মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার: নকশায় ভুলের শুরু চারদলীয় জোট সরকারের সময়

ইসমাইল আলী |
মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই হয় ২০০৪ সালে। আর নকশা প্রণয়ন করা হয় ২০০৫-এ। তবে স্বাধীন কোনো পরামর্শক দিয়ে যাচাই-বাছাই (ভেটিং) করা হয়নি ফ্লাইওভারটির নকশা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরই (এলজিইডি) নকশা অনুমোদন করে। ফলে নকশায় ত্রুটি ধরা পড়েনি সে সময়। মূলত চারদলীয় জোট সরকারের সময়েই নকশায় ভুলের সূত্রপাত। এছাড়া ২০১১ সালে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন বা নির্মাণ শুরুর আগে ফ্লাইওভারের নকশা রিভিউ করা হয়নি। ছাড়পত্র নেয়া হয়নি ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষেরও (ডিটিসিএ)

এদিকে ফ্লাইওভারের নকশাপ্রণেতা দলের প্রধান রবার্ট ই. রিকম্যানকেও পরে খুঁজে পায়নি এলজিইডি। নকশা সংশোধনের জন্য ২০১৩ সালে তার খোঁজ করে ব্যর্থ হয় সংস্থাটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন রেলক্রসিংয়ে যানজট কমাতে ২০০০ সালে ফ্লাইওভার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সে সময় এ দায়িত্ব দেয়া হয় স্থানীয় সরকার বিভাগকে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথমেই মগবাজার-মৌচাক ক্রসিংয়ে ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। আর সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০০২ সালের জুলাইয়ে। এতে ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা অনুদান দেয় কুয়েত ফান্ড।

দরপত্র আহ্বান করলে যৌথভাবে কাজ পায় কুয়েতের দি অ্যাসোসিয়েটেড ইঞ্জিনিয়ারিং পার্টনারশিপ (ট্যাপ), ভারতের এসটিইউপি কনসালট্যান্টস প্রাইভেট লিমিটেড ও বাংলাদেশ কনসালট্যান্টস লিমিটেড (বিসিএল)। স্থানীয় সরকার বিভাগের তত্কালীন সচিব এওয়াইবিআই সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ঠিকাদার নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মগবাজার ও মৌচাকে পৃথক দুটি ফ্লাইওভার নির্মাণের কথা বলা হয় সে সময়।

ফ্লাইওভার দুটির সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়নে ১৭ সদস্যের টিম নিয়োগ করে তিন প্রতিষ্ঠান। এর মূল দায়িত্বে ছিলেন মেক্সিকান নাগরিক রবার্ট ই. রিকম্যান। আর প্রকল্পটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হায়দার আলী। এর আগে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে দুটির পরিবর্তে একটি সমন্বিত ফ্লাইওভারের সুপারিশ করে রবার্ট ই. রিকম্যান নেতৃত্বাধীন কমিটি। সে অনুযায়ী, ২০০৫ সালে ফ্লাইওভারের বিস্তারিত নকশা চূড়ান্ত করা হয় স্বাধীন কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দিয়ে ফ্লাইওভারটির নকশা ভেটিং করানো ছাড়াই। তবে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মতামতের জন্য চিঠি দেয়া হয়।

এলজিইডির তত্কালীন প্রধান প্রকৌশলী মো. শহিদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো ধরনের মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

তবে নকশা রিভিউ না করার বিষয়টি স্বীকার করেন ফ্লাইওভারের তত্কালীন প্রকল্প পরিচালক মো. হায়দার আলী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতামত নেয়া হলেও নকশা রিভিউ করা হয়নি। যত দূর মনে পড়ে, দরপত্র আহ্বানের আগে নকশা রিভিউর সুপারিশ করেছিল রবার্ট নেতৃত্বাধীন কমিটি। তবে সে সময় ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পটি স্থগিত রাখা হয়। ফলে এলজিইডি নিজেই বিস্তারিত নকশা অনুমোদন করে। ২০০৮ সালে আমি অবসরে চলে যাই। এর পরের কথা আমার জানা নেই।’

তিনি আরো বলেন, নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সব স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা হয়। তাই নকশায় ত্রুটির কোনো সুযোগ নেই। তার পরও সব নকশাই রিভিউ করতে হয়, যাতে কোনো ত্রুটি থাকলে যেন ধরা পড়ে। তাই মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নকশাও রিভিউ করা উচিত ছিল।

উল্লেখ্য, নকশা চূড়ান্ত করার পর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণ শুরুর উদ্যোগ নেয় এলজিইডি। কুয়েত ফান্ডের অর্থায়নে ফ্লাইওভারটি নির্মাণে অর্থায়ন প্রস্তাবও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো হয়। তবে ফ্লাইওভার নির্মাণের চেয়ে বিদ্যুেকন্দ্রকে বেশি গুরুত্ব দেয় তত্কালীন চারদলীয় জোট সরকার। এতে ফ্লাইওভারের পরিবর্তে শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া হয় কুয়েত সরকারের কাছে। স্থগিত রাখা হয় মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ।

