সর্বোচ্চ নিরাপত্তা থাকবে এবারের বইমেলায়

দেখতে দেখতে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে আরও একটি বছর। আর মাত্র এক মাস নয় দিন পরই বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যিক উৎসব অমর একুশে বইমেলা। এদেশের সব শ্রেণির পাঠক সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে কখন বসবে এই মিলনমেলা। একুশের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ফসল বাংলা একাডেমি। একুশে বইমেলা বিকশিত হয়েছে বাংলা একাডেমিকে কেন্দ্র করে। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয় মাসব্যাপী বইমেলা।

কিন্তু গতবছরের বইমেলাকে কলঙ্কিত করেছিল ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যার ঘটনা। তাও টিএসসির সামনে, প্রশাসন কথিত ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টনী’র ভেতরেই। কিছুদিন আগে জাগৃতির প্রকাশক দীপনকে হত্যা, শুদ্ধস্বর প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ লেখকদের ওপর হামলায় জনমনে ভীতি ছড়িয়েছে- এবারের বইমেলায় নিরাপত্তাব্যবস্থা ঠিকঠাক হবে তো? এই আশঙ্কার মধ্যেই সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর আশ্বস্ত করলেন, কোনো ফাঁকিঝুঁকি নেই, বইমেলায় থাকবে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা।

সংস্কৃতিমন্ত্রী জানান, এবারের বইমেলায় থাকবে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা। গতবছরের মতো যেন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকবে প্রশাসন। এ জন্য র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকবে প্রতিটি মুহূর্তে তৎপর। শুধু বইমেলা প্রাঙ্গণই নয়, এর আশপাশের এলাকাও থাকবে সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে। মেলাকে ঘিরে দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি পর্যন্ত মেলা চলাকালে সব ধরনের যানচলাচল বন্ধ রাখার পাশাপাশি আর্চওয়ে থাকবে মেলার প্রতিটি প্রবেশমুখে। দর্শনার্থীদের অবাধে প্রবেশের জন্য থাকবে বাড়তি প্রবেশপথ ও বাড়তি নির্গমনপথ। মেলার ভেতর-বাইরে আরো বেশি আলোর ব্যবস্থা করা হবে।

শুধু তাই-ই নয়, অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬-এর পরিসর আরো বাড়ানো হচ্ছে। বাংলা একাডেমির অংশ ছাড়াও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চও মেলার মূল পরিসরের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছে। রমনা কালিমন্দিরের প্রবেশের পথ থেকেই শুরু হবে মেলাপ্রাঙ্গণ। উদ্যানে টিনের বেষ্টনীর পাশাপাশি বাঁশের আরেকটি বেষ্টনী থাকবে। তা ছাড়া বইমেলাকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা হচ্ছে, যাতে দর্শনার্থীরা অনায়াসে প্রবেশ ও বের হতে পারে। স্যানিটেশন ব্যবস্থা হবে আরো উন্নত।

এবারের বইমেলা নিয়ে চলতি বছরের শুরু থেকেই সভা-আলোচনা শুরু করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমিসহ বইমেলার সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানই। আজ সোমবারও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে তৃতীয়বারের মতো চলে দীর্ঘ বৈঠক। এরপর বিকেল সাড়ে ৪টায় সভায় সিদ্ধান্তসমূহ সাংবাদিকদের জানান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

তিনি বলেন, ‘সভাটি বিশেষত ছিল বইমেলার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে। প্রশাসন, গণপূর্ত, বিদ্যুৎ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছি। এবারের বইমেলায় থাকবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সন্ত্রাসীদের জন্য জিরো টলারেন্স। নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই করা হবে।’

সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, ‘এটি শুধু নিছক বইমেলাই নয়, এটি মুক্তচিন্তার মেলা, অসাম্প্রদায়িকতার মেলা। গতবছর দুঃখজনকভাবে লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যা করেছিল মৌলবাদীরা, এর আগেও অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে কোপানো হয়েছিল। কিছুদিন আগেই এক প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে। সবকিছু মাথায় রেখেই এবার বড় পরিসরে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হবে।’

‘এদেশের মানুষ সন্ত্রাসকে পছন্দ করে না। তারা সন্ত্রাসকে প্রতিহত করছে। বইমেলা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, মুক্তচিন্তার পক্ষে, বইমেলা মানেই বিশ্বমানবতার জয়’, যোগ করেন তিনি।

গতবছর বইমেলাতেও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার কথা বলেছিল প্রশাসন। এর মধ্যেও মুক্তমনা লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হলো কীভাবে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটানোর জন্য একজন মানুষই যথেষ্ট। একজন দশজনের ক্ষতি করতে পারে। গতবার হয়ত কিছু দুর্বলতা ছিল। এবার যেন সামান্যও ভুল-ত্রুটি না থাকে সে-ব্যাপারে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া হবে।’ আর এজন্য সব পক্ষের সহযোগিতা চান তিনি। বলেন, ‘আর যেন কোনো দুঃখজনক পরিস্থিতি তৈরি না হয় সে-জন্য সবার সহযোগিতা আশা করছি।’

মন্ত্রী জানান, ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বইপ্রেমীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ ছাড়া ছুটির দিনগুলোতে মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।

এবার প্রকাশকদের বই আনা-নেয়ার জন্য আলাদা ফটকের ব্যবস্থা থাকবে, যাতে বই আনা-নেয়া সহজ হয়। এ ছাড়া আগামী ৫ জানুয়ারি প্রকাশকদের নিয়ে আলাদাভাবে বসবে বাংলা একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। সে সভায় স্টল বিন্যাস কেমন হবে, স্টলের সংখ্যা কত হবে এসব বিষয়ে আলোচনা হবে। মেলার আয়োজন যাতে সুষ্ঠু হয় সেজন্য প্রকাশকদের মতামত গ্রহণ করা হবে। মেলার প্রবেশপথ টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর সড়ক ও ফুটপাতে ভ্রাম্যমাণ দোকান বন্ধে কঠোর হওয়ার কথাও বলেন মন্ত্রী।

বাংলা একাডেমির শাসসুর রাহমান মিলনায়তনে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, সংস্কৃতি সচিব বেগম আক্তারী মমতাজ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনজুরুর রহমান, বাংলা একাডেমির সচিব আনোয়ার হোসেন উপস্থিত ছিলেন। বাংলামেইল২৪ডটকম/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.