যখন মৃত্যু আসে

মূল : হেলেন সিগনি
হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

মৃত্যু এমন একটা বিষয়, যার মুখোমুখি প্রতিটি প্রাণীকে এক দিন হতেই হবে। অনিবার্য এ সত্যটা জানার পরও মানুষ মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে চায় না। কিন্তু যাদের পেশাগত জীবন কাটে কোনো-না-কোনোভাবে মৃত্যুর সাথে, তারা এ বিষয়ে কখনো-কখনো মুখ খোলেন। এখানে সেরকম তিনজন পেশাজীবীর বক্তব্য তুলে ধরা হলো :

নিক্কি জনস্টন, প্যালিয়েটিভ কেয়ার নার্স প্র্যাকটিশনার

একজন মানুষ যেভাবে তার সারা জীবন কাটায়, মারাও যায় অনেকটা সেভাবে কেউ ক্রুদ্ধ হয়ে, কেউ বা আধ্যাত্মিক ভঙ্গিতে। তবে মৃত্যুর মুহূর্তটাকে কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না। আমি যে পেশায় আছি, প্যালিয়েটিভ কেয়ার, এটি শুধু মৃত্যু নিয়েই কাজ করে না, করে জীবন নিয়েও। একজন মানুষের জীবনের শেষ ক’টা দিন বা সপ্তাহকে যথাসম্ভব সুন্দর বা ভালো করাই এর কাজ। আমাদের সমাজে একটা প্রবণতা আছে যে, আমরা মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে চাই না, যেন এটা একটা গোপন বিষয়।

মাঝে মধ্যে মৃত্যুটা আসে একেবারে হঠাৎ করে। কিন্তু প্রায় সময় এর আসাটা যেন অনুভব করা যায়। যেমন একজন লোকের অনেক বয়স হয়েছে, অথবা কেউ একজন খুব অসুস্থ এবং তাই ভীষণ দুর্বল হয়ে ঘুমাচ্ছে তো ঘুমাচ্ছেই। এসব লোক যতক্ষণ না জেগে থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি ঘুমায়। তাদের ক্ষুধা কমে যায়। উবে যায় এমনকি তৃষ্ণাও। বিছানায়ও তারা হয়ে পড়ে নিশ্চল। একপর্যায়ে তারা অচেতন হয়ে যায়। তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরনও পাল্টে যায়। নিঃশ্বাসের গতি কমে আসে; অনেকক্ষণ পর বড় করে একটা শ্বাস নেয়। দু’টি নিঃশ্বাসের মাঝখানের ফাঁকটি কোনো-কোনো সময় এত বেশি যে, মনে হতে পারে মানুষটি বুঝি মারাই গেছে। এ অবস্থা কয়েক ঘণ্টা থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

কোনো-কোনো সময় মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে হঠাৎ জ্ঞান ফিরে আসে কারো বা। এই সংক্ষিপ্ত সময়টিকে অনেক মধুর দৃশ্য দেখেছি আমি। কাউকে-কাউকে তার প্রিয়জনের উদ্দেশে বলতে শুনেছি : ‘আই লাভ ইউ। সব ঠিক আছে। আমি চললাম।’

আবার কাউকে-কাউকে বলতে শুনেছি, কারা যেন তাকে নিতে এসেছে। আমার মনে হয়, শেষ শয্যায় শায়িত মানুষটির সাথে এমন কারো যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে, যা কি না আমাদের চিন্তা ও কল্পনারও অতীত।

এমনও দেখেছি, মৃত্যুশয্যায় শায়িত ব্যক্তির স্বজনেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে আছে। যেই না তারা একটু চা-পানি খাওয়ার জন্য বের হলো, অমনি রোগীর মৃত্যু হলো। আবার কোনো-কোনো সময় দেখেছি, রোগী যেন কারো জন্য অপেক্ষা করছেন। যেই না ওই ব্যক্তি এলেন, অমনি রোগী চোখ মুদলেন। ভেবে পাই না, কে এসব নিয়ন্ত্রণ করে?

