লিচুর রাজ্য দিনাজপুর

মাহমুদ হাসান খান
দিনাজপুর ভ্রমণপিয়াসীদের এক স্বর্গরাজ্য। এখানে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা। আর লিচুর সিজনে বোনাস হলো বিশাল সব লিচুবাগানে বসে লিচুর সৌন্দর্য দেখা। লিচুর সিজন আসলে খুব কম। বড়জোর এক থেকে দেড় মাস। এখন থেকে হয়তো জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত লিচু পাওয়া যাবে। আর তাই সময় পেলে এখনই ঘুরে আসুন লিচুর রাজ্য দিনাজপুর। সঙ্গে দেখবেন রামসাগর, কান্তজির মন্দির, নয়াবাদ মসজিদসহ অন্যান্য সব স্থাপনা।

কী আছে দিনাজপুরে

দিনাজপুরের দেখার আছে নানা স্থাপনা। আর লিচুর মৌসুমে লিচুবাগান একটি বাড়তি আনন্দ জোগাবে। সবচেয়ে ভালো হয় সারা দিনের জন্য একটা অটো ভাড়া করে নিন। প্রথমেই চলে যান কান্তজির মন্দির। শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে এবং কাহারোল উপজেলার ঢেপা নদীর তীরে অবস্থিত একটি প্রাচীন মন্দির এটি। এ মন্দিরকে নবরত্ন মন্দির নামেও ডাকা হয়। কারণ এর রয়েছে নয়টি চূড়া বা রত্ন। মন্দিরটি প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন দিনাজপুরের মহারাজা প্রাণনাথ রায়। তাঁর মৃত্যু হলে এটি তাঁর পালিত ছেলে মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ সালে মন্দিরটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। মন্দিরটি ১৮৯৭ সালে এক ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চূড়াগুলো ভেঙে যায়। তবে এখন মন্দিরটি খুব যত্নের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।

মন্দির দেখে চলে যেতে পারেন কাছেই নয়াবাদ মসজিদ দেখতে। এখানকার অধিবাসীরা জানান, কান্তজির মন্দির তৈরি করতে বিদেশ থেকে যেসব মুসলমান শ্রমিক এসেছিলেন, তাঁদের নামাজ পড়ার জন্য মহারাজা রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের নয়াবাদ গ্রামে এ মসজিদটি তৈরি করে দেন। ১.১৫ বিঘা জমির ওপর মসজিদটির অবস্থান। মসজিদের প্রবেশদ্বারের ওপর ফারসি ভাষায় রচিত লিপি থেকে জানা যায়, সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সময় ২ জ্যৈষ্ঠ, ১২০০ বাংলা সনে (১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দ) মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। নয়াবাদ মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট।

কান্তজির মন্দির এবং নয়াবাদ মসজিদে যাওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশে দেখবেন শুধু লিচুবাগান। যে কোনো একটি বাগানে নেমে সেখানকার কেয়ারটেকারের অনুমতি নিয়ে বাগানে ঢুকে পড়ুন। এরপর লিচুভরা গাছের সঙ্গে ছবি তুলুন। ভুলেও লিচু ছিঁড়বেন না গাছ থেকে। একে একে দেখে নিন অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি দ্বীপশিখা স্কুল।

দিনাজপুরের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ তেজপুর গ্রামের রামসাগর দিঘি। রামসাগরকে বলা হয় বাংলাদেশের মানবসৃষ্ট সবচেয়ে বড় দিঘি। তটভূমিসহ রামসাগরের আয়তন চার লাখ ৩৭ হাজার ৪৯২ বর্গমিটার। দৈর্ঘ্যে এটি এক কিলোমিটারেরও বেশি। গভীরতা প্রায় ১০ মিটার। ঐতিহাসিকদের মতে, দিনাজপুরের বিখ্যাত রাজা রামনাথ ১৭৫০-১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই রামসাগর দিঘি খনন করেছিলেন এবং তাঁরই নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয় রামসাগর।

দিনাজপুর শহর থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে অসাধারণ সুন্দর একটি পার্ক। নাম স্বপ্নপুরি। ১৯৮৯ সালে রমজান বিন মোজাম্মেল নামের এক ব্যক্তি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে এ পার্ক কাম পিকনিক স্পট বানিয়ে তার নাম দেন স্বপ্নপুরি। ৪০০ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ পার্কটি দেখার জন্য অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। এখানে রয়েছে শিশুদের খেলাধুলার নানা ব্যবস্থা এবং থাকার জন্য রিসোর্ট।

কীভাবে যাবেন

দিনাজপুর যাওয়ার রয়েছে ট্রেন ও বাসের ব্যবস্থা। ট্রেনে গেলে আরামদায়ক এবং নিরাপদভাবে ১০ ঘণ্টায় দিনাজপুর পৌঁছে যাবেন। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে ঢাকার কমলাপুর থেকে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় দ্রুতযান এক্সপ্রেস। ভাড়া ৪৭৫ টাকা (শোভন চেয়ার)। এ ছাড়া ঢাকার গাবতলী থেকে প্রতিদিন এবং রাতে নাবিল, শ্যামলী পরিবহনসহ বিভিন্ন বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া ৬০০ টাকা। সময় লাগে আট ঘণ্টার মতো।

কোথায় থাকবেন

দিনাজপুরের থাকার মনো নানা মানের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেলটির অবস্থান শহরের এক প্রান্তে সুন্দর একটি জায়গায়। এসি টুইন রুমের ভাড়া ১৯০০ টাকা। ঢাকার মহাখালীর পর্যটটের হেড অফিস থেকে বুকিং করে যেতে পারবেন। এ ছাড়া শহরের ভেতর রয়েছে হোটেল ডায়মন্ড (ফোন : ০১৭২০-৬৮৯২৯৭), এখানে ১২০০ টাকায় দুজন থাকার মতো এসি রুম পাবেন, নন এসি রুম ৫০০-৮০০ টাকা। হোটেল ইউনিক, হোটেল মৃগয়াসহ রয়েছে নানা মানের হোটেল। এসব হোটেলেও ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে নানা মানের রুম পাবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.