১৯৭১: আ গ্লোবাল হিস্টরি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ

মুক্তিযুদ্ধের ৪৩তম বিজয় দিবস সামনে রেখে প্রথম আলোর এই ধারাবাহিক আয়োজনের বিষয় দেশি–বিদেশি গবেষকদের লেখা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এসব গ্রন্থে উল্লেখিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিভিন্ন দিক ও ঘটনাপ্রবাহের নির্বাচিত অংশ এখানে তুলে ধরা হলো। আজকের বই ভারতীয় ইতিহাসবিদ শ্রীনাথ রাঘবনের নাইনটিন সেভেন্টি ওয়ান: আ গ্লোবাল হিস্টরি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ। রাঘবন লন্ডনের কিংস কলেজের কিংস ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকে দেখেছেন উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূরাজনৈতিক সংঘাত হিসেবে। তিনি জোর দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের বৈশ্বিক ইতিহাস প্রণয়নে। এখানে এরই নির্বাচিত অংশ অনূদিত হলো

ঢাকায় দিল্লির ডেপুটি হাইকমিশনার কে সি সেনগুপ্ত সে সময় ছিলেন ভারাক্রান্ত। ১৯৭১-এর ১৪ মার্চ সকালে তিনি শেখ মুজিবের দূত ক্যাপ্টেন সুজাত আলীর সঙ্গে দেখা করলেন। আলীকে পাঠানো হয়েছিল ‘কঠিন মুহূর্তে বিশেষ সাহায্যের আবেদন’ জানাতে। আড়াই ডিভিশন পাকিস্তানি সেনাকে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছে। মুজিব মনে করেন, এটা সম্ভব হয়েছে ‘পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের সুযোগে’। তাঁর বিশ্বাস, ‘ভারত তার সীমান্ত লঙ্ঘনের অজুহাতে পাকিস্তানি সেনা, জাহাজ ও বিমান পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানোয় বাধা দিলে পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল নাড়া খেত।’ মুজিব অনুরোধ করেন, যাতে ‘এ বিষয়ে ভারত তার সিদ্ধান্ত দ্রুতই জানায়’; যাতে করে তিনি তাঁর ‘পরের পদক্ষেপ কী হবে সেই সিদ্ধান্ত’ নিতে পারেন। ‘পূর্ব পাকিস্তানের আর ফেরার পথ নেই’ জোর দিয়ে বলেন মুজিব। বাঙালিরা ‘সেনাবাহিনীর ওপর আঘাত হানতে প্রস্তুত’ যদি ‘ভারত (পাকিস্তানি সেনার) শক্তি বৃদ্ধিতে বাধা দেয়…স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা ছাড়া মুজিবের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।’
ভারতীয় নেতৃত্বের কাছে এটাই মুজিবের প্রথম বার্তা ছিল না। মার্চের ৫ ও ৬ তারিখে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ সেনগুপ্তের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি জানতে এসেছিলেন, পাকিস্তান যদি পূর্ব বাংলায় আক্রমণ চালায় তাহলে মুক্তিসংগ্রামে ভারতীয় সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা? কিন্তু ভারতের তরফে কোনো জবাব না আসায় মুজিব অসন্তুষ্ট হন। সুজাত আলী মুজিবের অসন্তোষের কথা স্পষ্ট করে জানালেন এবং ‘শিগগিরই ভারতের সিদ্ধান্ত’ জানতে চাইলেন। সেনগুপ্ত তখন মুজিবকে খুশি রাখার জন্যই তাঁর সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করতে কলকাতায় গেলেন।
এ সময়ের মধ্যে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র এমন তথ্য পাচ্ছিল যে মুজিব পাকিস্তানের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাকে সত্যিকার সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করছিলেন এবং তার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।…অন্যদিকে ভারত ভয় পাচ্ছিল যে বাংলাদেশ না যেন পশ্চিমবঙ্গ ও আসামকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীন হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ কমিউনিস্টদের হাতে চলে না যায়।
মুজিবের এই বার্তা দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পৌঁছাল ১৯ মার্চ। ইতিমধ্যে সেনগুপ্ত ঢাকায় ফিরলেন এবং তাজউদ্দীনকে ফাঁকা ও গড়পড়তা আশ্বাস দিলেন যে আক্রমণ হলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ‘সব রকমের সহযোগিতা’ দেওয়া হবে। মুজিবের অনুরোধে দিল্লির সাড়া না দেওয়া কিছু গুরুতর প্রশ্ন তোলে। কেন ভারত বিমুখ হয়েছিল? আগেভাগেই হস্তক্ষেপ করা এবং বাঙালিদের পক্ষে থাকাই কি ভারতের জন্য বেশি বাস্তব ও ফলদায়ক নয়? স্বাধীন পূর্ব বাংলা কি ভারতের অবস্থান থেকে খুবই কাঙ্ক্ষিত হওয়া উচিত নয়? ভারতের এহেন আচরণ পরে সংকট সামলানোর চেষ্টায় কী প্রভাব ফেলেছিল?
