পদ্মা সেতুর স্বপ্ন পূরণ – আজ নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করছেন প্রধানমন্ত্রী

পলাশ মাহমুদ : ‘পদ্মা সেতু’ একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের গল্প। উন্নয়নে স্বয়ংসম্পূর্ণতার ‘অনন্য দৃষ্টান্ত’। বিশ্বব্যাংক ফিরে যাওয়ায় আকাশে জমা হওয়া কালো মেঘে আলোর বিচ্ছুরণ। পদ্মার আকাশে এখন মিষ্টি হাসি। নদীর দু’পাড়ে উপচে পড়া উচ্ছ্বাস। পদ্মা পাড়ের এ উচ্ছ্বাসে এবার আসছে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের কোটি মানুষের দাবি পূরণের শুভক্ষণ। বহুল প্রতীক্ষার পর আজ (শনিবার) বেলা ১২টায় পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মাধ্যমে বিজয়ের মাসেই উদ্বোধন হবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতুর নির্মাণ কাজ। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পদ্মার দু’পাড় মাওয়া ও জাজিরায় সাজ সাজ রব। ব্যানার ফেস্টুনে শোভা পাচ্ছে পুরো এলাকা। স্মারক ফলকের আশপাশে দৃষ্টিনন্দন সজ্জা। অনুষ্ঠান উপলক্ষে নেয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা। র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবির বিশেষ নিরাপত্তা চাদরে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বিশ্বব্যাংক ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো যখন পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন সেতু নির্মাণ সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পদ্মা ঢেকে যায় অন্ধকারে। তবে বাধা ভেঙে প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য নেতৃত্বে সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে নিজস্ব অর্থায়ন। যা আগে কেউ ভাবতেও পারেনি। এর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। আজ সকালে ঢাকা থেকে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি বহর মাওয়ার উদ্দেশ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে বেলা ১২টার আগে। ১২ টায় পদ্মা সেতুর মূল কাজের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। মাওয়া অংশে মূল সেতুর পাইলিংয়ের কাজ আর জাজিরায় নদীশাসন কাজের উদ্বোধন করবেন তিনি। মাওয়ায় ৭ নম্ব^র পিলারের মূল পাইলের উদ্বোধন করা হবে। এসময় ‘স্মারক ফলক’ উন্মোচন ও দোয়া অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হবে। ফলক উন্মোচনের পর মাওয়া ও জাজিরায় দু’টি জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। উভয় জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখবেন। পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় নদীর দুই পাড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য দুটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। পদ্মার জাজিরা ও মাওয়া অংশে সার্ভিস এরিয়ার ভিতর এ ঘর দু’টি নির্মাণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী সফরকালীন সেখানে বিশ্রাম নিতে পারবেন বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প’র পরিচালক (পিডি) শফিকুল ইসলাম দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুর কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। সামগ্রিক কাজের ২৬ শতাংশ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে মূল সেতুর কাজ প্রায় ১৩ শতাংশ শেষ হয়েছে। সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ আর অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে।’ পদ্মা সেতু প্রকল্প মোট ৫টি প্যাকেজে বিভক্ত। সবগুলো প্যাকেজ মিলে এ পর্যন্ত মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। যার পুরোটাই বহন করছে বাংলাদেশ সরকার। অর্থাৎ নিজস্ব অর্থায়নেই নির্মাণ হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ এ প্রকল্প। স্বাধীনতার পর নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত সবচেয়ে বড় প্রকল্প এটি। পদ্মা সেতুর নকশা থেকে জানা যায়, সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। যা হবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর সেতু। আর প্রস্থ ২১ দশমিক ১ মিটার। মূল সেতুর পিলার বসবে ৪২টি। প্রতিটি পিলার ৩শ’ ৩৯ ফুট গভীরে বসবে। স্প্যান থাকবে ১শ’ ৫০টি। ভায়াডাক্টসহ সেতুর দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৯ দশমিক ৩ কিলোমিটার। সংযোগ সড়ক মোট ১২ কিলোমিটার। এর মধ্যে মাওয়া অংশে রয়েছে ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার ও জাজিরায় ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার। সংযোগ সড়কের সাথে টোল প্লাজা, পুলিশ স্টেশন, পাওয়ার প্লান্টসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থাকবে। পদ্মা সেতু প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, মাওয়া অংশে ৭ নম্বর পিলার নির্মাণ হলেই মূল সেতুর কাঠামো দৃশ্যমান হবে। এজন্য এ পিলারটিই উদ্বোধন করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বছরের মার্চ মাস থেকেই শুরু হয় পরীক্ষামূলক পাইলিং এর কাজ। মূল সেতু নির্মানের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘চায়না মেজর ব্রীজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিঃ’। চায়না মেজর ব্রিজের অধীনে শতাধিক বিদেশী প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে। রয়েছে