মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারে চলছে সিএনজিচালিত ৮৬% গাড়ি

ইয়ামিন সাজিদ |
সারা দেশে বর্তমানে আড়াই লাখেরও বেশি সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস বা কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাসে (সিএনজি) পরিচালিত গাড়ি রয়েছে। এসব গাড়িতে সংযোজিত রয়েছে প্রায় চার লাখ সিলিন্ডার। কিন্তু এগুলোর মধ্যে প্রায় ৮৬ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। ফলে সিএনজিচালিত এসব যানবাহনে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যখন-তখন ঘটছে দুর্ঘটনার ঘটনাও।
জাতীয় সংসদের বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে সম্প্রতি রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সিএনজিচালিত যানবাহনে সিলিন্ডার ব্যবহার-সংক্রান্ত একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন দেয়। পেট্রোবাংলা-সংশ্লিষ্ট এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়।
সিএনজি বিধিমালা-২০০৫-এ প্রতি পাঁচ বছরে সিএনজি ফিলিং স্টেশনের বার্ষিক নিরাপত্তা জরিপ ও ক্যাসকেড সিলিন্ডার পরীক্ষণ কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পুনঃপরীক্ষার জন্য সাতটি সিএনজি সিলিন্ডার রিটেস্টিং সেন্টার রয়েছে। তবে সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা ও সিএনজি সিস্টেম পরীক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি যানবাহন মালিকদের কাছ থেকে লক্ষণীয় সাড়া পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিএনজি কনভার্সন ওয়ার্কশপগুলোর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সিএনজিতে রূপান্তরিত গাড়ির সংখ্যা ২ লাখ ৫৪ হাজার ৫২২। এসব গাড়িতে সংযোজিত রয়েছে প্রায় চার লাখ সিলিন্ডার। আরপিজিসিএল ও ব্যক্তিমালিকানার রিটেস্টিং সেন্টারগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব সিলিন্ডারের মধ্যে ৫৩ হাজার ৮০০টির পুনঃপরীক্ষা বা রিটেস্ট করা হয়েছে। সে হিসাবে সিএনজিতে রূপান্তরিত গাড়িতে ব্যবহূত সিলিন্ডারের ৮৬ শতাংশেরই পুনঃপরীক্ষা করা হয়নি।
আরপিজিসিএল জানায়, সিএনজি-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা এড়াতে পাঁচ বছরের বেশি ব্যবহূত মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের পুনঃপরীক্ষা করা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে জনসচেতনতা না থাকায় পুনঃপরীক্ষার হার সন্তোষজনক নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রতিটি গাড়ির সিএনজি সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার জন্য দু-তিনদিন সময় লাগে। এছাড়া পুনঃপরীক্ষা করাতে গেলে ২০ থেকে ৪০ লিটারের প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার, ৪০-৬০ লিটারের প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য আড়াই হাজার, ৬০-৮০ লিটারের প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য ৩ হাজার এবং ৮০ লিটারের বেশি প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য সাড়ে ৩ হাজার টাকা ফি দিতে হয়। এ কারণে কিছু গাড়ির মালিক এ প্রক্রিয়াকে বাড়তি খরচ ও সময় নষ্ট বলে মনে করে পুনঃপরীক্ষা থেকে বিরত থাকেন।
অথচ ত্রুটিযুক্ত সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে প্রায়ই ঘটছে বিভিন্ন দুর্ঘটনা। যাত্রী কল্যাণ সমিতি নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১১-১৫ সময়ে সারা দেশে ৩১৪টি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সিএনজি-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় আরপিজিসিএলের সরেজমিন প্রতিবেদনেও সিলিন্ডারের দুর্বলতার বিষয়টিই উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ট্রাফিক আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় গাড়ি মালিকরা আইনের শিথিলতার সুযোগে মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন। এছাড়া গাড়ির ফিটনেস সনদ প্রদানে বিআরটিএর (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) উদাসীনতাও এর জন্য দায়ী। এতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
আরপিজিসিএলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরপিজিসিএলের নিজস্ব দুটি কনভার্সন ওয়ার্কশপ শুরু থেকেই সিএনজি কনভার্সনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আরপিজিসিএলের দুটি ওয়ার্কশপের মাধ্যমে গত ১৫ বছরে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও ব্যক্তিমালিকাধীন প্রতিষ্ঠানের পেট্রলচালিত গাড়ি সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এছাড়াও সারা দেশে বেসরকারি পর্যায়ের ১৮০টি সিএনজি কনভার্সন ওয়ার্কশপ স্থাপনের অনুমোদনও দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আরপিজিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (সিএনজি) মোহাম্মদ আলী বিশ্বাস বলেন, নির্দিষ্ট সময়ে সিএনজি পুনঃপরীক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সিএনজি সিস্টেম পরীক্ষার সনদ ছাড়া কোনো গাড়ির ফিটনেস সনদ দেয়ার বিষয়ে বিআরটিএর সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে। এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি সিলিন্ডার ব্যবহার না করতে গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হচ্ছে। সৌজন্যে: বণিক বার্তা।

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.