মুজিবের আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, মধ্য মার্চে ঢাকার সঙ্গে ইসলামাবাদের সমঝোতা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং দ্বিতীয়ত, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পর থেকে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হওয়ায় মুজিবের সত্যিকার অভিপ্রায় সম্পর্কে ভারতীয়দের অন্ধকারে থাকা। সেনগুপ্ত যে বার্তাটি দিল্লিতে পাঠিয়েছিলেন সেখানে বলা ছিল, পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ‘বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপ আমেরিকাকে সাত বছরের জন্য ইজারার বিনিময়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করায় রাজি ছিলেন।’ এসব কারণে মুজিবের পরিকল্পনা বিষয়ে ভারতীয় নেতৃত্ব সন্দিহান ছিল। যা-ই হোক, মুজিব এর পরে ভারতের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করেননি।

২.
সুইডিশ টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর টেবিলের লাল ফোন বেজে উঠল। তিনি উত্তর করছিলেন, ‘হ্যাঁ,’ ‘হ্যাঁ,’ ‘ধন্যবাদ’। জেনারেল মানেকশ ফোনে জানালেন, ঢাকায় আত্মসমর্পণ সম্পন্ন হয়েছে। মিস গান্ধী তড়িঘড়ি করে পার্লামেন্টের দিকে ছুটলেন। পুরো সভা উত্তেজনা ও আগ্রহ নিয়ে শুনল: ‘পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করেছে…ঢাকা এখন মুক্ত দেশের মুক্ত রাজধানী।’
পাকিস্তানে এর অভিঘাত বিদ্যুতের কামড় খাওয়ার মতো। ইয়াহিয়া খান ও সেনাবাহিনী বিমর্ষভাবে রাষ্ট্রের হাতল তুলে দিয়েছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর হাতে। তিনি এখন প্রেসিডেন্ট এবং সামরিক আইন প্রশাসক। ১৯৭২-এর ৮ জানুয়ারি ভুট্টো ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে শেখ মুজিবুর রহমানকে বিদায় দিতে যান। দুই দিন পরে, ইন্দিরা গান্ধী দিল্লি বিমানবন্দরের টারমাকে দঁাড়িয়ে মুজিবকে স্বাগত জানান। দুই নেতা বিপুল জনগণের সামনে দু্ই দেশের বন্ধুত্ব ও বিশ্বস্ততা দীর্ঘজীবী হওয়ার অঙ্গীকার করেন। মুজিব ঢাকায় অবতরণ করেন সেদিন বিকেলেই। লাখো মানুষের বিজয়োল্লাসের মধ্য দিয়ে মুজিব দেশে ফিরলেন। ভারত কেবল চূড়ান্ত বিজয়ই পায়নি, পাশাপাশি ১৯৪৭ সাল থেকে উপমহাদেশকে তাড়িয়ে বেড়ানো ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের’ ভূতও ঝেড়ে ফেলল। বাংলাদেশ খুনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে মুক্তি অর্জন করল। এই আবেগ এখনো দুই দেশে বিদ্যমান।
তবে বাংলাদেশের আবির্ভাব অনিবার্য ছিল; এমন মনোভাবের জন্ম আসলে যুদ্ধের পরের সময়ে। আপাত অকাট্য ও নিয়তিবাদী এ চিন্তা কিন্তু একাত্তরের আগে তেমন মাটি পায়নি। এ রকম অনিবার্যতাবাদী ভাবনা–যুদ্ধের পরিণতির আগাম নিশ্চয়তা খুঁজে নেওয়ার মাধ্যমে আসলে একে বুঝতে সমস্যাই সৃষ্টি করে। কার্যত, ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের ভাঙন অথবা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় অনিবার্য ছিল না। বরং এটা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার আওতার বাইরে বয়ে চলা ঐতিহাসিক স্রোত ও সংযোগের ফল। তা ছাড়া বিউপনিবেশীকরণ, শীতল যুদ্ধ এবং উদীয়মান বিশ্বায়ন দক্ষিণ এশীয় সংকটের সঙ্গে এমনভাবে ক্রিয়া করেছিল, যার পরিণতি অনুমান করা সম্ভব ছিল না।
আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন এবং পরাশক্তিগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ও পক্ষবদল যেমন বিরাট প্রভাবক ছিল, তেমনি ১৯৬৮ সালের বৈশ্বিক যুববিদ্রোহও বাঙালিদের দৃঢ়চেতা করে তুলেছিল। আটষট্টির বৈশ্বিক ছাত্র আন্দোলনের প্রভাবে পাকিস্তানি ছাত্ররা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে আইয়ুব খানকেই শুধু ক্ষমতাচ্যুত করেনি, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকেও আপসহীন করে তুলেছিল। শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগও এর শক্তিতেই ছয় দফা দাবিকে নরম করতে অথবা শাসকদের সঙ্গে অতীতের কায়দায় মানিয়ে নিতে রাজি ছিল না। তারপরও, স্বাধীনতার গন্তব্যের কোনো মসৃণ ও সোজা পথ ছিল না। হোর্হে লুই বোর্হেসের কল্পনা ধার করে বলা যায়, এটা ছিল গোলকধাঁধার বাগানের পথ।
যেমন, ভুট্টো যদি আওয়ামী লীগের ক্ষমতারোহণ ঠেকাতে সামরিক শাসকদের দোসর না হতেন, তাহলে শিথিল ফেডারেশনের মতো করে হলেও পাকিস্তান টিকত। ভুট্টোর মদদ ছাড়া সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানকে দমনের সময় পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হতো না। আইয়ুব খানের উচ্ছেদের ঘটনাই প্রমাণ করে, একসঙ্গে দুই পাকিস্তানে গণ-অভ্যুত্থান দমন করা অসম্ভব। ভুট্টো যদি মুজিবের সঙ্গে যোগ দিতেন, যেমনটা সমসাময়িক অনেকে আশা করেছিলেন, তাহলে পাকিস্তানের ভাঙন এড়ানো সম্ভব হতো।
যদি নিক্সন প্রশাসন এপ্রিলের শেষে বা মের প্রথমে পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক সাহায্য দেওয়া বন্ধের হুমকি দিত, তাহলে খুবই সম্ভব ইয়াহিয়া গং মুজিবের সঙ্গে আপসে আসতে বাধ্য হতো এবং ছয় দফা মেনে নিত। এ সময়ের মধ্যে সামরিক দমন-পীড়ন এমন জায়গায় যায়নি, সেখানে কনফেডারেশনের প্রস্তাব আওয়ামী লীগের কাছেও অগ্রহণযোগ্য হতো।
অক্টোবরের শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থান বদলে না গেলে ভারতও হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের বড় নদীগুলোর তীরে পৌঁছানোর পরিকল্পনা নিত না। তেমনি ব্রিটিশ ও ফরাসি সমর্থন না পেলে ভারত হয়তো সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের রাস্তা নিত না। যদি চীনা নেতৃত্ব ভারতের সঙ্গে সম্পূর্ণ বৈরিতা এড়াতে না চাইত, কিংবা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দ্বন্দ্বে না ভুগত, তাহলে ভারতও পাকিস্তানের পক্ষে চীনা অভিযান না-হওয়ার আত্মবিশ্বাস পেত না। ৩ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ভুল না করলে ঢাকা দখল ও পরিপূর্ণ বিজয়ের লক্ষ্য নিত না ভারত।
একেবারে শেষ মুহূর্তে ভুট্টো যদি নিরাপত্তা পরিষদে পোল্যান্ডের প্রস্তাব আবর্জনার স্তূপে ছুড়ে না ফেলতেন, তাহলে ভারতীয় বাহিনীকে ঢাকার অনেক আগেই থেমে যেতে হতো। তাহলে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ কিংবা ৯৩ হাজার সেনা যুদ্ধবন্দী হতো না। এর চেয়েও যা বড়, তড়িঘড়ি ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের ফলে ভারতের পক্ষে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরও এত নিশ্চিত থাকত না যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ যে ‘সম্পূর্ণ বেসামরিক নৈরাজ্যের মধ্যে’ পড়বে, সে বিষয়ে ভারত ভালোভাবেই সজ্ঞান ছিল।প্রথম আলো।

নাইনটিন সেভেন্টি ওয়ান: আ গ্লোবাল হিস্টরি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ, শ্রীনাথ রাঘবন। প্রকাশকাল ২০১৩, প্রকাশক পারমানেন্ট ব্ল্যাক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.