মাঠে ঠকছে কৃষক বাজারে ভোক্তা

বাজারে শীতের আগাম সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। এই সবজি কৃষকের কাছ থেকে হাত বদলে ভোক্তার কাছে পৌঁছতে দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। হাত বদলের এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও ঠকছেন কৃষক। অনেক ক্ষেত্রে তারা উৎপাদন মূল্যও পাচ্ছেন না। অন্যদিকে বেশি দাম দিয়ে খুচরা বাজার থেকে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ভোক্তারা। অর্থাৎ ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থার কারণে মাঠে কৃষক ও বাজারে ভোক্তাদের ঠকতে হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি বেগুন ১৫-১৮ টাকায় বিক্রি হলেও ঢাকার খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। একইভাবে ৪০ টাকা কেজি দরের শিম ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে শীতের আগাম সব ক’টি সবজির সরবরাহ বাড়লেও দাম অনেক বেশি। একশ্রেণীর অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শান্তিনগর কাঁচাবাজার, মালিবাগ বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকা, বেগুন ৫৫-৬০ টাকা, লাল টমেটো ৯০-১০০ টাকা, গাজর ১০০-১১০ টাকা, ফুলকপি ৬০-৬৫ টাকা, বাঁধাকপি ৪০-৪৫ টাকা, মুলা ৪৫-৫০ টাকা, শীতের লম্বা লাউ প্রতি পিস ৬০ টাকা। দেখা গেছে, কৃষক পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায় প্রতি কেজি শিমে দামের ব্যবধান ছিল ৬০ টাকা। আর প্রতি কেজি বেগুনে ৪০ থেকে ৪২ টাকা, টমেটো ৪০ থেকে ৫০ টাকা, গাজর ৫০ টাকা, ফুলকপি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, বাঁধাকপি ২০ থেকে ২৫ টাকা, মুলা ৩০-৩৫ টাকা ও লাউ ৫০-৫৫ টাকা ব্যবধান।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের নিত্যপণ্য কিনতে আসা মো. মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বাজারে শীতের আগাম সবজি পর্যাপ্ত। বিক্রেতারা পরিপাটি করে সাজিয়ে বিক্রি করছে। দেখেই যেন ব্যাগ ভরে কিনতে মন চাচ্ছে। কিন্তু দাম অনেক বেশি। সবজি বিক্রেতা সোনাই আলী বলেন, পাইকারি বাজার শীতের আগাম সবজির দাম বেশি। যে কারণে বেশি দাম দিয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। দাম বাড়ার পেছনে আমার মতো খুচরা বিক্রেতাদের হাত নেই। জানতে চাইলে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, মাঠে কৃষক থেকে বাজারে ভোক্তা উভয় ঠকছেন। বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকার কারণে মধ্যস্বত্বভোগীরা অতি মুনাফা লুটছে। যদি কৃষক পর্যায় থেকে সরাসরি পাইকারি ও খুচরা বাজারে তাদের পণ্য বিক্রি করার উপায় থাকত, তবে মধ্যস্বত্বভোগীরা অতি মুনাফা করতে পারত না। তাই দেশের বাজার তদারকি সংস্থাগুলোকে কৃষক পর্যায় থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজারে জোরদার মনিটরিং করতে হবে। এতে কৃষকও লাভবান হবে। সঙ্গে লাভবান হবেন ভোক্তারাও। রাজশাহী ব্যুরো জনায়, সবজির সবচেয়ে বড় মোকাম মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি হাটে শিম বিক্রি করতে আসেন পার্শ্ববর্তী পবা উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের সবজি চাষী আবদুল মতিন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমি তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে শিম চাষ করেছি। এক সপ্তাহ আগে থেকে শিম তুলছি। গত সপ্তাহে ৪০ টাকা কেজিদরে শিম বিক্রি করেছি। আজ (রোববার) ৩০ কেজি শিম ৩৫ টাকা কেজি দরে ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ এই বেগুন কয়েকগুণ দামে ভোক্তারা কিনছেন। তিনি বলেন, ফড়িয়াদের কারণে আমরা পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছি না। মোহনপুরের কেশরহাট মোকামের ব্যবসায়ীরা কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কিনেন। প্রতিদিন এ মোকাম থেকে বেগুন, গাজর, শিম, ফুলকপিসহ বিভিন্ন ধরনের শীতের আগাম সবজি নিয়ে শতাধিক ট্রাক ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। মোকামের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শনিবার কৃষক পর্যায় থেকে প্রতি কেজি বেগুন ১৫ থেকে ২০ টাকায় কেনা হয়। এছাড়া ফুলকপি ৩০ টাকা, বাঁধাকপি ২০ টাকা ও বেগুন ১৫-১৮ টাকায় কেনা হয়। অথচ কয়েক হাত ঘুরে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এসব পণ্য দুই থেকে তিনগুণ দামে বিক্রি হয়। জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, শীত আসার আগেই বাজারে আগাম সবজি পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে পর্যাপ্ত সবজিও আছে। কিন্তু দাম বেশি। কিন্তু এই বেশি দামে কৃষক লাভবান হচ্ছেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে এই সবজি বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রোধ করতে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করা হবে। যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.