শুধু শিশুদের বই বিক্রি করে পাঠশালা-মোঃ রফিকুল ইসলাম

বাংলাদেশে শিশু সাহিত্য নিয়ে লেখালেখি অনেক আগে থেকে থাকেলও শিশু কিশোরদের বই বিক্রির প্রতিষ্ঠান খুব কমই রয়েছে। আর শুধুমাত্র শিশু কিশোরদের বই বিক্রির প্রতিষ্ঠান তো একেবারে অঙ্গুলিমেয়। রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে শুধুমাত্র শিশুদের বই বিক্রি করে এমনই একটি প্রতিষ্ঠান পাঠশালা। “ শিশুরাই একদিন বড় হবে গড়ে তুলবে সোনার বাংলাদেশ ” এই স্লোগান নিয়ে ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি শুধুমাত্র শিশু – কিশোরদের বই ই বিক্রি করে থাকে। সমানতালে করে থাকে প্রকাশনাও। এছাড়াও নিজেদের প্রকাশনার পাশাপাশি বিক্রি করে থাকে দেশীয় এবং বিদেশী নানান প্রকাশনার বইও। শিশু – কিশোরদের প্রকাশিত বই এবং তার বিক্রি নিয়ে বইনিউজটোয়েন্টিফোরের সাথে কথা বলেছেন পাঠশালা প্রকাশনীর মোঃ রফিকুল ইসলাম।
বইনিউজ – কেন শুধুমাত্র শিশুদের বই বিক্রি করছেন?
রফিক – আসলে বাংলাদেশে শিশু কিশোরদের নিয়ে অনেক লেখালেখি থাকলেও শুধুমাত্র শিশুদের বই বিক্রির প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে খুব একটা নেই। তাছাড়া শিশু – কিশোরদের বই বিক্রির ক্ষেত্রে একরকম আনন্দও রয়েছে যা অন্য কোথাও নেই। এছাড়া শিশু – কিশোররা যখন তাদের বাবা – মা – ভাইবোনদের সাথে এসে তাদের পছন্দের বইটি কেনে তখন তাদের হাতে তাদের পছন্দের বইটি তুলে দেয়ার যে আনন্দ তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। শিশুদের বই বিক্রি করে আর্থিকভাবে সেরকম লাভবান হওয়া যায়না কিন্তু শুধুমাত্র এই আনন্দটুকুর জন্যই আমরা এই কাজটি করে যাচ্ছি।
বইনিউজ – পাঠশালা শুধুমাত্র শিশুদের বইই বিক্রি করে থাকে। বিক্রির ক্ষেত্রে বড়দের চেয়ে শিশুদের বই বিক্রি করায় আপনারা কী ব্যবসা করতে পারছেন?
রফিক – শুধুমাত্র শিশু – কিশোরদের বই বিক্রি করে টিকে থাকাটা খুবই কষ্টকর। কারণ দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ছাড়াও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক অনেক খরচ রয়েছে। শুধুমাত্র শিশুদের বই বিক্রি করে সে খরচ মেটানো খুবই কষ্টকর।
বইনিউজ – এখন কোন ধারার শিশুদের বই সবচেয়ে বেশী বিক্রি হচ্ছে?
রফিক – বর্তমানে রুপকথা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক বইগুলো শিশুরা সবচেয়ে বেশী পছন্দ করে। রুপকথার ক্ষেত্রে পুরোনো লেখকদের ক্ল্যাসিক গুলোই সবচেয়ে বেশী প্রাধান্য পাচ্ছে। বিজ্ঞানভিত্তিক লেখালেখির ক্ষেত্রে ভালো মানের প্রতিষ্ঠিত লেখক, কোন বইয়ের লেখার মান ভাল ইত্যাদি সব থেকে বেশি প্রাধান্য পায় । এছাড়া নতুন কিছু কিছু লেখকদের বইও বেশ ভালোই বিক্রি হচ্ছে।
বইনিউজ – শিশুদের বই কেনার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের কোন বাধা বলে মনে করেন কী না?