নশ্বর মানবদেহ ছেড়ে আত্মার চলে যাওয়াটা কিন্তু বোঝা যায়। একটি দেহে যতক্ষণ জীবন ছিল, ততক্ষণ তার শ্বাস-প্রশ্বাস চলছিল। শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হলো মানে মানুষটি চলে গেল। এরপর যা রইল তা একটি নিথর দেহ কাঠামোমাত্র। এই মৃতদেহটিকে প্রায় ক্ষেত্রেই খুব প্রশান্ত মনে হয়। এমনও হয় যে, ওই ব্যক্তি অনেক দিন রোগে ভুগে একেবারে জীর্ণ হয়ে গেছেন। কিন্তু যেই তার মৃত্যু হলো, তাকে দেখাতে লাগল আগের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কমবয়সী এবং প্রশান্ত।

আসলে দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আমি এমন অনেককেও দেখেছি, আমার মনে হয়েছে, মৃত্যু তাদের প্রশান্তি দেয়নি।
রোগশয্যায় অনেককে মৃত্যুকে ডাকতেও দেখেছি। কিন্তু তাদের ডাকাডাকি শুনে মৃত্যু যে খুব তাড়াতাড়ি এসেছে, তা নয়। বুঝি, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তার স্বজনদের জন্য বিরাট যন্ত্রণা। কিন্তু কী-ই বা করার থাকে!

অনেকের বেলায় এমন হয় যে, তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অকাতরে অর্থ ব্যয় করা হয়। কিন্তু যখন সময় হয়, তখন মৃত্যু ঠিকই চলে আসে। আমরা মৃত্যুকে জীবনেরই অংশ বলে মেনে নিই।
অনেক মানুষকে দেখেছি, মৃত্যু আসন্ন জেনেও কিছুমাত্র বিচলিত নয়। তারা বিশ্বাস করে, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তারা স্বর্গে আরোহণ করবে। এই ধর্মীয় বিশ্বাস তাদের আরাম দেয়, সাহস দেয় আর কমিয়ে দেয় ভয়। তবে সবার বেলায় এ রকমটি ঘটে না।

. বিল সিলভেস্টার, আইসিইউ স্পেশালিস্ট

মৃত্যু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যর্থতা নয়, বরং এটা জীবনেরই অংশ। হয়তো এ কারণেই কখনো-কখনো দেখি, আমার কোনো রোগী কিছুতেই সুস্থ হওয়ার দিকে যাচ্ছে না। যে ওষুধই দিই না কেন, কাজ হচ্ছে না। তাদের কেউ-কেউ এত টা অসুস্থ যে, তারা বলতে পারছে না যে, ‘অনেক হয়েছে, আর নয়।’
মৃত্যুর আগের দিন বা মুহূর্তগুলোতে তারা আমাদের কী বলেছিলেন বা বলতে চেয়েছিলেন অনেকে জানতে চান। আমরা বলি, ‘প্লিজ, আমাকে আর কষ্ট দিও না।’ ‘আহ্, আমাকে এবার মরতে দাও,’ ‘ওরা সবাই কোথায়?’ ‘আমি সবার ঘাড়ের ওপর বোঝা হয়ে বেঁচে আছি, মরলে বাঁচি।’ এসব কথাই রোগীরা বলেন।
তবে আমার মনে হয় কী, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রত্যেকের কিছু বলার থাকে। অথচ আমরা প্রায়ই তাদের সেই কথাগুলো বলতে দিই না। পরিবারের লোকজন হয়তো বলে, ‘মা, একটু চুপ করো। তোমার কষ্ট হচ্ছে তো।’ ব্যাপারটা এরকম যেন তারাই মৃত্যুর সাথে লড়ছে। অথচ আমার মনে হয়, ডাক্তার, নার্স ও রোগীর পরিবারের লোকজনের উচিত মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটিকে কথা বলতে দেয়া।

