকা ফী আদায় করেই খালাস বলে মনে হলো। তারা নুহাশপল্লীকে শতভাগ ট্যুরিস্ট স্পট বানিয়ে ফেলেছে। এটা যে তার চাইতেও অনেক অনেক বেশি কিছু, কে বোঝাবে?

যদি তারা তা বুঝতো তাহলে ওখানে থাকতো হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের সংগ্রহশালা ও বিক্রয়কেন্দ্র, হুমায়ূন আহমেদ জাদুঘর, তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা ইত্যাদি অনেক কিছু।

তা না থাক, হুমায়ূন আহমেদ তো আছেন! যারা শুধুই সময় কাটাতে বা ‘নতুন কিছু’ দেখতে নুহাশপল্লী যাবেন, তারা পল্লীটি দেখে খুশি বা হতাশ – দু’টোই হতে পারেন, কিন্তু হুমায়ূনপ্রেমী মানুষ এই প্রাকৃতিক নন্দনকাননে এসে মোটেই হতাশ হবেন না, এটা নিশ্চিত বলা যায়। কেননা, এই পল্লীর ঘাসে, গাছে, মাটি ও পানিতে যে মিশে আছেন প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.