রফিক – কিছু সংখ্যক অভিভাবক মনে করে যে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বই পড়লে তাতে পড়ালেখায় ক্ষতি হয়। তবে এই সংখ্যাটা বর্তমানে অনেক কমে গেছে। এখানে যারা তাদের সন্তানদের নিয়ে বই কিনতে আসে তাদের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাবা – মায়েদের মধ্যে আমি এই প্রবণতা লক্ষ্য করেছি। বাইরে কী হয় না হয় সেক্ষেত্রে আমি সঠিকভাবে কিছু বলতে পারছি না। তাছাড়া অনেক সময় এমনও দেখেছি যে বাবা – মা তাদের সন্তানদের খুশি করার জন্য অথবা তাদের আবদার রক্ষা করার জন্যও অনেক সময় বই কিনে দেন। সেক্ষেত্রে অভিভাবকদের আমি সেক্ষেত্রে কোন বাধা বলে মনে করিনা।
বইনিউজ – কীভাবে প্রচারনা করলে শিশুদের বই বিক্রি আরো বেশী হবে বলে আপনি মনে করেন?
রফিক – প্রচারনার কথাতে যদি আসি তাহলে এদেশে প্রচারনা করাটা খুবই ব্যয়বহুল এবং খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার। ইতোপুর্বে আমরা যখনই প্রচারনা করেছি দেখা গেছে তাতে বই বিক্রির পর সামান্য যে লাভ থাকে তা দিয়ে অন্যান্য যে খরচ আছে তা মেটানোর পর অবশিষ্ট আর কিছুই থাকেনা। আমাদের ব্যবসাটা মূলত কমিশন নির্ভর সেই কমিশন থেকে বিজ্ঞাপনের খরচ উঠিয়ে আনাটা খুবই দুরুহ ব্যাপারও বটে। সেক্ষেত্রে সরকার এবং অন্যান্য গণমাধ্যম একটা বিরাট সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের গণমাধ্যমগুলো যদি শিশু – কিশোরদের বই পড়া নিয়ে কোন প্রতিযোগীতার আয়োজন করে তাহলে সেক্ষেত্রে আর যাই হোক শিশুদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহ কিছুটা হলেও বাড়বে।
বইনিউজ – একসময় বইয়ের মার্কেট হিসেবে খ্যাত আজিজ সুপার মার্কেট বর্তমানে কাপড়ের মার্কেটে পরিণত হয়েছে এই অবস্থায় আপনারা কীভাবে টিকে আছেন? একই অবস্থা চলতে থাকলে আর কতদিন এভাবে টিকে থাকা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
রফিক – এক সময়ে এই আজিজ সুপার মার্কেট সারা দেশে বইয়ের মার্কেট হিসেবে পরিচিত ছিল কিন্তু হঠাৎ করে এক শ্রেণীর টি শার্ট ব্যবসায়ীরা এসে এখানে আস্তানা গাড়তে শুরু করলো। তারা দোকান মালিকদেরকে বেশী পরিমাণে ভাড়া দিয়ে দোকান নেওয়া শুরু করতে থাকে। বইয়ের দোকানে যে পরিমান লাভ তা খুবই সীমিত অন্যদিকে টি শার্ট ব্যবসায় লাভ প্রচুর। বই বিক্রির এই সীমিত লাভে তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে অনেক পুরোনো বই ব্যবসায়ীই এখান থেকে চলে গেছেন। এই অবস্থায় শুধুমাত্র শিশু – কিশোরদের বই বিক্রি করে টিকে থাকাটা আমাদের পক্ষে খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এরকম অবস্থা চলতে থাকলে এভাবে আর কতদিন টিকে থাকতে পারবো তা নিয়েও আমরা যথেষ্ট সন্দিহান। আমাদের এই ক্ষেত্র থেকে লাভ না হলেও আমরা প্রতিনিয়তই চেষ্টা করছি টিকে থাকার। জানিনা সেই চেষ্টা কতোটা সফল হবে। সৌজন্যে: বই নিউজ ২৪

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.