বেশির ভাগ লোককে দেখেছি যে, তারা নিজ বাড়িতে মরতে চায়। কিন্তু রোগী বিষয়টা বলে যেতে না পারলে তার পরিবারের লোকজন ‘মৃত্যু আসন্ন’ বুঝতে পেরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো কাজটা হচ্ছে, ইচ্ছাপত্র (উইল) তৈরি করে রাখা। তাতে লিখে রাখা যেতে পারে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি লাইফ সাপোর্টে থাকতে চান না বরং শান্তিতে মরতে চান। আরো লেখা যায় যে, মৃত্যু দীর্ঘায়িত হয় এমন কোনো ব্যবস্থা যেন নেয়া না হয়।

সুস্থ থাকা অবস্থায় এরকম ইচ্ছাপত্র তৈরির ফল যে কী তা আমি নিজে দেখেছি। আমার এক রোগিনী ১৫ বছর ধরে তার ছেলের সাথে কথা বলতেন না। কিন্তু তিনি তার ইচ্ছাপত্রে লিখলেন, ‘প্লিজ, আমার ছেলেকে বলো যে, আমি তাকে খুব ভালোবাসি।’ আমরা এর একটা কপি ছেলেটির হাতে পৌঁছালাম। ছেলেটি তা পড়ল এবং মা-ছেলের পুনর্মিলন হলো।

মেরি ওয়াটারফোর্ড, পেস্টর্যাল কেয়ারার

আমি দেখেছি, মৃত্যু সন্নিকট হলেই অনেকে তাদের অতীত জীবনের কথা বলতে শুরু করে। বলে, তারা এখন কী অবস্থায় আছে, আগে কী ছিল। এসব কথা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। পেস্টর‌্যাল কেয়ারার হিসেবে আমি অনেকের জীবনের গল্প শুনেছি। জেনেছি তাদের সাহস, অঙ্গীকার ও সৌহার্দ্যরে কথা।

বেশির ভাগ লোকের মৃত্যুই হয় আত্মীয়স্বজন পরিবৃত অবস্থায়। ধর্মবিশ্বাসীদের অনেকে মৃত্যুর জন্য যে তৈরিই থাকেন। তাদের কাছে মৃত্যুটা সৃষ্টিকর্তার কাছে যাওয়ার একটা সিঁড়ি। অনেকে বিশ্বাস করেন, মৃত্যুর পরের জীবনে তারা তাদের পূর্বসূরীদের দেখা পাবেন। অনেকের ধারণা, তাদের দেহের অণু-পরমাণু মহাবিশ্বের সাথে মিশে যাচ্ছে।

আরেকজনের কথা মনে পড়ছে। অসুস্থ হয়ে তিনি তখন হাসপাতালে। ডাক্তারদের হিসাবে তার আয়ু আছে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ। কিন্তু তিনি তা জানেন না। তিনি আমাদের বললেন, নতুন একটি ওষুধ নিতে চান তিনি। ওষুধটি তখনো ট্রায়াল পর্যায়ে। কিন্তু মরণাপন্ন রোগীর ইচ্ছা বলে কথা। নতুন ওষুধটির জন্য আমরা অনেক কষ্টে তাকে নিয়ে গেলাম বড় একটি হাসপাতালে। ওষুধ দেয়াও হলো তাকে। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হলো। মৃত্যুর সময় আমি তার পাশে ছিলাম। তার স্ত্রী কাঁদতে-কাঁদতে আমাকে বললেন, ‘আপনি তো তাকে চিনতেন, সে সবসময় ঝুঁকি নিতে ভালোবাসতো। সে জানত, নতুন ওষুধটি তার জন্য ভালো না-ও হতে পারে। তবে তার আশা ছিল, এর মাধ্যমে ডাক্তাররা নতুন কিছু শিখতেও পারেন। এমন মৃত্যুই সে চেয়েছিল।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.