বড় হচ্ছে ফুলের বাজার

রেজাউল করিম খোকন।

এখন প্রাত্যহিক জীবনযাপনে ফুলের কদর অনেক বেড়েছে। ফুলের ব্যবহার হচ্ছে নানা কাজে, নানাভাবে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে শুভেচ্ছা স্বরূপ উপহার হিসেবে ফুলের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। এর বাইরে বিভিন্ন উত্সবে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিপুল পরিমাণ ফুল কিনছেন অন্যকে উপহার দিচ্ছেন বছর জুড়েই। ২০১১ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২৫০০ একর জমিতে ফুলের চাষ হতো, যা ২০১৪-তে বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার একশ তেতাল্লিশ দশমিক ৬৭ একরে।
এবারের পহেলা ফাল্গুন বা বসন্ত উত্সব ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ ফুল সরবরাহ হয়েছে। শুধুমাত্র ১১ ফের্রুয়ারি দেশের বৃহত্ ফুলের মোকাম যশোরের গদখালী থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার গোলাপ, জারবেরা ও গ্লাডিওলাস পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন জেলায়। বসন্ত এবং বিশ্ব ভালোবাসা দিবস দুটি সামনে রেখে এক সপ্তাহ আগে থেকেই গদখালীর ফুল সারা দেশে পাঠানো শুরু হয়েছিল। দুটি বিশেষ দিন উপলক্ষে শুধু একদিনেই গদখালীর বাজার থেকে সাত লাখ গোলাপ, দেড় লাখ জারবেরা ও ছয় লাখের মতো গ্লাডিওলাস দেশের বিভিন্ন জায়গার ফুলের হাটে পাঠানো হয়েছে। যার দাম অন্তত পাঁচ কোটি টাকা।
দিনে দিনে দারুণ সম্ভাবনাময় হয়ে উঠছে বাংলাদেশের ফুলের বাজার। এক্ষেত্রে অনেক প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। সামপ্রতিক কয়েক বছরে বেশ এগিয়ে গেছে আমাদের পুষ্প বাণিজ্য। দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই বিদেশেও বাংলাদেশের ফুলের বাজার বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর ২০টি দেশে বাংলাদেশের ফুল এবং ফুলজাত পণ্য রফতানি হচ্ছে। ’৫০-এর দশকে বিশ্বব্যাপী পুষ্প বাণিজ্যের পরিমাণ তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও কম ছিল। ১৯৯৪-এ এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বজুড়ে পুষ্প বাণিজ্যের দারুণ প্রসারের প্রকাশ সামপ্রতিক কয়েক বছরে বাংলাদেশেও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখানেও ফুল চাষ, উত্পাদন এবং এর বাজারজাতকরণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২৫০০ একর জমিতে ফুলের চাষ হতো, যা ২০১৪-তে বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার একশ’ তেতাল্লিশ দশমিক ৬৭ একরে।
সময়ের আবর্তনে আমাদের জীবনধারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, রুচিবোধ, মন-মানসিকতায়ও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। এখন প্রাত্যহিক জীবনযাপনে ফুলের কদর অনেক বেড়েছে। ফুলের ব্যবহার হচ্ছে নানা কাজে, নানাভাবে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে শুভেচ্ছা স্বরূপ উপহার হিসেবে ফুলের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। এর বাইরে বিভিন্ন উত্সবে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিপুল পরিমাণ ফুল কিনছেন অন্যকে উপহার দিচ্ছেন বছর জুড়েই। বিশেষ করে বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠানে, জন্মদিনে, বিবাহবার্ষিকী, রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মসূচিগুলোতে ফুল আবশ্যিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন নাগরিক জীবনে চাহিদামাফিক ফুলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য বড় বড় শহরগুলোতে ফুলের বিরাট পসরা সাজিয়ে বসছেন ফুলের ব্যবসায়ীরা। গড়ে উঠেছে অসংখ্য পুষ্পবিপণী। প্রতিদিন যেখানে বিরাট অংকের অর্থের বাণিজ্য হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার শাহবাগ, বেইলি রোডসহ আরো কয়েকটি জায়গায় অসংখ্য দোকান নিয়ে গড়ে উঠেছে বিরাট ফুলের বাজার। ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী ফুলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ফুলের ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্পাদিত নানা জাতের ফুল এনে বাজারজাত করছেন। বিভিন্ন জাতীয় দিবসগুলোতে যেমন- বিজয় দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবসের পাশাপাশি ভ্যালেন্টাইনস ডে, পহেলা ফাল্গুন, পহেলা বৈশাখ প্রভৃতি দিনে উত্সব-আনন্দের অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যাপক পরিমাণে ফুলের ব্যবহার হচ্ছে। এসব দিনগুলোয় রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, খুলনার মত বড় বড় শহরগুলোতে তো বটেই অন্যান্য শহর এমনকি মফস্বল পর্যায়েও ফুলের বিক্রি বাড়ছে। আর এভাবেই দেশে ফুলের বাজার রমরমা থাকছে বছর জুড়েই।
বাংলাদেশে ফুলের চাষ ও উত্পাদন বৃদ্ধির নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এজন্য সরকারি সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিশেষ মনোযোগ জরুরি হয়ে উঠেছে। ফুলের চাষকে উত্সাহিত করতে আলাদাভাবে প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। ফুলচাষিদের জন্য সহজশর্তে বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। রপ্তানিমুখী উন্নতজাতের ফুল উত্পাদনে পর্যাপ্ত অংকের ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এ খাতের আরো বিকাশ ঘটবে সন্দেহ নেই। যারা ফুল চাষ নিয়ে দ্বিধা সংকোচের মধ্যে রয়েছেন, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এগিয়ে আসতে পারছেন না তাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে। ফুলচাষের নানা কলাকৌশল, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণে অধিক পরিমাণে উন্নতজাতের ফুল উত্পাদন, উত্পাদিত ফুল সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, রপ্তানি ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহী চাষি, ফুল ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু ফুল দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, নির্ধারিত গন্তব্যে দ্রুত ও যথাসম্ভব কম খরচে ফুলের চালান পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ফুলকে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তুলতে বিদেশে ফুলের মেলাগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করা দরকার। ফুল রপ্তানিকারণ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের ফুলের সরবরাহ বাড়াতে ফুল বাণিজ্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে যুগোপযোগী আধুনিক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। উন্নতমানের ফুলের চাষাবাদকে আরো সমৃদ্ধ করতে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা চলছে। এজন্য প্রয়োজনে উন্নত জ্ঞান অর্জনের জন্য এদেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের বিভিন্ন দেশে পাঠাতে হবে সরকারি উদ্যোগে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা অনুযায়ী ফুল সরবরাহের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে ফুল   রপ্তানির পরিমাণ বাড়িয়ে যাতে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করা যায়- সে লক্ষ্যে সব ধরনের উদ্যোগ এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.