বাংলাদেশের বিজয়: রঙিন হলো শততম টেস্ট

রঙিন হলো শততম টেস্ট, ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকলো বাংলাদেশের শততম টেস্ট ম্যাচ। শ্রীলংকাকে ৪ উইকেটে হারালো বাংলাদেশ।  শততম টেস্টে জয় উপহার দেয়ার জন্য অভিনন্দন মুশফিক বাহিনী, অভিনন্দন টিম টাইগার।

১৯১ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ২২ রানে পর পর দুই বলে দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে টাইগাররা। তবে তামিম ইকবাল ও সাব্বির রহামানের ব্যাটে প্রতিরোধ গড়ে বাংলাদেশ। দলীয় ১৩১ রানে ব্যক্তিগত ৮২ রান করে পেরেরার বলে চান্দিমলের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন। ১২৫ বলে ৭টি চার ও ১টি ছয়ের সাহায্যে এই রান করেন। তামিম ফেরার পর দ্রুতেই তার পথ অনুসরণ করেন সাব্বির রহমান। ব্যক্তিগত ৪১ রান করে পেরেরার বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়েন।

কলম্বো টেস্টের পঞ্চম দিনে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৩১৯ রানে অলআউট হয়েছে শ্রীলঙ্কা। ফলে জয়ের জন্য বাংলাদেশর টার্গেট দাঁড়ায় ১৯১ রানে।

সিরিজের প্রথম ম্যাচে হারের পর টাইগার অধিনায়ক মুশফিক জানিয়েছিলেন শততম টেস্টে জয়ের জন্যই মাঠে নামবে বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে খুব ভালোভাবেই ম্যাচে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখে টাইগাররা।

জয় দিয়ে শততম টেস্ট রাঙিয়ে দিতে শেষ দিনে মাঠে নামে মুশফিকবাহিনী। চতুর্থ দিন শেষে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৮ উইকেটে ২৬৮ রান কর শ্রীলঙ্কা পঞ্চম দিনের প্রথম সেশনে বাকি দুই উইকেট হারিয়ে আরও ৫১ রান যোগ করে। ফলে জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯১ রানের।

এর আগে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের থেকে ১২৯ রানে পিছিয়ে থেকে তৃতীয় দিন শেষে বিনা উইকেটে ৫৪ রান তুলেছিল শ্রীলঙ্কা। দুই ওপেনার দিমুত করুণারত্নে ও উপুল থারাঙ্গা ২৫ রান করে অপরাজিত ছিলেন।

চতুর্থ দিনের শুরুতেই শ্রীলঙ্কার উদ্বোধনী জুটিতে ভাঙ্গন ধরান অফ-স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ। ২৬ রানে থাকা উপুল থারাঙ্গাকে শিকার করেন তিনি। এরপর দ্বিতীয় উইকেটে ৮৬ রানের জুটি গড়েন করুণারত্নে ও কুশাল মেন্ডিস। এতে লিড পায় শ্রীলঙ্কা। মেন্ডিসকে ৩৬ রানের বেশি করতে দেননি পেসার মোস্তাফিজুর রহমান।

মেন্ডিসের বিদায়ে ক্রিজে করুণারত্নের সঙ্গী হন প্রথম ইনিংসে ১৩৮ রান করা দিনেশ চান্দিমাল। কিন্তু এই ইনিংসে ব্যর্থ তিনি। মাত্র ৫ রান করে ফিজের দ্বিতীয় শিকার হন চান্দিমাল। চান্দিমাল ফিরে যাবার ১ রানের ব্যবধানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় শ্রীলঙ্কা। অ্যাসলে গুনারত্নকে ৭ রানে সাকিব ও ধনানঞ্জয়া ডি সিলভাকে শূন্য রানে ফিরিয়ে দেন ফিজ। এতে ৫ উইকেটে ১৭৭ রানে পরিণত হয় শ্রীলঙ্কা।

এই বিপর্যয়ের মাঝেও করুণারত্নের সেঞ্চুরিতে আনন্দ করার উপলক্ষ পায় শ্রীলঙ্কা। তবে দলীয় ১৯০ রানে নিরোশান ডিকবেলাকে ব্যক্তিগত ৫ রানে শিকার করে বাংলাদেশকে আনন্দে ভাসান সাকিব।

