সড়ক দুর্ঘটনা: ‘মোটরবাইক নিয়ন্ত্রণ জরুরি’

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরবাইক৷ সড়কে মোটরবাইকের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি, চালকদের অদক্ষতাসহ নানা কারণেই দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা৷

বেসরকারি সংস্থা নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) গত সপ্তাহে বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে দেখা গেছে সড়ক দুর্ঘনার জন্য এককভাবে সবচেয়ে বেশি দায়ী মোটরবাইক৷

২০১৯ সালে মোট চার হাজার ৭০২ টি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজার ২২৭ হন নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে সংস্থাটি৷ এসব সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সর্বোচ্চ সংখ্যায় এক হাজার ৯৮টি মোটরবাইক দায়ী৷

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ট্রাক৷ এ যানবাহনটি মোট ১০৩টি দুর্ঘটনার জন্য দায়ী৷ বাস রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে, ৯৯২টি৷

মোট নিহতের ১৯ ভাগ ছিল মোটরবাইক দুর্ঘটনায়৷ তবে ২০১৮ সালের তুলনায় তা কিছুটা৷ সে বছর ছিলো ২১ ভাগ৷

ঢাকাসহ সারাদেশের সড়কেই বাড়ছে মোটরবাইকের সংখ্যা৷ এদিকে রাইডশেয়ারিং-এ মোটরবাইকের ব্যবহারও দিন দিন বাড়ছে৷ ফলে ঢাকার অনেক রাস্তাই থাকে এই যানটির দখলে৷

বিআরটিএ-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সালে বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোটরবাইকের সংখ্যা ছিলো প্রায় ৭৬ হাজার৷ ২০১৬ সালে তিন লাখ ৩২ হাজার, ২০১৭ সালে তিন লাখ ৯৫ হাজার, ২০১৮ সালে তিন লাখ ৯৫ হাজার এবং ২০১৯ সালে চার লাখ সাত হাজার নতুন মটরবাইকের নিবন্ধন দিয়েছে দিয়েছে সংস্থাটি৷

বিআরটিএ-এর সবশেষ হিসেবে বাংলাদেশে এখন নিবন্ধিত মোট যানবাহন ৪৩ লাখ এক হাজার ৬১০টি৷ এরমধ্যে মোটরবাইকের সংখ্যা ২৮ লাখ ৫৩ হাজার ৪১৯টি৷ যা মোট যানের অর্ধেকেরও বেশি৷ তবে ২৮ লাখ মোটরবাইকের বিপরীতে লাইসেন্সধারী মোটরবাইক চালক আছেন ১৩ লাখ ৬০ হাজার৷

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটরবাইক দুর্ঘটনা শীর্ষে থাকার প্রধান কারণ হেলমেট ব্যবহার না করার প্রবণতা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন ও বেপরোয়া ড্রাইভিং৷ আর অদক্ষ এবং লাইসেন্সবিহীন চালকতো আছেই৷

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. এস এম সোহেল মাহমুদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বেই মোটরবাইক থ্রি ও ফোর হুইলারের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ ভাগ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ৷ কারণ এটি দুই চাকার ওপর চলাচল করে৷ বাংলাদেশে বাস্তবে মোটরবাইকের দুর্ঘটনার হার অনেক বেশি৷ রিপোর্টে সব আসে না৷”

তিনি বলেন, ‘‘রাইড শেয়ারিং-এর নামে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে যে বিপুল পরিমাণ মোটরবাইক নেমেছে তা ইতিমধ্যেই সংকট তৈরি করছে৷ এখন প্রচুর ফ্রিল্যান্স মোটরবাইকার আছে৷ ফলে নিরাপত্তা ও সড়ক ব্যবহারের দিক থেকে বড় সংকট তৈরি করবে যদি এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়৷ ভিয়েতমান, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া এরইমধ্যে এই সংকটে পড়েছে৷ তাদের সড়ক দুর্ঘটনার ৬০ ভাগ এখন মোটরবাইকের কারণে৷”

ঢাকা শহরে মোট কত মোটরবাইক চলাচল করছে তার সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন৷ কারণ যেখান থেকেই মোটরবাইক নিবন্ধন করা হোক না কেন তা সারাদেশেই চলতে পারে৷ তবে ঢাকা শহর থেকে নিবন্ধিত মোটরবাইকের সংখ্যা সাত লাখেরও বেশি৷ আর গত তিন বছরে যে বিপুল পরিমান মোটরবাইকের নিবন্ধন হয়েছে তার মূল উদ্দেশ্য রাইড শেয়ারিং৷ রাইডশেয়ারিং-এর জন্য ঢাকার বাইরে নিবন্ধিত মোটরবাইকও ঢাকায় আসছে৷

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রধান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘‘যদি মোটরবাইকের সংখ্যা বিবেচনা করা হয় তাহলে দুর্ঘটনায় এ যানবাহনটি শীর্ষে নয়৷ কারণ ২৭ লাখ মোটরবাইকের মধ্যে এক হাজারের কিছু বেশি মোটরবাইক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী৷ আর চার লাখ বাস ট্রাক মিলে দায়ী ৪০ ভাগ৷ তবে নানা কারণে মোটরবাইক এখন রাজধানীতে আরেকটি ভীতি হয়ে দাঁড়াচ্ছে৷”

তিনি বলেন, ‘‘মোটরবাইকের লাইসেন্সবিহীন চালক বেশি৷ আবার রাইড শেয়ারিং-এর কারণে প্রচুর মোটরবাইক আসছে যাদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই৷ যদিও নিয়ম কঠোর হওয়ার কারণে হেলমেট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে৷ ফলে ২০১৯ সালে মোটরবাইক দুর্ঘটনা দুইভাগ কমেছে৷ কিন্তু মোটরবাইক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন৷ এটা নানা কারণে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে৷’’

সূত্র: ডয়চে ভেলে।