মহাশূন্যে মানুষের শরীরে কী ঘটে

মায়া ওয়েই-হাস রূপান্তর: শওকত হোসেন
মহাশূন্যে ৩৪০ দিন কাটানোর পর মার্কিন মহাকাশচারী স্কট কেলি ও নভোশ্চর মিখাইল করনিয়েনকো ক’দিন আগে আমাদের ছোট নীল মার্বেলে নেমে এসেছেন।
মহাশূন্যে দীর্ঘতম অবস্থান না হলেও কোনো আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে কারো কাটানো সবচেয়ে বেশি সময় এটা এবং এতে ওজনশূন্যতা, অপ্রশস্ত জায়গা ও ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়ার প্রতি উন্মুক্ত থাকার কারণে মানুষের শরীরে কী ঘটে, তার গবেষণার সুযোগ পেয়েছে নাসা।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পৃথিবীবাসী নির্দিষ্ট পরিমাণ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিকশিত হয়ে উঠেছে। তো মহাশূন্য ভ্রমণের গোড়া থেকেই নাসা আমাদের গ্রহের টানে বাইরে থাকা অবস্থায় মানুষের শরীরে কী ঘটে, তা জানার চেষ্টা করে আসছিল।
‘আমরা যেসব স্বাভাবিক ব্যাপারকে নিশ্চিত ধরে নিই, কেউ নিশ্চিত ছিল না যে কী ঘটবে’— বলেছেন স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের স্পেস হিস্ট্রির কিউরেটর ও চেয়ার ভ্যালেরি নীল। ‘ঠিকমতো গিলতে পারবে তো ওরা? ঠিকমতো দেখতে পাবে তো? প্রস্রাব করতে পারবে?’
একেবারে প্রথম দিকের পরীক্ষাগুলো পশুদের সাহায্যে করা হয়েছিল— যেমন কুকুর, বাঁদর ও ইঁদুরের কথা বলা যেতে পারে। তার পর ১৯৬২ সালে মহাশূন্যচারী জন গ্লেন অ্যাপল জুসের একটা টিউবসহ পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী প্রথম আমেরিকানে পরিণত হন।
‘চমত্কার নরম পিচ্ছিল খাবার বাছাই করে একটা টুথপেস্টের টিউবে ভরে দিয়েছিল ওরা। তার পর গিলতে পারে কিনা আর খাবারটা তার পাকস্থলীতে নেমে যায় কিনা, তা দেখতে একটু একটু করে খেতে দিয়েছে’— বলেছেন নীল। কিন্তু এসব যাত্রার স্বল্পমেয়াদ বিজ্ঞানীদের পরীক্ষার বিষয়কে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে এবং অগ্রগামী নভশ্চরদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছে। ‘নভোশ্চররা তাদের দরকারি কাজেই বেশি ব্যস্ত ছিল এবং গিনিপিগের মতো আচরণ পেতেও ইচ্ছুক ছিল না তারা’— যোগ করেছেন নীল।
ভ্রমণের মেয়াদ বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শারীরবৃত্তীয় পরীক্ষার মেয়াদও বেড়েছে। আজকাল আইএসএস নভোচারীরা ফ্লাইটের আগে একগাদা পরীক্ষা, ইনফ্লাইট নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা আর কঠিন জমিনে ফিরে আসার পর প্রলম্বিত পুনর্বাসনের মুখে পড়েন।
কিন্তু মঙ্গল গ্রহের দিকে নজর রেখে এখনো আরো দীর্ঘ যাত্রার ফলাফল সম্পর্কে অনেক কিছু শেখা বাকি রয়ে গেছে নাসার। কেলি ও করনিয়েনকোর পক্ষে তাদের ‘মহাশূন্যে এক বছর’ মিশনটি ছিল মহাশূন্যে অবস্থানের সময় কেবল শারীরবৃত্তীয় বিষয়ের প্রতি মনোযোগের প্রথম প্রয়াস— পৃথিবীর বুকে কেলির একজন যমজ ভাই থাকায় প্রকল্পটি আরো বেশি কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে উঠেছিল। তার মানে, বিজ্ঞানীরা দুজন মানুষের দিকেই নজর রাখতে পারবেন এবং মহাশূন্য সফরকালে কোনো ধরনের জেনেটিক পরিবর্তন ঘটে থাকলে অনায়াসে শনাক্ত করতে পারবেন।
এখানে নাসা যেসব প্রভাবের খোঁজ করবে, তেমন বড় কয়েকটি প্রভাবের উল্লেখ করা হলেও আসছে মাসগুলোয় কেলি ও করনিয়েনকোর কাছ থেকে আরো বহু কিছু জানতে পারব আমরা:
মাথা ঘোরা
আপনার অন্তঃকর্ণ মোটামুটি স্মার্টফোনের অ্যাকসেলারোমিটারের মতো কাজ করে— আপনার শরীরকে তা জানিয়ে দেয়, কখন চলছেন বা থামছেন এবং কখন মাথায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কিংবা কাত হয়ে শুয়ে আছেন। কিন্তু মহাশূন্যে এ সামান্য মেকানিজমটা বিগড়ে যায়, মাইক্রো গ্রাভিটিতে প্রবেশের পর প্রায়ই একদিন বা সমান সময়ের জন্য নভোশ্চরদের মোশন সিকনেসে ভোগায়। অনেকে আবার আমাদের গ্রহের টানে ফিরে আসার সময়ও একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়েন— বলেছেন নীল।
‘অনেকটা জাহাজ থেকে নেমে আসার মতো, কিন্তু শরীরের নিচে পাবিহীন অবস্থায়’— বলেছেন তিনি। নভোচারীরা প্রায়ই প্রাথমিকভাবে ভেসে থাকার অনুভূতির কথা বলেন, যা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর সঙ্গে শরীর খাপ খাইয়ে নেয়ার পর উধাও হয়ে যায়।