দিনের শেষভাগে বাংলাদেশ বোলারদের হঠাৎ জেগে ওঠায় শ্রীলঙ্কার ইনিংস গুটিয়ে যাওয়ায় শঙ্কায় পড়ে। কিন্তু লঙ্কানদের ভরসার প্রতীক হিসেবে ক্রিজে টিকে ছিলেন করুণারত্নে। সেই ভরসাকেও পরবর্তীতে ফিরিয়ে দিয়েছেন সাকিব। দলীয় ২১৭ রানে করুণারত্নের বিদায় নিশ্চিত করেন সাকিব। ১০টি চার ও ১টি ছক্কায় ২৪৪ বলে ১২৬ রান করেন টেস্ট ক্যারিয়ারের পঞ্চম সেঞ্চুরি পাওয়া করুণারত্নে।

এরপর তাইজুল ইসলামের হাত ধরে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক রঙ্গনা হেরাথের উইকেটও শিকার করে বাংলাদেশ। তবে দিলরুয়ান পেরেরা ও সুরাঙ্গা লাকমালের রক্ষণশীল ব্যাটিংয়ে পরবর্তীতে আর কোনো উইকেট হারায়নি শ্রীলঙ্কা। পেরেরা ২৬ ও লাকমল ১৬ রানে অপরাজিত আছেন।

পঞ্চম দিনে পেরেরা অর্ধশত তুলে রান আউটের শিকার হন। বেশিদূর যেতে পারেননি লকমলও। ৩১৮ রানে পেরেরা আউট হওয়ার পাম মাত্র ১ রান যোগ করে তিনিও সাজঘরে ফেরেন। এতে শ্রীলঙ্কা ৩১৮ রানে অলআউট হয়। ফলে বাংলাদেশের টার্গেট দাঁড়ায় ১৯১ রানে। বাংলাদেশের সাকিব ৪টি ও মোস্তাফিজ ৩টি করে উইকেট নিয়েছেন।

এর আগে টস জিতে আগে ব্যাট করে দীনেশ চান্দিমলের ১৩৭ রানের ইনিংসের ওপর ভর করে শ্রীলঙ্কা প্রথম ইনিংসে ৩৩৮ রান করে। এছাড়া ডিকওয়েলা ৩৪, সিলভা ৩৪ ও লাকমলের ব্যাট থেকে আসে ৩৫ রান।

জবাবে বাংলাদেশ দ্বিতীয় দিন ৫ উইকেট হারালেও তৃতীয় দিন টাইগাররা আড়াই সেশনের মতো খেলে নিজেদের বাকি উইকেটগুলো হারিয়ে ৪৬৭ রান তোলে। ফলে শ্রীলঙ্কার থেকে প্রথম ইনিংসে ১২৯ রানে এগিয়ে থাকে টাইগাররা। দলের শততম টেস্টে অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ১১৬ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন। অভিষিক্ত মোসাদ্দেক হোসেন করেন ৭৫ রান। এছাড়া মুশফিক ৫২, তামিম ৪৯, সৌম্য সরকার ৬১, সাব্বির ৪২, ইমরুল ৩৪ রান করেন।

 

ঐতিহাসিক টেস্টে যেভাবে হলো টাইগারদের শ্বাসরুদ্ধকর জয়

২০১৭ মার্চ ১৯ ১৬:১৬:৪৭

Musfiq victory

শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায় কেটেছে বিগত কয়েকটি ঘণ্টা! কে বলবে এটা একটি টেস্ট ম্যাচ! ভাগ্য দুলে উঠছিল বারবার! উত্তেজনা আর আশঙ্কায় কেটেছে প্রতিটি প্রহর! দর্শকদের হার্টবিট বাড়িয়ে দিয়ে সবকিছুর শেষ হলো বিজয়ে! আর কোনো শঙ্কা নেই, অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে পারফর্মেন্সের কাঁটাছেড়া।

সকল বিভেদ ভুলে; সকল সমস্যা কিছু সময়ের জন্য হলেও ভুলে গিয়ে বাঙালী আজ মেতে উঠুক ক্রিকেট উৎসবে। ক্রিকেট বিশ্ব আজ চেয়ে দেখুক কলম্বোর পি সারা ওভালে কী অসাধারণ ইতিহাস রচনা করল টিম টাইগার! দেশের ক্রিকেটের ঐতিহাসিক শততম টেস্টের মাইলফলকে দাঁড়িয়ে অবিস্মরণীয় জয় তুলে নিল মুশফিক বাহিনী! অসাধারণ; অবিশ্বাস্য; লড়াকু- আর কীভাবে ৫ উইকেটের এই জয়কে ব্যাখ্যা করা যায়? ব্যাখ্যার অবকাশ নেই; কারণ এখন সময় বিজয়োল্লাসের!

