পৃথিবীর বাহিরে কি প্রান আছে?

পৃথিবীর বাহিরে কি প্রান আছে? এই প্রশ্নটি মনুষ্যজাতির আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে পদার্পণের শুরু থেকে ! কেউ জানে না যে প্রায় অসীম এই মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রান আছে কিনা । তবে সম্ভাবনা বলছে ভিন্ন কথা , মহাবিশ্বে প্রান দুর্লভ হলেও তা হয়ত ছড়িয়ে আছে ছায়াপথ থেকে ছায়াপথে ! বিশাল এই বিশ্বব্রম্মানডে তো টেলিস্কোপ দিয়ে আমাদের সীমিত প্রযুক্তির সাহায্যে সরাসরি সর্বত্র প্রাণের খোঁজ করা সম্ভব নয় । তাই জ্যোতির্বিদেরা বিগত পঞ্চাশ বছর যাবত রেডিও তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যাবহার করে আধুনিক এলিয়েন সভ্যতার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছে । তারা যদি যথেষ্ট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত হয় তাহলে পৃথিবী থেকে পাঠানো রেডিও তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বাইনারি তথ্য ডিকোড করে আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারবে, পাশাপাশি নিজেদের অস্তিত্বও হয়ত আমাদেরকে জানাতে পারে ।

গেল অক্টোবর মাসে আমাদের প্রতিবেশী এক নক্ষত্র ব্যাবস্থাইয় এমন রেডিও তরঙ্গ প্রেরন করা হয়েছে । GJ 273 বা লূইটেন স্টার নামক এই তারকা পৃথিবী থেকে ১২.৩৬ আলোকবর্ষ দূরে শূণী নক্ষত্রমন্ডল বা constelaation এ অবস্থিত একটি লাল বামন তারকা । সূর্যের ভরের একচতুর্থাংশ ভর ও সূর্যের ব্যাসার্ধের ৩৫ শতাংশ ব্যাসার্ধের এই নক্ষত্রের দুইটি গ্রহ আবিষ্কৃত হয় এই বছরের মার্চ মাসে । এদের মধ্যে প্রথম গ্রহটি প্রাণ ধারনের জন্য একদম আদর্শ । Luyten b বা GJ 273b নামের এই গ্রহটির ভর পৃথিবীর ভরের ২.৯ গুন ! এটি এর নক্ষত্রের এতটা নিকটে অবস্থিত যে মাত্র ১৮.৬ দিনে একবার প্রদক্ষিন করে । তবে এত নিকটে অবস্থিত হলে নক্ষত্রটির স্বল্প আলো ও তাপের জন্য গ্রহটির গর তাপমাত্রা -১৪ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মত । আর তাই এখানে স্বল্প পরিমান হলেও তরল পানি থাকার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে ।তাই, বিজ্ঞানীদের মতে প্রান খোঁজার জন্য এই গ্রহ আদর্শ ! লূইটেনের তারার পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ৩৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস !

SETI বা Search for Extra-Terrestrial Intelligence এর মত বহির্জাগতিক প্রান অনুসন্ধানকারী সংস্থার ইউরোপীয় ভার্সন .Messaging Extraterrestrial Intelligence (METI) International এই হ্যাবিটেবল জোনে অবস্থিত গ্রহটিতে রেডিও সিগন্যালটি পাঠিয়েছে ! নরওয়েতে অবস্থিত European Incoherent Scatter Scientific Association (EISCAT) রেডিও অ্যান্টেনা ব্যাবহার করে অক্টোবরের ১৬ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত প্রত্যেকদিন টানা ৮ ঘণ্টা জুড়ে সিগন্যালটি প্রেরন করা হয় । তবে অন্যান্য প্রান ধারনের সম্ভাবনাপূর্ণ আর গ্রহ থাকলেও GJ 273b তে সিগন্যাল প্রেরনের কারন হল এর স্বল্প দূরত্ব । যদি এলিয়েন সভ্যতা থেকেও থাকে তাহলে তারা ফিরতি বার্তা যদি পাঠায় , তাহলে ২৫ বছরের মধ্যেই তাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হব ।

