সুপারশপে কেনাকাটায় অস্বস্তি দূর হোক

রেজাউল করিম খোকন ।

শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতে একসময় সুপারশপ, মেগাশপ, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রেতাদের চাহিদা ও সংখ্যা বিবেচনা করে নতুন নতুন আউটলেট বা শাখা খুলছে বিভিন্ন সুপারশপ, মেগাশপ। শহরের অভিজাত এলাকার সীমা ছাড়িয়ে এখন অন্যান্য সাধারণ এলাকায় সুপারশপের বিস্তৃতি ঘটায় আমাদের অর্থনীতিতে নতুন একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে তা . .

ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা সুপার শপ, মানে বেশ বড়োসড়ো আয়োজনের বিরাট আয়তনের দোকান। কেউ কেউ এটাকে মেগাশপ নামেও আখ্যায়িত করেন। যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, এক ছাদের নিচে নিত্যপ্রয়োজনীয় যাবতীয় পণ্যসামগ্রীর সম্ভারকেই সুপারশপ, মেগাশপ অথবা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আমাদের বাসাবাড়ির আশপাশে পাড়ামহল্লায়, হাটবাজারে যে মুদির দোকান বা ক্রোকারিজ শপ রয়েছে তারই আধুনিক, বৃহৎ সংস্করণ হলো সুপারশপ। আর এ ধরনের বড় আয়তনের দোকান এখন ঢাকা-চট্টগ্রাম শহরে দেখা যাচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। খুব সহজে এক দোকানে, একই ছাদের নিচে নিত্যপ্রয়োজনীয় যাবতীয় পণ্যসামগ্রী কেনাকাটার জন্য বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ সুপারশপ, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরকে বেছে নিচ্ছেন অনায়াসেই। প্রাত্যহিক জীবনযাপনে কেনাকাটাকে অনেকটাই সহজ, বঞ্চনামুক্ত, নিরাপদ, ঝুঁকিমুক্ত করেছে সুপারশপ ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল একটি দেশ হলেও আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামো ক্রমেই নানা দুর্বলতা কাটিয়ে সবল হচ্ছে। আমাদের অর্থনীতিতে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। গেল এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক কাঠামোতে চমকপ্রদ পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। নিত্যনতুন ধারণার উদ্ভব হচ্ছে অর্থনীতিতে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা শহরসহ বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য বড় বড় শহরে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও সুপারশপের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি অন্যতম।
আজকাল নাগরিক জীবন দ্রুত খুব বেশি বদলে যাচ্ছে। মানুষের লাইফ স্টাইলে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যার প্রভাব পড়েছে সবার নানা আচরণে। এভাবে অনেকের ক্রয়-আচরণ বদলে গেছে। আজকাল মানুষের রুচি ও পছন্দে আধুনিকতা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী শ্রেণীর জীবনযাপনে নতুনত্বের ছোঁয়া লেগেছে। কেনাকাটার জন্য তারা প্রায়ই ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা মেগাশপে ঢুঁ মারছেন। এক দোকানে ঢুকে এখন ক্রেতা চাল, ডাল, তেল, লবণ, মরিচ থেকে শুরু করে মাছ, গোশত, ডিম, মুরগি, শাকসবজি, ফলমূল এমনকি কসমেটিকস, পোশাক-আশাক, জামাকাপড়, ঘরের আসবাবপত্র, ক্রোকারিজ, আইসক্রিম, দুধ, মাখন, হিমায়িত খাদ্যদ্রব্য প্রভৃতি ইচ্ছে মতো কেনাকাটা করতে পারছেন অনায়াসেই। সারা বাজার ঘুরে, এ দোকান, সে দোকান থেকে যাচাই-বাছাই করে নিজের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করার প্রবণতা আমাদের এখানে অনেক আগে থেকেই লক্ষ করা যায়। এখনও অনেকেই সারা বাজার, প্রয়োজনে কয়েকটি বাজার ঘুরে দরদাম ও পণ্যের গুণাগুণ যাচাই করে নিজের চাহিদা অনুযায়ী কেনাকাটা করেন। তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ এটাকে ঝামেলাপূর্ণ, সময়সাপেক্ষ, সঠিক মানের পণ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন। কম সময়ে নিরাপদে আরামদায়ক পরিবেশে সঠিক মান ও ওজনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয়ের জন্য আজকাল অনেকেই নিয়মিত পা রাখছেন শহরের বিভিন্ন সুপারশপের আউটলেটে। ক্রেতার সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সাম্প্রতিক কয়েক বছরে নতুন নতুন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, মেগাশপ, সুপারশপ চালু হয়েছে।
