বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ১৬ প্রজাতির পাহাড়ি বৃক্ষ

সাইদ শাহীন |
পার্বত্য জেলার খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের ভৈরফা ব্রিজ গ্রাম। দুই দশক আগেও এখানকার বেশির ভাগ পাহাড়ে মিলত ১৫-২০ প্রজাতির বড় উদ্ভিদ ও বৃক্ষ। কিন্তু এখন অধিকাংশ পাহাড় প্রায় ন্যাড়া হয়ে গেছে। বড় পাছপালা তো দূরের কথা, লতাগুল্মও টিকে আছে কোনোমতে। এরই মধ্যে দীঘিনালার গুরুত্বপূর্ণ ১৬ প্রজাতির গাছ বিলুপ্তির পথে। আরণ্যক ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক এক গবেষণা থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
পার্বত্য অঞ্চলের যেসব এলাকা কাঠ পাচারকারীদের জন্য নিরাপদ জোন হিসেবে পরিচিত, তার মধ্যে দীঘিনালা অন্যতম। নির্বিচারে কাঠ পাচারকারীরা গাছ কাটছে। এতে এ অঞ্চলের ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য প্রয়োজনীয় ১৬ প্রজাতির গাছ এরই মধ্যে বিলুপ্তির পথে। এসব প্রজাতির মধ্যে আগরগুলা, বনছাতিয়ান, জন্নাগুলা, গুটগুইট্টা, হনাগুলা, কাউগুলা, তেলসুর, মেদা অন্যমত। এছাড়া চম্পা, চাপালিশ, গর্জন, সিভিট, গাব, কড়ই, মেদা, তেঁতুলও রয়েছে এ তালিকায়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরণ্যক ফাউন্ডেশনের ‘রিস্টোরেশন অব হিলি বায়ো-ডাইভারসিটি থ্রু কমিউনিটি বেজড বায়ো-রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
দীঘিনালার মতো একই অবস্থা সদর উপজেলার কমলছড়ি ইউনিয়নের বূউয়াছড়ি মৌজার কমলছড়ি গ্রামের। এ গ্রামের প্রায় ৩১৬ একর পাহাড়ি জমি বড় গাছপালা শূন্য হয়ে পড়েছে। অথচ একসময় এসব পাহাড় প্রয়োজনীয় গাছপালায় পরিপূর্ণ ছিল। পাছপালা ধ্বংসের এ অবস্থা শুধু মেরুং কিংবা কমলছড়ির নয়, পুরো পাহাড়ি অঞ্চলেই কাঠ পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে ভয়াবহভাবে।
জানা গেছে, প্রতিদিন পাহাড়ি অঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম ও ফেনী দিয়ে সারা দেশে প্রায় ১৫ হাজার ঘনফুট কাঠ পাচার হয়। দেশের কাঠের চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশই এ অঞ্চলের গাছ দিয়ে পূরণ করা হয়। এ চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে পাহাড়ে প্রতি বছর গড়ে প্রতি হেক্টরে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৫ ঘনমিটার গাছ কমে যাচ্ছে। ২০ বছর আগে এ হার ছিল প্রায় ৭ ঘনমিটার। কাঠ পাচারের সিংহভাগই হচ্ছে রামগড়, মানিকছড়ি, দীঘিনালা, পানছড়ি, মহালছড়ি, লীছড়ি অঞ্চল থেকে।
পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ড ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির পর এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের বসতভিটার জন্য ২৫ শতক এবং চাষাবাদের জন্য পাহাড়ের দুই একর জমি বরাদ্দ দেয়। বরাদ্দকৃত এসব জমি শুরু থেকেই সঠিক ব্যবহার করতে পারেনি স্থানীয়রা। বিকল্প আয় নিশ্চিত করতে না পারায় কাঠ পাচারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে অনেকে, যা এখনো চলমান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে বৃক্ষনিধনের পেছনে প্রধানত নজরদারির অভাবই দায়ী। এছাড়া বিকল্প