স্পেনের ক্যাতালোনিয়াভিত্তিক এই মেটি ইন্টারন্যাশনাল বাইনারি কোডে গাণিতিক তথ্য ও বাদ্যদল Sónar community এর ৩০ টি সঙ্গীত পাঠানো হয়েছে গ্রহটির উদ্দেশে !! সংখ্যা গননা, পাটিগণিতের সাধারন যোগ-বিয়োগ, জ্যামিতির প্রাথমিক ধারনা, ত্রিকোণমিতির মৌলিক কিছু বিষয় এবং রেডিও তরঙ্গ বিস্তারিত কিছু তথ্য পাঠানো হয়েছে । তারা যথেষ্ট উন্নত হলে এই তরঙ্গ ডিকোড করে বুঝতে পারবে যে তা উন্নত কোন সভ্যতা পাঠিয়েছে । এই বার্তাটি পাঠানো হয়েছে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া প্রথম রেডিও বার্তা “আরেকিবোর” বর্ষপূর্তি অনুযায়ী ! পুয়ের্তো রিকোর Arecibo radio telescope ব্যাবহার করে ১৯৭৪ সালে প্রথম রেডিও বার্তা পাঠানো হয় নিকটস্থ তারকাস্তবক M13 এর উদ্দেশে । আরেকিবো বার্তায় ভোরে দেওয়া হয়েছিল সৌরজগত , এর গ্রহ ব্যাবস্থা , পৃথিবীর কিছু তথ্য , মানুষের কিছু সচল কার্টুন যা দেখলে মানুষ দেখতে কেমন তা সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যাবে , এমনকি ডিএনএ স্ট্রাকচার ও প্রিয়তমার সাথে চুম্বন চিত্রও !

বার্কলির ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও সেটির গবেষক ড্যান রেথিমার বলেন, ” সেটিসহ মেটি ও অন্যান্য বহির্জাগতিক প্রান সন্ধানকারী সংস্থার এই কার্যকলাপ পৃথিবীর জন্য হুমকিস্বরূপ । আমরা জানি না তারা দেখতে কেমন, তারা কতটা উন্নত, তাদের উদ্দেশ্য ও চাহিদা কি । আমাদের এই প্রচেষ্টা অনেকটা বনে প্রবেশের সময় চিৎকার করে বাঘ, ভালুকদের আমাদের উপস্থিতি জানানো । আর এমন হলে কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কারের মত হুবহু ঘটনা ঘটবে । নেটিভ ইন্ডিয়ানদের যেমন ধরে ধরে মেরে তাদেরকে উচ্ছেদ করা হয়েছে ঠিক তেমনি এলিয়েনরাও হয়ত এমন কিছু করতে পারে ।”

জিনিয়াস স্টিফেন হকিংও এ ব্যাপারে বারবার সতর্ক করছেন । তার মতে “আমরা মহাবিশ্বের রহস্য উদ্ঘাটন বা মিশন পরিচালনা করতে পারি । কিন্তু তাই বলে এই নয় যে বাঘের মুখে গিয়ে পড়তে হবে । আর আধিপত্য বিস্তারের জন্য এলিয়েনরা যে হিংস্র হবেনা তার নিসচয়তা নেই ! ” তবে অনেকের মতে , হয়ত এলিয়েনরা আমাদের মত হিংসুটে না , আমরা যেমন নিজের স্বার্থের জন্য নিজের স্বত্বাকে বিসর্জন দিতে ভুলিনা , নিজের পরিবার বা জাতির সাথে বেইমানি করি , এলিয়েনরা হয়ত এমন না । হয়ত তারা শুধু শাশ্বত মানবতার বানী নিয়ে আসবে। তাদের প্রযুক্তি থেকে সাহায্য নিয়ে আমাদের জীবন যাত্রার মান আর উন্নত হতে পারে !! তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি । কারন আমাদের আছে এমন এক সম্পদ যা মহাবিশ্বে খুব দুর্লভ । তা হল তরল পানি , তাই আমরা যদি কখনো এলিয়েন সভ্যতার দ্বারা আক্রান্তও হই তবে তার কারন হবে এই জীবন রক্ষাকারী পানি । অনেকে আবার মনে করেন এলিয়েনরা হয়ত অনেকে আগে থেকেই আমাদের নজরে রেখেছে । হয়ত এলিয়েন কাউন্সিলও আছে , তবে আমরা বিধ্বংসী পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন ও হিংস্র মন মানসিকতার বিধায় তারা ইচ্ছে করেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করে না !

তথ্যঃ জ্যোতির্বিদ্যা ও সৃষ্টিতত্ত্ব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.