পপ কিংবদন্তি মাইকেল জ্যাকসন

২০০৯ সালে ২৫ জুন মাইকেল জ্যাকসন মৃত্যুবরণ করেন৷ তার মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয় তারই ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. কনরাড মারেকে এবং সে কারণে তাকে চার বছরের জন্য কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। আমরা স্মরণ করছি পপ কিংবদন্তি মাইকেল জ্যাকসনকে।

মাইকেল জ্যাকসন নিজের গান, ফ্যাশন আর পারফরমেন্সের মাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরেছেন অন্য উচ্চতায়। এখনও বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী তারকা হিসেবে ধরা হয় তাকে। তবে জনপ্রিয়তা ও সফলতার চূড়ায় থাকা অবস্থায় ২০০৯ সালের ২৫শে জুন রহস্যজনকভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই পপ লিজেন্ড। তার মৃত্যুর বিষয়টি এখনও রহস্যই রয়ে গেছে।
দিও মাইকেলের ব্যক্তিগত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ওষুধ সেবন করানোর অভিযোগের বিষয়টি এখনও বিচারাধীন। এদিকে বরাবরের মতো আজও (শনিবার) মাইকেলের জন্মদিনে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে সমবেত হয়ে দিনটি পালন করবেন। তবে বাইরের কোনও আয়োজনে তারা অংশ নেবেন না বলেই জানা গেছে। প্রতি বছরের মতো এবারও ক্যালিফোর্নিয়ার গ্লেনডেল ফরেস্ট লনে মাইকেলের সমাধিস্থলের আশপাশের জায়গা ঘিরে ফেলা হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায়। সমাধিস্থলে মাইকেল ভক্তরা শ্রদ্ধা জানাবেন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এছাড়াও মেমোরিয়াল পার্কে গোলাপ ও বিভিন্ন ধরনের ফুল দেওয়ার মাধ্যমে এই কিংবদন্তিকে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানাবেন ভক্তরা।
মাইকেল ভক্তরা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর জন্য জড়ো হবেন তার গেরি ইন্ডিয়ানার বাড়িতেও, যেখানে তার শৈশব কেটেছিল। এখানে মোম জ্বালিয়ে ও ফুলেল শুভেচ্ছার মাধ্যমে মাইকেলের প্রতি ভালবাসা জানাবেন ভক্তরা। অন্যদিকে লাস ভেগাসে সারকিউ ডু সলেইল নামের একটি সংগঠন মাইকেলের জন্মদিন বিশেষভাবে পালন করবে আজ (শনিবার) সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত। ‘মাইকেল জ্যাকসন ওয়ান’ নামক এ অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি চলছে। এখানে মাইকেলের বিভিন্ন গানের পরিবেশনা থাকবে। আরও থাকবে মাইকেলকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বেশ কয়েকটি নৃত্য।
মাইকেলের সুপারহিট নাম্বার ‘থ্রিলার’ ও ‘স্ট্রেঞ্জার ইন মসকো’ গান নিয়ে থাকবে ভিন্নধর্মী পরিবেশনা। এ অনুষ্ঠানের পারফরমারদের পোশাক ডিজাইন করেছেন মাইকেল জ্যাকসনের দীর্ঘদিনের ডিজাইনার মাইকেল বুশ। তিনি মাইকেলকে নিয়ে নিজের স্মৃতিও রোমন্থন করবেন। অনুষ্ঠানের শেষাংশে কেক কেটে মাইকেলের জন্মদিন পালন করা হবে।

মাইকেল জ্যাকসন

মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন (ইংরেজি: Michael Joseph Jackson; জন্ম: আগস্ট ২৯, ১৯৫৮– মৃত্যু: জুন ২৫, ২০০৯)[২] একজন মার্কিন সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, গান লেখক,অভিনেতা, সমাজসেবক এবং ব্যবসায়ী । পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে বহুল বিক্রিত এলবামের সঙ্গীত শিল্পীদের তিনি অন্যতম।জ্যাকসন পরিবারের ৭ম সন্তান মাইকেল মাত্র ৫ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালে পেশাদার সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি তখন জ্যাকসন ফাইভ নামের সঙ্গীত গোষ্ঠীর সদস্য হিসাবে গান গাইতেন। ১৯৭১ সাল থেকে মাইকেল একক শিল্পী হিসাবে গান গাইতে শুরু করেন। মাইকেলের গাওয়া ৫টি সঙ্গীত অ্যালবাম বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত রেকর্ডের মধ্যে রয়েছে – অফ দ্য ওয়াল (১৯৭৯),থ্রিলার (১৯৮২),ব্যাড (১৯৮৭), ডেঞ্জারাস (১৯৯১) এবং হিস্টরি (১৯৯৫)। তাকে পপ সঙ্গীতের রাজা (King of Pop) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় অথবা, সংক্ষেপে তাঁকে এমজে(Mj) নামে অভিহিত করা হয়।[৩] সঙ্গীত, নৃত্য এবং ফ্যাশন জগতসহ ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে চার দশকেরও অধিককাল ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বৈশ্বিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন।

