“বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে জানো”র প্রকাশনা অনুষ্ঠান

গত ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় জাতীয় জাদুঘর এর সিনেপ্লেক্স মিলনায়তনে আ.ফ.ম.মোদাচ্ছের আলীর শিশুকিশোরদের জন্য লেখা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে লেখা প্রথম বই “বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে জানো”র প্রকাশনা অনুষ্ঠান হলো, সভাপতির আসন গ্রহন করেন শিশুসাহিত্যিক, দ্রোহের কবি আসলাম সানী।
আ.ফ.ম. মোদাচ্ছের আলী একজন খ্যাতিমান ছড়াকার শিশুসাহিত্যিক। শিশু কিশোরদের দেশ প্রেমে উজ্জিবীত করতেই তাঁর লেখনি। তাঁর লেখার ধরনটাই ভিন্নধারার বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে জানো’’ বইটি আ.ফ.ম. মোদাচ্ছের আলীর লেখা বাংলা একাডেমির মহান একুশের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে শিশু কিশোরদের নিয়ে লেখা এটিই প্রথম বই। প্রকাশ করেছে দাঁড়িকমা প্রকাশনী।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে জানো
আ ফ ম. মোদাচ্ছের আলী

কত অজানারে জানাইলে তুমি
কত ঘরে দিলে ঠাঁই
দূরকে করিলে নিকট বন্ধু
পরকে করিলে ভাই।’
কবি এই পংক্তিগুলো রচনা করেছিলেন আমার মনে হয় দূর ভবিষ্যৎ এর বিজ্ঞান-এর জয়যাত্রাকে মানসলোকে ধারণ করে। আজ তোমরা নিজেরাই বুঝতে পারছো বর্তমান পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। তোমার ঋধপবনড়ড়শ, ডযধঃং ধঢ়ঢ় আরো কত কিছু জানো। বিশ্বের যে প্রান্তেই ফুটবল, ক্রিকেট বা অন্যান্য খেলাধুলা হোকনা কেন ঘরে বসে দেখতে পাচ্ছো। এ অবদান বিজ্ঞানের এই অবদান স্যাটেলাইটের।
এবার বলি স্যাটেলাইট কি? স্যাটেলাইট হচ্ছে মানুষের তৈরি উপগ্রহ যা অন্য বস’কে কেন্দ্র করে তার চারদিকে সুনির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরে। কক্ষপথ হচ্ছে নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তি সুনির্দিষ্ট পথ, যেখানে বস’টি ঘূর্ণায়মান থাকে। উদাহরণস্বরূপ, চাঁদ পৃথিবীর প্রাকৃতিক উপগ্রহ। কিন’ বর্তমানে যে স্যাটেলাইটের কথা বলা হচ্ছে তা হলো কৃতিম অর্থাৎ মানুষের তৈরি স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ।
স্যাটেলাইট তৈরি করা হয় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার জন্য। একটি বিশাল জায়গা বা দূরত্ব দেখার জন্য যেমন আমাদের উঁচু ভবন বা টাওয়ারে উঠতে হয় তেমনি প্রায় ৫০০ কিলোমিটার উচ্চতায় পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে থাকা স্যাটেলাইটের ঋড়ড়ঃঢ়ৎরহঃ বা পদক্ষেপ নামে পরিচিত।
যদি বিজ্ঞানীরা বিশাল এলাকার ফসল বা মহাসাগরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে চাইতেন, তাহলে নির্মাণের মাধ্যমেই পারতেন, কিন’ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অনেক তথ্য দ্রুততার সাথে ধারণ করা যায়। বর্তমানে প্রায় ১১০০টি কর্মক্ষম কৃত্রিম বা মানুষের তৈরি স্যাটেলাইট পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট হবে ১১০১।
২৪টি স্যাটেলাইটের একটি গ্রুপ তৈরি করে এষড়নধষ চড়ংরঃরড়হরহম ংুংঃবস যাকে আমরা বলি এচঝ। যদি কারো কাছে এচঝ রিসিভার থাকে, তাহলে এই স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীতে তার প্রকৃত অবস’ান সহজেই বলে দিতে পারবে। স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে ভিন্ন উচ্চতায়, ভিন্ন গতিতে ও ভিন্ন পথে। এর দুটি প্রধান কক্ষপথ হলো জিওস্টেশনারি ও পোলার। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ তৈরির বিশাল কর্মযজ্ঞটি চলছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)’র অধীনে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ ও তৈরি করে উৎক্ষেপণ করা হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর অবকাঠামো তৈরির কাজটি করেছে ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস নামের একটি মহাকাশ সংস’া। ২০১৮ সালের মার্চ অর্থাৎ আমাদের স্বাধীনতার মাসে এটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে।