আয়ের উত্স না থাকার কারণেও এ নিধনযজ্ঞ থামানো যাচ্ছে না। আর এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের ওপর। পাহাড়ে গাছপালা থাকলেই শুধু ছড়া ও ঝিরিতে পানি আসা সম্ভব, যা আবাদ তথা শস্য উত্পাদনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু গাছপালা কমে যাওয়ায় ছড়া ও ঝিরিতে পানি কমছে ক্রমাগত। ফলে ব্যাহত হচ্ছে উত্পাদন আর দেখা দিচ্ছে খাদ্য সংকট। এরই মধ্যে খাগড়াছড়ির থানচি এ খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ফলে স্থানীয় অধিবাসীর মধ্যে অন্যত্র স্থানান্তরিত হওয়ার প্রবণতাও প্রকট হয়ে উঠছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় অধিবাসী পুণ্য মণি চাকমা বলেন, পাহাড় থেকে গাছপালা ধ্বংসের কারণে ছড়া ও ঝিরিতে বলতে গেলে পানি আসেই না। ফলে জীবনধারণ কষ্টকর হয়ে পড়ছে। এতে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনও বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পাহাড়ি গাছপালা রক্ষার বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃক্ষনিধনের বর্তমান প্রবণতা রোধের জন্য নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন বিকল্প আয়ের উত্স তৈরি। অংশীদারি ভিত্তিতে বহু স্তরবিশিষ্ট চাষাবাদের মাধ্যমে এটি অর্জন সম্ভব। এক্ষেত্রে পাহাড়ের উপরের স্তরে স্থানীয় বিলুপ্ত প্রায় চম্পা, চাপালিশ, গর্জন, ঢাকি জাম, আমলকী, হরীতকী ও বহেড়ার গাছ লাগানো যেতে পারে। একইভাবে মধ্যম স্তরে আম, লিচু, জলপাই, শরিফা, আতা, বেল ও কদবেলের মতো বিভিন্ন ফলের গাছ এবং নিচের স্তরে লেবু, কমলালেবু ও পেঁপে রোপণ করা যেতে পারে। আর সব শেষে রয়েছে আনারস। পাহাড়ে যেসব জায়গায় ছড়া রয়েছে, তার পাশে রোপণ করা যেতে পারে মুলি ও বাইজা বাঁশ। বহুস্তরবিশিষ্ট বনায়নের মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় গাছগুলোকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীবনমানের উন্নয়নও সম্ভব।
এ পদ্ধতি অনুসরণ করে এরই মধ্যে কয়েকটি পাহাড়ে বনায়ন করছেন ভৈরফা গ্রামের ইতুক্যা চাকমা, সুশান্তি চাকমা ও ধনকুমার। তারা জানান, বনায়নের কারণে এখন সারা বছরই কয়েকটি ঝিরি ও ছড়ায় পানি ফিরে এসেছে। ফল, সবজি ও বাঁশ বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবানও হচ্ছেন তারা।
জানা গেছে, এ এলাকায় সাত বছর ধরে কাজ করে এ মডেল তৈরি করেছে আরণ্যক ফাউন্ডেশন। বেসরকারি সংস্থা আনন্দের মাধ্যমে শুরুতে ৩৫ পরিবারকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ, নানা প্রজাতির গাছের চারা সরবরাহ করা হয়। পরবর্তীতে আরো কয়েকটি পাহাড়ে তা সম্প্রসারণ করা হয়।
এ বিষয়ে আরণ্যক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দীঘিনালা উপজেলায় ২৫০ হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত ২৩৫টি ন্যাড়া পাহাড়ে ২৬ প্রজাতির ১ লাখ ৭৩ হাজার দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি চারা রোপণ করা হয়েছে। এসব গাছের মাধ্যমে স্থানীয়রা নানাভাবে উপকৃত হচ্ছেন। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সিংহভাগ পাহাড়ে এ ধরনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.