১৯৮০র দশকে মাইকেল সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছান। তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সঙ্গীতশিল্পী যিনি এমটিভিতে এতো জনপ্রিয়তা পান। বলা হয়, তাঁর গাওয়া গানের ভিডিওর মাধ্যমেই এমটিভির প্রসার ঘটেছিলো। গানের তালে তালে মাইকেলের নাচের কৌশলগুলোও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মাইকেলের জনপ্রিয় নাচের মধ্যে রোবোট, ও মুনওয়াক (চাঁদে হাঁটা) রয়েছে। মুনওয়াক আসলে হলো সামনের দিকে হাঁটার দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টি করে পিছনে যাবার ভঙ্গিমা। তিনি পপ সংগীত এবং মিউজিক ভিডিওর ধারণা পাল্টে দেন।এখন সারাবিশ্বের সকল নৃত্যশিল্পীরা মাইকেল জ্যাকসনকে প্রায়ই শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকেন।

মাইকেল জ্যাকসন দু’বার রক অ্যান্ড রোল হল অফ ফেইমে নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনিই এই পৃথিবির একমাত্র ব্যাক্তি যিনি গান লেখক,নাচের (সর্বপ্রথম এবং একমাত্র),”আর এন বি” হল অফ ফেইমে যায়গা করে নিয়েছেন। সংগিৎ জগতের কেউ এত ক্যাটাগরিতে হল অফ ফেইমে নিজেকে নিতে পারেন নি। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুসারে মাইকেল সর্বকালের সবচেয়ে সফল শিল্পী – ১৩টি গ্র্যামি পুরস্কার, ১৩টি ১নম্বর একক সঙ্গীত, এবং ১০০ (১ বিলিয়ন) কোটিরও বেশি মাইকেলের অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে যা এবং হচ্ছে।

“থ্রিলার”(১৮৮২) আজ পর্যন্ত ১১০ মিলিয়নের উপর বিক্রি হয়েছে যা সর্বোচ্চ বিক্রিত হওয়া এলবাম।”ব্যাড” (১৯৮২) যেটাতে আছে বিলবোর্ড চার্টে ১ নম্বর হওয়া ৫ টি গান যা সর্বোচ্চ এবং মাইকেল জ্যাকসনের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত এলবামের তালিকায় ২য় এবং ৬৭ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়।”ডেঞ্জারাস”(১৯৯১) যার মাধ্যমে মাইকেল “নিউ জ্যাক সুইং” নামে নতুন একটা জেনার কে পপুলার করে,এবং এটি সবচেয়ে বেশি বিক্রিত হওয়া নিউ জ্যাক সুইং এলাবাম,যার পরিমাণ ৩৬ মিলিয়ন কপি।”হিস্টোরি”(১৯৯৫) মাইকেলের নবম স্টুডিও এলবাম এবং এই পর্যন্ত ৩৩ মিলিয়ন(৬৬ মিলিয়ন ইউনিট), যা হচ্ছে এই পর্যন্ত ২ টি ডিস্ক সমন্বিত একটি এলবাম এর সবচেয়ে বেশি বিক্রিত এলবাম।হিস্টোরি একটি বহুল আলোচিত প্রতিবাদি এলবাম।তার ২ বছর পর ১৯৯৭ সালে তিনি রিলিজ করেন তার সর্বপ্রথম রিমিক্স এলবাম “ব্লাড অন দা ডান্স ফ্লোর:হিস্টোরি ইন দা মিক্স” যা এই পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিক্রিত হওয়া রিমিক্স এলবাম(৬ মিলিয়ন কপি)।২০০১ সালে মাইকেল রিলিজ করে “ইনভিন্সিবল”, তার জিবনের ১০ম ও সর্বশেষ স্টুডিও এলবাম।এটি থ্রিলার এর থেকেও তাড়াতাড়ি বিক্রি হচ্ছিল,কিন্তু “সনি মিউজিক ” এর সাথে ঝামেলার কারনে তারা এই এলবামটি প্রোমোট করে না,তার পরেও এটি ১৩ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়।এটি এই পর্যন্ত সবচেয়ে ব্যায়বহুল এলবাম, এই এলবাম এর শুধুমাত্র রেকর্ডিং এই মাইকেল খরচ করে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উপর।২০১০ সালে বিলবোর্ড কর্তৃক একটি পোলে এই এলবামটি ২০০০-২০১০ সালের মধ্যে রিলিজ পাওয়া এলবাম এর সেরা এলবাম নির্বাচিত হয়।জ্যাকসন হচ্ছে এই পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি এওয়ার্ড ও নোমিনেশন পাওয়া তারকা।