পঞ্চম দিন প্রথম সেশনে টাইগারদের লক্ষ্য দাঁড়িয়েছিল ১৯১ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে ২২ রানেই দুই উইকেট হারানোর চাপকে পাত্তাই দিলেন না তামিম-সাব্বির। লঙ্কান অধিনায়ক পরপর দুই আঘাত হেনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন। তার দুই বলে ফিরে যান দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সৌম্য সরকার (১০) এবং ইমরুল কায়েস (০)। হেরাথের বলে তুলে মারতে গিয়ে লং অফে উপুল থারাঙ্গাকে ক্যাচ দেন সৌম্য। হেরাথের পরের বলটি ডিফেন্ড করতে চেয়েছিলেন ইমরুল কায়েস। কিন্তু ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপে গুণারত্নের তালুবন্দী হলেন তিনি। নির্ভরযোগ্য এই দুই ব্যাটসম্যানের বিদায়ের পর শঙ্কা জাগে বাংলাদেশ শিবিরে। কিন্তু এরপরই শুরু হয় আসল খেলা! দারুণ ব্যাটিং করে সব শঙ্কাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন তামিম ইকবাল এবং প্রথম টেস্টে বাদ পড়া সাব্বির রহমান।

তৃতীয় উইকেটে এই দুজন ১০৯ রানের জুটি গড়েন। জন্মদিনের একদিন আগে ক্যারিয়ারের ৪৯তম টেস্টে ৮৭ বলে ২২তম হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন তামিম ইকবাল। ঐতিহাসিক টেস্টেই তিনি পেতে পারতেন ক্যারিয়ারের নবম সেঞ্চুরি। কিন্তু হঠাৎ কী হলো তার; দিলরুয়ান পেরেরার বলে তুলে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিলেন। মিড অনে দাঁড়িয়ে বলটি দারুণভাবে তালুবন্দী করলেন দিনেশ চান্দিমাল। ড্রেসিংরুমের বারান্দা থেকে কোচ হাথুরুসিংহের বিরক্তি দেখা গেল স্পষ্ট! এমন সময়, জয়ের এত কাছাকাছি গিয়ে কী দরকার ছিল এমন একটা শট খেলার? পাগালমি করতে গিয়ে ১২৫ বলে ৭ চার এবং ১ ছক্কায় ৮২ রানের ইনিংসটি শেষ হলো তামিমের। অপর প্রান্তে দারুণ ব্যাট করতে থাকা সাব্বির রহমানের সঙ্গী হন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। জুটিতে ১২ রান আসতে না আসতেই আবারও ছন্দপতন! ৭৬ বলে ৫ বাউন্ডারিতে ৪১ রান করে পেরেরার দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন সাব্বির রহমান। এলবিডাব্লিউয়ের আবেদনে প্রথমে সাড়া দেননি আম্পায়ার।

কিন্তু শ্রীলঙ্কা রিভিউ নিলে সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়। সাকিবের সঙ্গী হন অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। একসময় মনে হচ্ছিল এই দুজনই ম্যাচ শেষ করে ফিরবেন। কিন্তু মহান অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেট নাটকীয়তা উপহার দিতে পছন্দ করে। ৫ম উইকেটে মুশফিকের সঙ্গে ১৯ রানের জুটি গড়ে ফিরলেন সাকিব আল হাসান (১৫)। তার উইকেটের পাশে লেখা থাকবে ‘বোল্ড আউট’; কিন্তু আসলে সেই আউটটি ছিল দুর্ভাগ্য। নিশ্চিত হওয়ার জন্য থার্ড আম্পায়ার কল করতে হলো। দেখা গেল পেরেরার বলটি সাকিবের পায়ে লেগে স্ট্যাম্প ছুঁয়ে কিপারের পায়ে লাগল। খুব ধীরেসুস্থে বেল পড়ে গেল স্ট্যাম্পের! বিষয়টি বুঝতে লঙ্কানদের কিছুটা সময় লাগল। এরপর আবেদন।

তৃতীয় আম্পায়ার বললেন ফিরতে হবে সাকিবকে। অধিনায়কের সঙ্গী হলেন অভিষিক্ত মোসাদ্দেক হোসেন। নাটকীয়তার আরও বাকী ছিল! স্ট্যাম্পের অনেক বাইরে দিয়ে যাওয়া বল মুশফিকের প্যডে লাগলে আউট দিয়ে বসেন ভারতীয় আম্পায়ার সুন্দরম রবি! কিন্ত রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান অধিনায়ক। এরপর তার একটি ক্যাচও ছাড়েন হেরাথ। সাবলীল ব্যাটিং করতে করতে জয় থেকে ২ রানের ব্যবধানে ফিরেন মোসাদ্দেক।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.