রিফর্ম প্রকল্প: রেলওয়েতে সাড়ে ৮ হাজার নতুন পদ সৃষ্টির সুপারিশ

স্বাধীনতার পর রেলওয়ের জনবল ছিল ৫০ হাজারের বেশি। তবে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায়  প্রায় ১০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করা হয়। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে করপোরেশনে রূপান্তরের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে দক্ষ কর্মী হারিয়ে ধুঁকছে সংস্থাটি। তাই সেবার মান বাড়াতে রেলওয়েতে নতুন করে ৮ হাজার ৬০০ পদ সৃষ্টির সুপারিশ করেছে প্রাইসওয়াটারহাউজকুপারস (পিডব্লিউসি)। রেলওয়ে রিফর্ম প্রকল্পের আওতায় এ সুপারিশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

জানা গেছে, সেবার মান বৃদ্ধি ও পরিচালনা ব্যবস্থায় গতিশীলতা আনতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে রেলওয়ে সংস্কার প্রকল্প নেয়া হয় ২০০৬ সালে। এক্ষেত্রে জনবল ও ভাড়া ব্যবস্থা সংস্থারসহ বেশকিছু শর্ত দেয় এডিবি। এগুলো পূরণসাপেক্ষে রেলওয়েকে বড় অঙ্কের ঋণের আশ্বাস দেয়া হয়। এজন্য এরই মধ্যে ভাড়া ব্যবস্থা সংস্কার করা হয়েছে। এবার রেলওয়ের জনবল কাঠামো পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসি। এক্ষেত্রে পদ সৃষ্টির পাশাপাশি নতুন কিছু বিভাগ তৈরি করতে বলা হয়েছে।

নতুন জনবল কাঠামোর বিষয়ে এরই মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মতামত নেয়া হয়েছে। কাঠামো চূড়ান্তে সম্প্রতি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করা হয়। এর পর অনুমোদনের জন্য তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানানো হয়, ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মাথাপিছু জনবল কম। ভারতে মোট রেল ট্র্যাক রয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৬৫ কিলোমিটার। দেশটির রেলওয়ের জনবল ১২ লাখ। পাকিস্তানে রেল ট্র্যাক ১১ হাজার ৮৮১ কিলোমিটার ও জনবল ৭৮ হাজার। আর বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্র্যাক ৩ হাজার ৯৭৬ কিলোমিটার ও জনবল ২৮ হাজার। সুতরাং রেলওয়ের জনবল বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

বৈঠকে আরো বলা হয়, বর্তমানে রেলওয়ের অনুমোদিত জনবল কাঠামো ৪০ হাজার ২৬৪। যদিও বেশ কিছুদিন নিয়োগ বন্ধ থাকায় ও অনেকে অবসরে চলে যাওয়ায় প্রায় ১২ হাজার পদ শূন্য রয়েছে। তাই সেবার মান বাড়াতে দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি অনুমোদিত জনবল বাড়িয়ে ৪৮ হাজার ৮৬৮তে উন্নীত করতে হবে।

রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমান সরকার রেলওয়ে খাতকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। নতুন রেললাইন নির্মাণ ও পুরনো লাইন সংস্কার করা হচ্ছে। সারা দেশকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ স্টেশনগুলো পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া চলছে। এতে রেলওয়ের কাজের পরিধি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তাই জনবল কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

পিডব্লিউসির প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বর্তমানে রেলওয়েতে ১৪টি বিভাগ রয়েছে। এগুলো হলো— মহাপরিচালকের কার্যালয়, কারিগরি (মেকানিক্যাল), পুরকৌশল (সিভিল), পরিচালন (অপারেশন), বাণিজ্যিক (কমার্শিয়াল), সিগনাল অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন্স, বৈদ্যুতিক (ইলেকট্রিক্যাল), হিসাব, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি), মেডিকেল, স্টোর, এস্টেট, পারসোনেল ও সাধারণ প্রশাসন। এসব বিভাগে অনুমোদিত জনবল রয়েছে ৪০ হাজার ২৬৪। সেবার মান বাড়াতে এসব বিভাগে আরো প্রায় আট হাজার নতুন পদ সৃষ্টি করতে হবে। এতে পুরনো ১৪টি বিভাগে জনবলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ হাজার ২৫৮।

এর বাইরে নতুন পাঁচটি বিভাগ সৃষ্টির পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো— ডিজাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন, প্রকল্প উন্নয়ন- পুরকৌশল, প্রকল্প উন্নয়ন- কারিগরি, লিগ্যাল সেল ও আইসিটি (ইনফরমেশন কমিউনিকেশন অ্যান্ড টেকনোলজি)। এসব বিভাগে নতুন করে ৬১০টি পদ সৃষ্টি করতে হবে। সব মিলিয়ে জনবল ৪৮ হাজার ৮৬৮-এ উন্নীত করতে হবে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিদ্যমান বিভাগগুলো আগের কাজই করবে। নতুন বিভাগগুলোর কাজও হবে সুনির্দিষ্ট। এর মধ্যে ডিজাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন বিভাগ রেলওয়ের গবেষণা ও উন্নয়ন সেল হিসেবে কাজ করবে। প্রকল্প উন্নয়ন- পুরকৌশল ও প্রকল্প উন্নয়ন- কারিগরি বিভাগে রেলওয়ের চলমান ও ভবিষ্যত্ প্রকল্পের বিষয়ে সমীক্ষা ও নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করবে। লিগাল সেল রেলওয়ের জমি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আইনগত জটিলতা নিরসনে কাজ করবে। আর আইসিটি বিভাগ কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে।

রেলপথমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, সারা দেশের মানুষকে সঠিকভাবে সেবা দিতে গেলে রেলওয়ের দক্ষ জনবল কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এজন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া রেলওয়েতে আলাদা পরিকল্পনা সেল গঠন করে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হবে। এজন্য বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশের উদাহরণ অনুসরণ করা হবে। প্রকল্প উন্নয়ন বিভাগ মূলত বিভিন্ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই-বাছাই করবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.