তিনটি ধাপে এর নির্মাণ কাজ হয়েছে। এগুলো হলো স্যাটেলাইটের মূল কাঠামো তৈরি, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি। এর মধ্যেই স্যাটেলাইট তৈরির কাজটি শেষ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক মহাকাশ গবেষণা সংস’া স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন-৯’ রকেটে করে স্যাটেলাইটটি মহাকাশে পাঠানো হবে। স্যাটেলাইট ওড়ানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। এজন্য গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন (ভুমি থেকে নিয়ন্ত্রণব্যবস’া) তৈরির কাজ চলছে।
তোমাদের জেনে রাখা দরকার বাংলাদেশের ইন্টারনেটের জন্য সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড থেকে এবং ক্যাবল টিভির জন্য ভারত থেকে হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করে স্যাটেলাইট ভাড়া নিয়ে বর্তমানে আমরা চলছি। কিন’ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কর্যক্রম শুরু করলে এক দিকে দেশের আর্থিক সাশ্রয় হবে অন্যদিকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হবে। তাছাড়া প্রতিমাসে আমরা ৩০০/৪০০ টাকা করে ক্যাবল টিভি দেখার জন্য যে ভাড়া দেই তা কমে ১ বছরে দিতে হবে ৭০০/৮০০ টাকা।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের জন্য অরবিটাল স্পট বা নিরক্ষরেখা (১১৯-১ ডিগ্রি) ইজারা নেয় বাংলাদেশ। এই বিষয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হচ্ছে। আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ট্রান্সপন্ডার থাকবে মোট ৪০টি যার ২০টি থাকবে দেশের ব্যবহারের জন্য বাকি ২০টি থাকবে বিদেশি কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়ার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য। যদিও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করবে বিদেশি প্রতিষ্ঠান কিন’ এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই।
দৈনন্দিন জীবন যাপনে স্যাটেলাইট
এই বিশ্বায়নের যুগে পুরো পৃথিবীকে একিভূত করতে যেটি অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে সেটি স্যাটেলাইট। এই যুগে আমরা সকাল থেকে রাত অবধি কোন না কোন ডিভাইসের উপর নির্ভরশীল। আর ডিভাইসগুলো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পুরো পৃথিবীর খবর জানতে পারছি নিমেষেই। টেলিভিশনের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া সংবাদ। আজকে আমদের মুঠোর মধ্যে রয়েছে হোয়াইটসএপ, ভাইবার, টুইটার যেগুলোর উপর বলতে গেলে ডিজিটাল বাংলাদেশে আমরা নির্ভরশীল। আমরা প্রাত্যহিক কাজে ব্যাংকের যে এটিএম কার্ড ব্যবহার করি, গুগলে ঢুকে যা ইচ্ছে জানতে পারি, ব্রডব্যান্ডের ব্যবহার করি এগুলো ওয়েবসাইটে পরীক্ষার রেজাল্ট নিমিষেই পেয়ে যাই সেটিও স্যাটেলাইটের অবদান। মোদ্দা কথা আমরা স্যাটেলাইটের ফসল ভোগ করছি অন্য দেশকে অর্থ পরিশোধ করে, আর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালু হলে অর্থ পরিশোধ করা তো লাগবেই না বরঞ্চ কমমূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা আমাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটিয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করতে পারবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.