কয়েক হাজার দেশী শ্রমিক। ৫টি প্যাকেজের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজ সংযোগ সড়ক। পদ্মার দুই পাড়ে মাটিতে টেস্ট পাইলিংয়ের কাজ চলছে। নদীর বিভিন্ন স্থানেও চলছে পাইলিং। কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বানানো হচ্ছে বিশাল আকারের পাইপ। পাইপ দিয়ে পাইলিংয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে জার্মানির দুটি হ্যামার। প্রতিটি পাইল ৩০০ ফুট লম্বা, ব্যাস ১০ ফুট। পাইলগুলো তৈরি করা হচ্ছে ৫০ মিলিমিটার পুরো স্টিলের প্লেট দিয়ে। গত বৃহস্পতিবার সেতুর নির্মাণ এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে সড়ক বিভাগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বিজয়ের মাসে প্রধানমন্ত্রীর হাত দিয়ে নতুন একটি বিজয়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পদ্মার দু’পাড়ে এখন আনন্দের ঢেউ বইছে। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে একনজর দেখার জন্য লাখ লাখ মানুষ অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আবদুল কাদের বলেন, কাক্সিক্ষত গতিতেই এগিয়ে চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ। ইতিমধ্যে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি অর্থাৎ ২৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। মূল সেতু নির্মাণের ১৭ দশমিক ২৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। যেভাবে কাজ চলছে, তাতে ২০১৮ সালের শেষেই এ সেতুতে যান চলবে বলে আমরা আশাবাদী। এ প্রকল্পের অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজ নদী শাসন। নদী শাসনের জন্য পদ্মার দু’পাড়ে তৈরি করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক কনক্রিটের ব্লক। নদীশাসন করা হবে মোট ১৩.৬ কিলোমিটার। মাওয়া অংশে ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার, জাজিরা অংশে হবে ১২ কিলোমিটার। চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন ও বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লিমিটেড এ কাজ করছে। নদীশাসন কাজের জন্য ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্য থেকে পাথর আনা হচ্ছে। নদীশাসন হলে মাওয়া ও জাজিরার প্রায় ১৪ কিলোমিটার অংশ ভাঙন থেকে রেহাই পাবে। সেতু নির্মাণের সার্বিক তদারকির জন্য ১৩৫ জন সিএসসি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও কোরিয়া, চীন, নেপাল, নিউজিল্যান্ড থেকে তাঁদের নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমানে তাঁরা মাওয়ায় ও জাজিরা সার্ভিস এলাকায় অবস্থান করছেন। সেতুর নিরাপত্তার জন্য নির্মিত হচ্ছে মাওয়া-জাজিরা সেনানিবাস। জাজিরায় আছেন সেনাবাহিনীর ৮শ’ ও মাওয়ায় ৩শ’ কর্মকর্তা ও সদস্য। সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার তদারককারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন। সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে দেশের অর্থনীতির চাকা দ্রুত গতিতে ঘুরতে থাকবে। বিশেষ করে দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে দেশের অন্য জেলাগুলোর যাতায়াত ব্যবস্থা অনেকটা এগিয়ে যাবে। এসব জেলায় আধুনিক শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ইতিমধ্যে অনেক উদ্যোক্তা এ সেতুকে ঘিরে নানা পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন। পদ্মাসেতু প্রকল্পের জন্য সর্বমোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০০৭ সালে প্রথম ব্যয় ধরা হয় ১০ হাজার ১শ’ ৬১ কোটি টাকা। এর পর প্রথম সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২০ হাজার ৫শ’ ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। আর সর্বশেষ গত মাসে ডিপিপি’র দ্বিতীয় সংশোধনী অনুযায়ী আরো ৮ হাজার ২শ’ ৮৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে বহন করা হবে ২৭ হাজার ৪শ’ ২৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সহায়তা ১ হাজার ৩শ’ ৬৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। পদ্মাসেতু প্রকল্প নিয়ে সর্বপ্রথম ১৯৯৮-৯৯ অর্থ বছরে প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই করে সরকার। সরকারী খরচেই এ যাচাইয়ের কাজ হয়। এর পর ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে জাপান উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা)’র অর্থায়নে সম্ভাব্যতা যাচাই হয়। ২০০৯ সালে এসে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে পূর্ণাঙ্গ ডিজাইন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর পর বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে পরে দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ২০১৩ থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করে সরকার। উল্লেখ্য, দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালের ২৯ জুন আকস্মিকভাবে এ প্রকল্পে ১২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ বাতিল করে। ফলে সেতু নির্মাণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কিন্তু পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ সেতু নিয়ে আশার আলো সঞ্চার হয়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের অক্লান্ত পরিশ্রমে সেতুর মূল কাজ শুরু হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.