২০১০ সালে পুনরায় ফ্লাইওভারটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন হয় ২০১১ সালে। আর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে। এতে অর্থায়ন করে সৌদি সরকার এবং ওপেক ফান্ড। তবে যাচাই-বাছাই ছাড়াই আট বছরের পুরনো নকশায় কাজ শুরু হয়। এছাড়া বাধ্যতামূলক হলেও নকশাটি ডিটিসিএ কর্তৃক অনুমোদন করানো হয়নি।

জানতে চাইলে প্রকল্পটির বর্তমান পরিচালক মো. নাজমুল আলম বলেন, প্রকল্পটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত। ফলে ডিটিসিএর অনুমোদনের কোনো প্রয়োজন নেই। আর প্রকল্পটির পাইলিংয়ের ডিজাইন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) প্রতিনিধি দল রিভিউ করে দিয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে নির্মাণ শুরুর পর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারে নকশায় জটিলতা দেখা দেয়। ভূগর্ভস্থ পরিষেবা সংযোগ লাইনের কারণে পাইলিংয়ের নকশা পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়ে। তবে নকশাপ্রণেতা দলের প্রধান রবার্ট ই. রিকম্যানকে খুঁজে পায়নি এলজিইডি। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন, কী করছেন— তার কোনো হদিস দিতে পারেনি কুয়েতের ট্যাপ ও ভারতের এসটিইউপি। ফলে বুয়েটের শরণাপন্ন হয় এলজিইডি। তারা পাইলিংয়ের ডিজাইন রিভিউ করে।

সাধারণত ফ্লাইওভারে ওঠার রাস্তাটি বেশি ঢালু হয়, যাতে সহজে গাড়ি চালিয়েই ওঠা যায়। আর নামার রাস্তাটি হয় তুলনামূলক খাড়া। ফলে গতি কমিয়ে দ্রুত ফ্লাইওভার থেকে নামা যায়। এতে ফ্লাইওভারে ওঠার র্যাম্পটির দৈর্ঘ্য বেশি ও নামার র্যাম্পের দৈর্ঘ্য কম থাকে। তবে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের নকশায় দেখা গেছে ঠিক এর বিপরীত চিত্র। সাতরাস্তা, মগবাজার, মালিবাগ, রাজারবাগ, পুলিশ লাইন, শান্তিনগরসহ প্রতিটি এলাকায় এর ওঠার র্যাম্প অনেক বেশি খাড়া। আর নামার র্যাম্পগুলো তুলনামূলক বেশি ঢালু।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত বাম হাতে চালিত যানের জন্য এ ফ্লাইওভারের নকশা প্রণয়ন করা হয়েছিল। ফলে উল্টো নকশায় ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করা হয়েছে। আর এখন ফ্লাইওভারটি ডান হাতে চালিত যানের জন্য ব্যবহার করতে হবে। এতে নানা ধরনের সমস্যা হবে।

এ বিষয়ে কুয়েত ও ভারতের দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করে বণিক বার্তা। ট্যাপ জানায়, অনেক আগেই রবার্ট ই. রিকম্যান চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। তাই এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করবে না। এছাড়া রবার্টের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো ঠিকানাও তারা দিতে পারেনি। বাংলাদেশে বিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল হকের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ প্রসঙ্গে সাবেক প্রকল্প পরিচালক হায়দার আলী বলেন, ‘ফ্লাইওভারটি ডানহাতি না বামহাতি— গাড়ির জন্য তাতে কী আসে-যায়। মহাখালী ফ্লাইওভারটি যদি এখন উল্টোভাবে ব্যবহার করা হয়, তাতে কি কোনো সমস্যা হবে? তা যদি না হয়, তবে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের জন্য কেন এত আলোচনা? অনেকেই না বুঝে এসব সমালোচনা করছে।’

তিনি আরো বলেন, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারে র্যাম্পের যে অবস্থা, তাতে রিকশা উঠতে গেলে সমস্যা হতে পারে। তবে ফ্লাইওভার নিশ্চয়ই রিকশার জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে না। তাই সমস্যার কোনো প্রশ্নই আসে না।

একই ধরনের মন্তব্য বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নাজমুল আলমের। তিনি বলেন, ‘এগুলো সম্পূর্ণ ভুল কথা। আমি গাড়ি চালিয়ে নিজে চড়েছি ফ্লাইওভারে। এতে কোনো ধরনের সমস্যা হয়নি।’ বণিক বার্তা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.