প্রতিটিতেই ক্রেতা সমাগম লক্ষ করা যায় সকাল থেকে রাত অবধি। শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতে এক সময় সুপারশপ, মেগাশপ, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রেতাদের চাহিদা ও সংখ্যা বিবেচনা করে নতুন নতুন আউটলেট বা শাখা খুলছে বিভিন্ন সুপারশপ, মেগাশপ। শহরের অভিজাত এলাকার সীমা ছাড়িয়ে এখন অন্যান্য সাধারণ এলাকায় সুপারশপের বিস্তৃতি ঘটায় আমাদের অর্থনীতিতে নতুন একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে তা। এখন ধনাঢ্য, অভিজাত, উচ্চবিত্ত শ্রেণীর পাশাপাশি সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারী-পুরুষ সুপারশপে কেনাকাটা করতে আসছেন। এটা আর বিলাসিতার পর্যায়ে নেই বর্তমানে। নাগরিক জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে যখন সুপারশপগুলো, তখনই এর বেশিরভাগের বিরুদ্ধেই ভেজাল, নিম্নমানের, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সুপারশপগুলোর চটকদার ও নজরকাড়া প্রচারণায় প্রলুব্ধ হয়ে আকৃষ্ট ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। একই দোকানে নির্ধারিত মূল্যে অর্থাৎ ফিক্সড প্রাইজের লেবেল সাঁটা নিত্যপণ্য সংগ্রহের সুবিধায় বেশিরভাগ ক্রেতা এসব দোকানমুখী হচ্ছেন। ভোক্তাদের এ দুর্বলতার সুযোগে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী নিম্নমানের পচা মাছ, বাসি মাংস, তরিতরকারিসহ পচনশীল নানা পণ্য সংগ্রহ করে বিক্রি করে অধিক মুনাফা করছেন। জানা গেছে, দেশে ৩৩টি সুপারশপ কোম্পানির ২৩৩টি বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। আকর্ষণীয় ছাড়ে এসব সুপারশপ থেকে পণ্য কিনে হরদম ঠকছেন ক্রেতারা। এসব দোকানের মাছ, গোশত থাকে বাসি ও বিবর্ণ, যার আসল স্বাদ পাওয়া যায় না। এসব পণ্য দীর্ঘদিন ধরে হিমায়িত থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকছে পুরো মাত্রায়। অন্যান্য পণ্যে আকর্ষণীয় মোড়ক থাকলেও সেগুলো মানসম্মত নয়, এটা ক্রেতাদের অভিযোগ। জাতীয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং বিএসটিআই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু দিন ধরে সুপারশপগুলোতে অভিযান চালিয়ে নিম্নমানের পচা, বাসি, মেয়াদোত্তীর্ণ ভেজাল পণ্য আটক করেছে। জরিমানা করা হয়েছে বেশ কয়েকটি বহুল পরিচিত ও আলোচিত সুপারশপকে। যে কারণে সুপারশপের ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা ও সতর্কতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যে দোকানগুলোকে কেনাকাটায় নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য মনে করা হচ্ছিল ভেজালমুক্ত, তরতাজা, সঠিক মানের পণ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা হিসেবে, সেখানে বিভিন্ন অভিযানে ভেজাল, নিম্নমানের, পচা-বাসি, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যসামগ্রী পাওয়া গেছে। এতে সুপারশপের মালিকরা প্রতিবাদী হয়েছেন, ভোক্তাদের জিম্মি করার অপকৌশল হিসেবে তারা ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করেছেন। নীতিমালায় বৈষম্য ও হয়রানির অভিযোগ আনছেন তারা। সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য বিক্রি নিশ্চিতকরণের অভিযানকে সবাই সাধুবাদ জানিয়েছেন। পরিচালিত এ অভিযানগুলোতে বিভিন্ন সুপারশপে পচা, বাসি, ভেজাল ও নিম্নমানের পণ্যসামগ্রী পাওয়ায় ভোক্তারা আগের চেয়ে সচেতন হয়েছেন। তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তিভাব সৃষ্টি হয়েছে কেনাকাটার ক্ষেত্রে। এ অভিযানে সুপারশপগুলোর মুনাফালোভী স্বেচ্ছাচারী কর্মকা- বিঘিœত হওয়ায় তারা এটাকে হয়রানিমূলক হিসেবে আখ্যা দিয়ে সবাইকে বিভ্রান্ত করতে চাইছেন বলে মনে হয়। তবে এ বিষয়ে ভোক্তা সাধারণের আরও বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করে সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থসংরক্ষণে যুগান্তকারী অবদান রেখেছে। ভোক্তাদের জন্য এ আইন রক্ষাকবচ। সাধারণ ভোক্তাশ্রেণী এ আইন সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নন। এর মাধ্যমে সবার জন্য নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত হবে আশা করা যায়। সুপারশপ মালিকদের অন্যায় দাবি ও আন্দোলনকে আমলে না নিয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষের অভিযান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন বলে মনে করি আমরা। ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বিক্রীত পণ্যের গুণগত মান রক্ষায় অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। সুপারশপগুলো যেন ক্রেতাদের জন্য সঠিক মান ও গুণের, ভেজালমুক্ত, খাঁটি-তাজা পণ্যের স্বস্তিকর কেনাকাটার নিশ্চিত ঠিকানা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে যে কোনো মূল্যে। সুপারশপ বন্ধ হয়ে যাক আমরা তা চাই না, বরং এর বিকাশ চাই। ক্রেতারা যাতে পরম নিশ্চিন্তে, স্বস্তির সঙ্গে উন্নত ও সঠিক মানের পণ্য পাওয়ার নিশ্চয়তাসহ স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটার জন্য সুপারশগুলোকে বেছে নিতে পারেন, সে লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে জরুরিভাবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.