মনীন্দ্র বাবুর মিষ্টি

আমিনুল মহিম।

মিষ্টি। প্রচলিত মুখরোচক খাবার গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এই মিষ্টি। ছেলে বুড়ো থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের মানুষের প্রিয় খাদ্যের তালিকায় মিষ্টির স্থান সবার ওপরে। উৎসব পার্বণে আতিথেয়তায় মিষ্টির জুড়ি মেলা ভার। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকমের মিষ্টি তৈরি হয়। এদের অধিকাংশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সে অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্য।

তেমনি ঐতিহ্যর স্বাদ নিয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য মিষ্টি ভাণ্ডার। নাম মনীন্দ্র বাবুর মিষ্টি। ফেনী জেলাশহর থেকে মাত্র কুড়ি কি.মি. দূরে সোনাগাজী উপজেলায় মনীন্দ্র বাবুর বিখ্যাত সেই মিষ্টি দোকান।

এখানকার মিষ্টির জনপ্রিয়তা ফেনী জেলায় তো বটেই, ছড়িয়েছে আশপাশ এর জেলাগুলো পর্যন্ত। স্থানীয় লোকদের কাছে মনীন্দ্র বাবুর মিষ্টি যেন লোভনীয় এক নাম। মনীন্দ্র বাবুর দোকানে সকাল সন্ধ্যা মিষ্টি প্রেমীদের জটলা থাকে একই রকম। এখানকার গরম মিষ্টির স্বাদ যে কারো জিভে জল আনতে বাধ্য।

১৯৫৪ সালে মনীন্দ্র লাল দাসের হাত ধরে এই মিষ্টির যাত্রা। তার নাম অনুসারেই ‘মনীন্দ্র বাবুর মিষ্টি’ নামে দোকানের নামকরন করা হয়। পরবর্তীতে মনীন্দ্র বাবুর মিষ্টি নামে এটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। শুরুতে মনীন্দ্র বাবু নিজেই ছিলেন এই মিষ্টির করিগর। ব্যবসায় সততা, নিষ্ঠা, গুণগত মান বজায় রেখে মিষ্টি তৈরি করায় অল্প সময়ে মনীন্দ্র বাবুর মিষ্টির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৮৮ সালে মনিন্দ্র লাল দাস মারা গেলে তার ছেলে সমর দাস পিতার রেখে যাওয়া ব্যবসার হাল ধরেন। পিতার শেখানো কায়দাকানুন আর সুনাম বজায় রেখে মিষ্টি তৈরি করে ছেলে সমর দাসও ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এখনও সমর বেশ দাস সুনামের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী এ মিষ্টির ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

সমর দাস জানান, প্রথমে তিনিও পিতার মতো নিজে মিষ্টি তৈরি করতেন। তবে সময়ের সঙ্গে চাহিদা বাড়ায় কারিগরের সহযোগীতা নিতে হয়। বর্তমানে দুজন কারিগর আর তিন জন কার্মচারী নিয়েই ঐতিহ্যবাহী এ মিষ্টির ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

আগে কয়েক পদের মিষ্টি তৈরি করলেও বর্তমানে শুধুমাত্র রসগোল্লা নামে একপদের মিষ্টি উৎপাদন করা হয় মনীন্দ্র বাবুর মিষ্টি দোকানে। প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ কেজি মিষ্টি বিক্রি হয় এখানে। প্রচুর চাহিদা থাকলেও গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রাখতে নির্দিষ্ট পরিমান মিষ্টি তৈরি করে তারা। এতে করে প্রায়শই অনেক ক্রেতাকেই খালি হাতে ফিরে যেতে হয়। তাই লোকমুখে প্রচলিত আছে ভাগ্যবানরাই নাকি মনীন্দ্র বাবুর মিষ্টির স্বাদ নিতে পারে! প্রতিদিনের মিষ্টি প্রতিদিনই বিক্রি হয়ে যায়। মিষ্টি বাসি হওয়ার সুযোগ থাকেনা বলেও জানায় সমর দাস।

তিনি জানান, স্থানীয়রা ছাড়াও এ মিষ্টি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষসহ প্রবাসীদের কাছেও সুনাম অর্জন করেছে। বিয়েসহ বিভিন্ন বড় বড় অনুষ্ঠানে তাদের এ মিষ্টির কদর রয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে লোকজন এসে কিনে নিয়ে যায় লোভনীয় স্বাদের এই মিষ্টি। বেশি মিষ্টি নিতে হলে আগে থেকেই অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়। না হলে, যে কাউকেই বিড়ম্বনায় পড়তে হতে পারে।

মনীন্দ্র বাবু মিষ্টির বিশেষত্ব এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে সমর দাস জানান, ‘গরুর খাঁটি দুধ থেকে ছানা কেটে তৈরি করা হয় এই মিষ্টি। প্রতিদিন সকালে স্থানীয় গোয়ালীদের কাছ থেকে কাঁচা দুধ ক্রয় করেন। সেই দুধ জাল দিয়ে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয় ছানা। বিশুদ্ধ ছানার সঙ্গে পরিমাণ মতো চিনিসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ এর সমন্বয়ে মিষ্টির বিশেষ মিশ্রণ প্রস্তুত করা হয়। আগেই তৈরি করে রাখা ছানার মিশ্রণকে নির্দিষ্ট আকার অনুযায়ী গোলাকার আকৃতি করা হয়। এরপর গোলাকার ছানার টুকরোগুলো চিনির তৈরি সিরায় জাল দেওয়া হয়। মিষ্টি তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি কারিগররা নিজস্ব দক্ষতার বলে সম্পন্ন করেন।

তিনি আরও জানান, ঐতিহ্যবাহী এ মিষ্টির সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে তারা বদ্ধপরিকর। এক্ষেত্রে মিষ্টির স্বাদ বা গুণগত মান পরিবর্তন হতে পারে এমন কোনো উপকরণ মেশান না তারা। সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়। চারিদিকে যখন ভেজালের ছড়াছড়ি ঠিক সেই সময়ে এসেও কোনো ধরনের ভেজালের ছোঁয়া লাগতে দেননি বলেও জানান সমর দাস।

এতো কিছুর পর মনে হতে পারে দাম কি খুব বেশি? না মোটেও নয়, মাত্র ১৭০টাকা কেজিতে পাওয়া যায় সুস্বাদু এই মিষ্টি। অর্জিত সুনাম ধরে রাখতে মিষ্টির উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও এখনো সুলভ মূল্যে নির্ভেজাল মিষ্টি বিক্রি করছে মনীন্দ্র বাবুর মিষ্টি নামে খ্যাত এই দোকান। দামে কম আর মানে ভালো হওয়ায় এই অঞ্চলের ভোজন রসিকদের খাবারের তালিকায় শীর্ষে থাকে মনীন্দ্র বাবুর মিষ্টি।

কয়েক যুগ ধরে সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসা পৈতৃক এই মিষ্টির দোকানের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন বর্তমানে এই ব্যবসা সংশ্লিষ্টরা। কালের পরিক্রমায় পথচলা খুব বেশি সময়ের না হলেও অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে গ্রাহকের মনে শক্ত আসন গড়তে সক্ষম হয়েছে মনীন্দ্র বাবুর মন ভোলানো সেই মিষ্টি। স্বল্প এই পথ চলায় হাজারো মিষ্টি প্রেমীর কাছ থেকে যে ভালোবাসা অর্জন করেছে মনীন্দ্র বাবুর মিষ্টি তা সত্যি ঈর্ষণীয়।

সূত্র: বাংলামেইল২৪ডটকম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.