এছাড়াও গিনেস বুক অফ ওয়ার্লড তাকে বিশ্বরেকর্ড এ ভুষিত করেছে বিনোদন জগতের মানুষ হিসেবে সবচেয়ে বেশি দান খয়রাত করবার জন্যে, এবং তার দানকৃত অর্থের পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এর বেশি।ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নানা কেলেঙ্কারিতে(যা পরবর্তিতে প্রত্যেকটি ভুল প্রমাণিত হয়) জড়ালেও প্রায় ৪০ বছর ধরে সারাবিশ্বে বিখ্যাত হয়ে ছিলেন এবং তিনি পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গায়ক এবং নৃত্যশীল্পির সিংহানে বসে আছেন।

Michael Jackson1
মৃত্যু

তিনি ২০০৮ সালের ২২ নভেম্বর ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন বলে এক সোর্স জানায় যা সর্বপ্রথম “The Sun” পাবলিশ করে।মাইকেল এই ব্যাপার নিয়ে কোন কিছু পরিষ্কার করে বলেন নি।কিন্তু এ নিয়ে অনেক বিতর্ক দেখা দেয়।অবশ্য সে তার ভাই জারমাইন জ্যাকসন(যিনি অনেক আগে মুসলিম হয়েছেন) এর সাহায্যে ইসলামিক অনেক বই পড়েছেন।

২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে জুন মাইকেল জ্যাকসন মৃত্যুবরণ করেন।তার মৃত্যুতে সারা পৃথিবিতে আলোড়ন পরে যায়।TMZ যখন তাদের ওয়েবসাইটে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে তারপর তা সবজায়গায় খুবই দ্রত ছড়িয়ে পড়ে। তার মৃত্যুর ফলে পৃথিবির ইন্টারনেট ব্যাবস্থা এক প্রকার ভেঙে পড়ে।তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পৃথিবির সকল অঞ্চল থেকে তার ভক্ত ও সাধারণ মানুষ Google এ সার্চ করা শুরু করে। “Michael Jackson ” শব্দটি এত বেশি(মিলিয়ন মিলিয়ন) ইনপুট হবার কারনে তারা ভেবেই বসে DDoS Virus এ তাদের সার্চ ইঞ্জিন আক্রান্ত হয়েছে যার ফলে তারা প্রায় ৩০ মিনিট Google বন্ধ রাখে।Wikipedia তে ১ ঘন্টার মধ্যে ১২ লাখেরও বেশি মানুষ মাইকেলের বায়োগ্রাফি দেখে,আর এই চাপ Wikipedia লোড নিতে সক্ষম না হওয়াতে Crash করে(পরে কর্তৃপক্ষ জানায় তাদের ইতিহাসে এরকম ঘটনা এই প্রথম),একিরকম ভাবে Twitter-ও Crash হয়,যেখানে মোট টুইটের ১৫ % মেনশন করা হচ্ছিল মাইকেল (প্রতি মিনিটে ৫০০০+ টুইট)।এছাড়াও বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে,ইন্টারনেটে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারন ইন্টারনেট ট্রাফিকের ১১% হতে তা ২০% এ উন্নিত হয়। MTV ২৪ ঘন্টা ধরে তার মিউজিক ভিডিও, ডকুমেন্টারি, ভক্ত,ফ্যামিলি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেয়।তার শেষ কৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠান পৃথিবির ৩০০ কোটিরও বেশি মানুষ সরাসরি টেলিভিশন ও অনলাইনে দেখে,যা এই পর্যন্ত সর্বোচ্চ কারো কৃত্যানুষ্ঠান দেখা হয়েছে।দায়িত্বে খামখেয়ালি করার কারণে তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী মার্কিন চিকিৎসক ডঃ কনরাড মারেকে ৪ বছরের জন্য কারাবাস সাজা দেয়া হয়েছিল।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.