বিপন্নতায় মিঠা পানির ডলফিন

সাইফ বাপ্পী |
পরিকল্পিত নদী শাসন ও মানবসৃষ্ট দূষণ। এর সঙ্গে নৌযানের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, যা সংকুচিত করে ফেলছে মিঠা পানির ডলফিন শুশুকের বিচরণক্ষেত্র। বিঘ্নিত হচ্ছে প্রজননও। অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ পন্থায় মত্স্য আহরণের কারণেও মারা পড়ছে ডলফিন। সব মিলিয়ে বিপন্নতায় রয়েছে দেশে মিঠা পানির ডলফিন। বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ রক্ষায় গঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারও (আইইউসিএন) এরই মধ্যে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে লাল তালিকাভুক্ত করেছে প্রাণীটিকে।

দেশে শুশুকের অন্যতম বৃহত্ বিচরণক্ষেত্র সুন্দরবন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটির (ডব্লিউসিএস) প্রকল্প বাংলাদেশ সেটেশান ডাইভারসিটি প্রজেক্টের (বিসিডিপি) জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবন অঞ্চলে বিচরণরত শুশুকের সংখ্যা কমবেশি ২২৫। মত্স্যসম্পদের প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্যের কারণে এখানে প্রাণীটি দেখা যায় বেশি। একটা সময় এ অঞ্চলে নিষিদ্ধ বেহুন্দি জাল, কারেন্ট জাল ও ইলিশ মারা জালে আটকা পড়ে মারা যেত বিপুল সংখ্যক শুশুক ও ইরাবতী ডলফিন। এখনো মাঝে মধ্যে এ অঞ্চলে জালে বেঁধে শুশুক বা ইরাবতী ডলফিন মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এছাড়া কর্ণফুলী-সাঙ্গু অঞ্চলে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, এখানেও শুশুকের সংখ্যা নেমে এসেছে ১২০-এ।

বুড়িগঙ্গায়ও একসময় প্রচুর শুশুক দেখা গেলেও এখন আর সে অবস্থা নেই। ভয়াবহ দূষণে নদীটির মত্স্যসম্পদের সঙ্গে বিদায় নিচ্ছে শুশুকও। একই কথা রাজধানীর কোলঘেঁষা তুরাগ নদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে শুশুক নিয়ে গবেষণা করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল বাকী। দুটি নদ-নদীর কোনোটিতেই ১০-১২টির বেশি শুশুক নেই বলে জানান তিনি। শুশুকের বিলুপ্তিতে সম্ভাব্য পরিবেশগত সংকট বিষয়ে জানতে চাইলে ড. মোহাম্মদ আবদুল বাকী বলেন, জলজ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রাণীটির অবস্থান শীর্ষে হওয়ায় এর বিলুপ্তিতে নদীর বাস্তুসংস্থানই ওলটপালট হয়ে যাবে। নদীর পরিবেশেও পড়বে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ একটি জলজ সম্পদ থেকে বঞ্চিত হবে দেশ।

দেশে নদ-নদীগুলোর পাড়ঘেঁষে গড়ে ওঠা শিল্পের বর্জ্য আর সব জলজ প্রাণীর মতো শুশুকেরও মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভাটির দিকে হওয়ায় মংলা অঞ্চলের সিমেন্ট ও অন্যান্য কারখানার বর্জ্য, নৌযানের পোড়া তেল নদীর পানিতে ছড়িয়ে পড়ায় হুমকিতে পড়ছে সুন্দরবনের শুশুক। এ দূষণের মাত্রা বাড়লে এখানেও টিকে থাকা প্রাণীটির জন্য মুশকিল হয়ে পড়বে। ২০১৪ সালে শ্যালা নদীতে তেলবাহী নৌযান ডুবে গেলে এখানকার ডলফিনের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

জেলেদের ভুলেও প্রতি বছর অনেক শুশুক মারা যায়। জানা গেছে, নদীতে মাছ ধরার জন্য পেতে রাখা জালে পাখা আটকে পড়লে মারা যায় অনেক শুশুক। জালে প্রাণীটির পাখা আটকানোর পর জেলেদের চোখে পড়লে অনেকে তা ছাড়িয়ে দেন। তবে এ সৌভাগ্য খুব কম শুশুকেরই হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাল বাঁচাতে গিয়ে শুশুকের পাখা কেটে দেন জেলেরা, যে কারণে সাঁতার কাটতে না পেরে ডুবে গিয়ে মৃত্যু ঘটে প্রাণীটির। শুধু শুশুক নয়, উপকূলীয় অঞ্চলের প্রচুর ইরাবতী ডলফিনও প্রতি বছর এভাবে মারা পড়ছে।

ডব্লিউসিএসের প্রিন্সিপাল রিসার্চার অ্যান্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রুবাইয়াত মনসুর বলেন, শুশুক মারা যাওয়ার অন্যতম কারণ মাছ ধরার জালে আটকা পড়া। বাংলাদেশে শুশুকের সংখ্যা কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ বাসস্থান সংকট। নদীদূষণ ও বাঁধ নির্মাণের কারণে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় শুশুকের বাসস্থান দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে, যা শুশুকদের অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য করছে। পাশাপাশি নির্বিচারে মাছ ধরার কারণে শুশুকের খাবারের উত্সও আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। একটি প্রাণীর বেঁচে থাকার মূল উপাদান খাদ্য ও বাসস্থান এবং এ দুটির অভাব শুশুককে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন জলযানের সঙ্গে সংঘর্ষ ও দুর্ঘটনাও শুশুকের বিলুপ্তি ত্বরান্বিত করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর ঘোলা পানিতে চোখের উপযোগিতা নেই বলে শুশুক জন্মগতভাবে অন্ধ। এ কারণে শুশুকের চলাচল ও মত্স্য শিকার পুরোপুরি ইকোলোকেশন-নির্ভর (শব্দের প্রতিফলন ব্যবহার করে পথ ও আশপাশের সবকিছু চিহ্নিত করা)। নদীতে জলযানের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও শব্দদূষণে প্রাণীটির বিচরণ ব্যাহত হয়। অনেক সময় লঞ্চ বা স্টিমারের পানিবাহিত শব্দ শুশুককে বিভ্রান্ত করে। দ্রুতগতির স্টিমারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েও বেশকিছু শুশুক মারা যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে।

নদীর বিশাল এলাকাজুড়ে বিচরণ করে শুশুক। অপরিকল্পিত নদী শাসনসহ পানিপ্রবাহ কমে চর পড়ায় কমছে প্রাণীটির বিচরণক্ষেত্র।

সীমিত বিচরণক্ষেত্রে কিছু কিছু শুশুক অল্প সময়ের জন্য টিকে থাকলেও সেখানে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়ে মারা যায় প্রাণীটি।

শুশুক রক্ষায় সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণার পাশাপাশি এ বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্র ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটির সিনিয়র এডুকেশন অফিসার ফারহানা আখতার। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতই এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। গবেষণার পাশাপাশি যদি সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া যায়, তাহলে তারাও উত্সাহ পাবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের নদী ও সাগরের জলসীমায় মোট সাত প্রজাতির ডলফিন দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে শুধু নদীতে দেখা যায় দুই প্রজাতির ডলফিন, যার একটি শুশুক। এর মধ্যে একমাত্র নদীর মিঠা পানির ডলফিন বলা চলে শুশুককেই। প্রাণীটিকে দেখা যায় শুধু বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, তিন দেশের নদ-নদী মিলিয়ে প্রাণীটির মোট সংখ্যা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০।
বণিক বার্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.