হাড় ও পেশি
মহাশূন্যে আমাদের অভিযানে বিজ্ঞানীরা প্রথম যেসব ব্যাপার আবিষ্কার করেছেন, তার একটা হলো কম মাধ্যাকর্ষণের জীবনযাত্রা শক্তিশালী হূিপণ্ডসহ হাড় ও পেশির জোগান দেয় না। পৃথিবীমুখী থাকা অবস্থায় এসব দৈহিক অঙ্গ আসলে স্রেফ আমাদের সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করতেই প্রচুর খেটে থাকে। মাধ্যাকর্ষণের নিম্নমুখী শক্তির অভাবে শরীর উল্লেখযোগ্য কম কাজ করে পেশির ক্ষয় ও হাড়ের পুরুত্ব হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নাসার মতে, মহাশূন্যে মাত্র একটি মাস কাটানোর পর নভোচারীরা কোনো ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়া নারী এক বছরে যে পরিমাণ অস্থিবস্তু খোয়ান, সেই পরিমাণ অস্থিবস্তু হারাতে পারেন। এ বিস্ময়কর ক্ষয় রক্তে ক্যালসিয়ামের উচ্চহারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা কিনা মূত্রাশয়ে পাথর হওয়ার মতো বড় ধরনের ঘটনার দিকে চালিত করতে পারে। এসব সমস্যার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে নভোচারীরা স্পেস স্টেশনে বিশেষভাবে নকশা করা মেশিনের সাহায্যে নিবিড় শরীরচর্চা করে থাকেন। নাসার ভাষ্যমতে, গোটা মিশনের মেয়াদে কেলি মোটামুটি ৭০০ ঘণ্টা ব্যায়াম করেছেন।
ল্যান্ডিংয়ের পর পর বেশির ভাগ সমস্যার পাল্টা ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে, কিন্তু তাতে কিছু খাটনি আছে। ‘কেবল মাথাটা খাড়া রাখাই ছিল এক অদ্ভুত নতুন অভিজ্ঞতা’— ২০১৩ সালে আইএসএসে আটক থাকার পর সিবিসি নিউজকে বলেছিলেন নভোচারী ক্রিস হ্যাজফিল্ড। ‘কারণ পাঁচ মাস আমাকে ঘাড়ের ওপর মাথা ধরে রাখতে হয়নি।’
ভাসমান তরল:
‘প্রতি সেকেন্ডে আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে তরল প্রবাহিত হয়’— বলেছেন নীল। এ তরল প্রবাহ দৃষ্টিকে প্রভাবিত করতে পারার মতো অপটিক নার্ভের ওপর চাপসহ নানা মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি করে। পৃথিবীতে ফিরে আসার পর চোখের সমস্যা সাধারণত ঠিক হয়ে যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যাত্রার ক্ষেত্রে নাসার ধারণালাভের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় ধরনের বিষয় এটা।
মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয়া
পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র এক ধরনের প্রাকৃতিক বর্মের কাজ করে, যার ফলে উচ্চক্ষমতার তেজস্ক্রিয়ার কবল থেকে পৃথিবীপৃষ্ঠের জীবন রক্ষা পায়। নইলে আমাদের ডিএনএকে তা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারত। এ নিরাপদ এলাকার বাইরে আইএসএসে কৃত্রিম আবরণ নভোচারীদের তেজস্ক্রিয়া থেকে আংশিক রক্ষা করতে পারে। কিন্তু সব ধরনের তেজস্ক্রিয়ার পক্ষে তা কার্যকর নয় বলে নভোচারীদের ক্যান্সার ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রতি উন্মুক্ত করে তোলে।
মঙ্গলের বুকে কোনো সফর আরো নিষ্ঠুর হয়ে দাঁড়াতে পারে। তার কারণ যাত্রার সময়ের উন্মুক্ততার সঙ্গে যোগ হবে লাল গ্রহের প্রাকৃতিক চৌম্বক বর্মের অনুপস্থিতি। সর্বশেষ আইএসএস মিশন থেকে বিজ্ঞানীরা মহাশূন্যের তেজস্ক্রিয়া কীভাবে কেলির ডিএনএতে পরিবর্তন আনতে পারে এবং ভবিষ্যতের মঙ্গলমুখী অভিযাত্রীদের ক্ষেত্রে তার সম্ভাব্য তাত্পর্য ঠিকমতো বোঝার আশা করছেন।
ভীতিকর ঠেকা এসব প্রভাব সত্ত্বেও বেশির ভাগ জানা ক্ষতি একজন নভোশ্চর পৃথিবীতে ফেরার পর শোধরানো যেতে পারে। গত সপ্তাহে মহাশূন্য থেকে করা এক সংবাদ সম্মেলনের সময় কেলিকে প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল। চোখে সামান্য কিছু প্রভাবের কথা বললেও তিনি বলেছেন, সব মিলিয়ে ভালোই বোধ করছেন এবং মানসিকভাবেও ভালো আছেন: ‘দেয়াল বাইছি বলে মনে হচ্ছে না।’
‘খুবই পরিকল্পিত কায়দা ও ধীর সতর্ক গতিতে কাজটা করার চেষ্টা করেছি’— বলে যোগ করেছেন, প্রতিটি মিশন দায়িত্বকে একটি মাইলস্টোন হিসেবে কাজে লাগান তিনি। ‘আমি মনে করি, দূরপাল্লার যাত্রাকে ভেঙে দেয়া এ ধরনের মাইলস্টোন থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। পরের মাইলস্টোন হলো ঘরে ফেরা।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.